নিজস্ব প্রতিনিধি : শহরের পরিচিত সোশাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার শমীক অধিকারী, যিনি অনলাইনে ‘ননসেন’ নামে পরিচিত, তাঁর বিরুদ্ধে বেহালা থানায় দায়ের হওয়া গুরুতর অভিযোগ ঘিরে শুধু আইনি তদন্তই নয়, শুরু হয়েছে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও। ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১২৭(২), ১১৫(২), ৭, ৪ এবং ৩৫১(২) ধারায় রুজু হওয়া এই মামলার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন এক ২২ বছরের তরুণী।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, অভিযোগকারীর দাবি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারির রাত থেকে ৩ ফেব্রুয়ারির সন্ধে পর্যন্ত তাঁকে বেহালা এলাকার একটি আবাসনের ফ্ল্যাটে প্রায় বারো ঘণ্টা আটকে রাখা হয়েছিল। ওই সময় তাঁর উপর শারীরিক নির্যাতন চলে, ঘুষি ও আঘাত করা হয় এবং তাঁর শালীনতা লঙ্ঘন করা হয় বলে অভিযোগ। অভিযোগপত্রে আরও উল্লেখ রয়েছে, ব্যক্তিগত বিবাদের জেরে তাঁকে ভয় দেখানো হয় এবং ঘটনার কথা প্রকাশ্যে না আনতে হুমকি দেওয়া হয়েছিল।
অভিযোগকারীর বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনার আগে অভিযুক্তের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ পরিচয় ও সম্পর্ক ছিল। সেই কারণেই এই অভিজ্ঞতা তাঁকে মানসিকভাবে গভীর আঘাত দিয়েছে বলে তিনি পুলিশকে জানিয়েছেন। ঘটনার পর তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছেন বলেও দাবি করেছেন।
পুলিশ জানিয়েছে, অভিযোগ দায়েরের পর ওই তরুণীর মেডিক্যাল পরীক্ষা করানো হয় এম আর বাঙুর হাসপাতালে। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, চিকিৎসকেরা তাঁর শরীরে আঘাতের স্পষ্ট চিহ্ন পেয়েছেন, যা মেডিক্যাল রিপোর্টে নথিভুক্ত হয়েছে। এই রিপোর্ট তদন্তের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ নথি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ঘটনাটি বেহালা থানার আওতাধীন একটি আবাসনে ঘটেছে বলে পুলিশ নিশ্চিত করেছে। বর্তমানে মামলার তদন্ত চলছে, একাধিক পক্ষের বক্তব্য রেকর্ড করা হচ্ছে। পুলিশ সূত্রে জানানো হয়েছে, মেডিক্যাল রিপোর্ট ও অন্যান্য প্রমাণ খতিয়ে দেখেই পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এই ঘটনার পর থেকেই শাসক দলের একাংশ প্রকাশ্যে প্রতিক্রিয়া জানাতে শুরু করেছেন। রাজনৈতিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে ননসেনের কিছুদিন আগে মুক্তি পাওয়া শর্ট ভিডিও ‘বাটন’। ওই ভিডিওতে মহিলা নিরাপত্তা, কর্মহীনতা সহ একাধিক সামাজিক ইস্যু তুলে ধরা হয়েছিল। শাসক দলের একটি অংশের মতে, ওই ভিডিও রাজ্য সরকারকে অস্বস্তিতে ফেলেছিল। তৃণমূল কংগ্রেসের মুখপাত্র কুনাল ঘোষ সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, “এই সেই ব্যক্তি, যিনি পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে নিশানা করে একটি ভিডিও বানিয়েছিলেন—যেখানে দাবি করা হয়েছিল, এই রাজ্যে মহিলারা নিরাপদ নন এবং তৃণমূল কংগ্রেসকে ভোট না দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছিল।”
অন্যদিকে বিরোধী শিবিরের বক্তব্য, ‘বাটন’ ভিডিওটি সময়োপযোগী এবং বাস্তব সমস্যার কথা বলেছিল বলেই সরকার অস্বস্তিতে পড়েছে। তাঁদের দাবি, সেই কারণেই শমীক অধিকারীর বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত করা হচ্ছে।
অভিযোগ প্রসঙ্গে শমীক অধিকারীর সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি সমস্ত অভিযোগ সরাসরি খারিজ করেন। তাঁর বক্তব্য, যিনি তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছেন, তিনি তাঁর প্রাক্তন প্রেমিকা এবং মাত্র কয়েকদিন আগেই তাঁদের সম্পর্ক ভেঙেছে। শমীকের দাবি, তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলি ভিত্তিহীন ও মিথ্যা, এবং প্রকৃত সত্য সময়ের সঙ্গে সামনে আসবে। তিনি আরও বলেন, তাঁদের মধ্যে যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল, তা সম্পূর্ণ পারস্পরিক সম্মতির মধ্যেই ছিল। তাঁর দাবি অনুযায়ী, ফ্ল্যাটে প্রবেশের সময়ের সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখলেই এই সংক্রান্ত সমস্ত অভিযোগের বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে যাবে।
এই ঘটনার প্রেক্ষিতে অভিযোগকারীর ভাইয়ের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়। তিনি জানান, শমীকের সঙ্গে তাঁর বোনের প্রেমের সম্পর্ক থাকার বিষয়ে তাঁর কোনও ধারণা ছিল না। তবে তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট ক্ষোভ—তিনি বলেন, তাঁর বোনের সঙ্গে যা ঘটেছে তা অন্যায় এবং অমানবিক। এখনও তাঁর বোন আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। তাঁর প্রশ্ন, কীভাবে একজন মানুষ আরেকজনকে ঘরের মধ্যে আটকে রাখতে পারে, এবং কীভাবে তাঁর উপর শারীরিক নির্যাতন চালাতে পারে।
এই মুহূর্তে অভিযোগ, পাল্টা দাবি এবং রাজনৈতিক তরজার মাঝেই এগোচ্ছে তদন্ত। পুলিশ জানিয়েছে, সমস্ত দিক খতিয়ে দেখে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।