এ যেন কার্যত ‘সাপের ছুঁচো গেলা’র মতো পরিস্থিতি! না পারছে গিলতে, না পারছে উগরাতে। পাকিস্তানের গ্বদর সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে এখন অনেকটা এমনই উভয় সঙ্কটে চিন। আরব সাগরের তীরে অবস্থিত এই বন্দরকে নিজেদের বৃহত্তর বাণিজ্যিক ও কৌশলগত পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে গত এক দশকে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছে বেজিং। কিন্তু একের পর এক বাধা, নিরাপত্তা সঙ্কট, স্থানীয় মানুষের ক্ষোভ এবং পরিকাঠামোগত সমস্যায় চিনের সেই উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনা ক্রমশ প্রশ্নের মুখে পড়ছে।
গ্বদরকে ঘিরে চিনের পরিকল্পনার কেন্দ্রে রয়েছে ‘চায়না-পাকিস্তান ইকনমিক করিডর’ বা সিপিইসি। চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিঙের উচ্চাকাঙ্ক্ষী ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই)-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প এটি। ২০১৫ সালে পাকিস্তান আনুষ্ঠানিক ভাবে বিআরআই-এর অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পরই গ্বদর বন্দরকে কেন্দ্র করে পরিকাঠামো নির্মাণে আরও জোর দেয় বেজিং। লক্ষ্য ছিল, চিনের শিনজিয়াং প্রদেশকে পাকিস্তানের বালুচিস্তানের গ্বদর বন্দরের সঙ্গে সড়ক, রেল ও অন্যান্য যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে যুক্ত করা।
চিনের কাছে প্রকল্পটির গুরুত্ব শুধু বাণিজ্যিক নয়, কৌশলগতও। গ্বদরকে কার্যকর ভাবে ব্যবহার করতে পারলে মধ্যপ্রাচ্য ও আরব সাগরের কাছাকাছি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ তৈরি করতে পারে বেজিং। বর্তমানে চিনের পশ্চিমাঞ্চল থেকে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহণের ক্ষেত্রে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। সেই নির্ভরতা কমিয়ে গ্বদরকে ব্যবহার করে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিজেদের উপস্থিতি আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা ছিল চিনের।
কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি সেই পরিকল্পনার সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। গ্বদর যে বালুচিস্তানে অবস্থিত, সেখানেই চিনের প্রকল্পের অন্যতম বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে নিরাপত্তা পরিস্থিতি। বালোচ বিদ্রোহীদের বিভিন্ন হামলায় চিনা নাগরিক ও প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত কর্মীরা বার বার নিশানায় এসেছেন। ফলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পাকিস্তানকে বিপুল সংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করতে হয়েছে। তার পরেও পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হতে পারছে না বেজিং।
গ্বদরকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের ক্ষোভও চিনের জন্য বড় সমস্যা। বালুচিস্তানের একাংশের অভিযোগ, বিপুল অর্থের প্রকল্প হলেও তার সুফল স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে যথেষ্ট পৌঁছচ্ছে না। জল, বিদ্যুৎ, কর্মসংস্থান এবং স্থানীয় সম্পদের ব্যবহার নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে বলে বিভিন্ন সময়ে দাবি উঠেছে। ফলে যে প্রকল্পকে চিন-পাকিস্তান বন্ধুত্বের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল, সেটিই অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় অসন্তোষের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
শুধু বালোচিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতিই নয়, চিন-পাকিস্তান করিডরের বিস্তৃত রুটও নানা প্রাকৃতিক ও ভৌগোলিক সমস্যার মুখে। চিনের শিনজিয়াং থেকে পাকিস্তানের গিলগিট-বালতিস্তান হয়ে বালুচিস্তান পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকা পাহাড়ি ও দুর্গম। কারাকোরাম পর্বতমালা দিয়ে রাস্তা ও অন্যান্য পরিকাঠামো তৈরি করা অত্যন্ত কঠিন এবং ব্যয়সাপেক্ষ। ভূমিধস, তুষারপাত, ভূমিকম্প-সহ নানা প্রাকৃতিক বিপর্যয় নিয়মিত ভাবেই যোগাযোগ ব্যবস্থার উপর চাপ তৈরি করে।
এই পরিস্থিতিতে প্রকল্পের খরচ যেমন বেড়েছে, তেমনই প্রশ্ন উঠেছে তার আর্থিক কার্যকারিতা নিয়েও। চিন যে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছে, তার বিনিময়ে প্রত্যাশিত মাত্রায় বাণিজ্যিক সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে কি না, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের একাংশের মধ্যে সংশয় তৈরি হয়েছে। গ্বদর বন্দরের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে শুধু বন্দর তৈরি করলেই হবে না, তার সঙ্গে উন্নত সড়ক, রেল, বিদ্যুৎ, শিল্পাঞ্চল এবং নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। সেই গোটা ব্যবস্থাই এখনও নানা সমস্যায় জর্জরিত।
এর পাশাপাশি পাকিস্তানের অর্থনৈতিক দুর্বলতাও প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা বাড়িয়েছে। দেশটির আর্থিক সঙ্কট, ঋণের বোঝা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব পড়ছে বড় পরিকাঠামো প্রকল্পগুলিতেও। ফলে চিনকে একদিকে নিজের বিনিয়োগ রক্ষা করতে হচ্ছে, অন্যদিকে পাকিস্তানের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখতেও হচ্ছে।
গ্বদরকে ঘিরে বেজিংয়ের আর একটি বড় উদ্বেগ হল, প্রকল্পটির নিরাপত্তার দায়িত্ব কার্যত পাকিস্তানের উপর নির্ভরশীল। চিনা নাগরিক ও কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে কোনও বড় ঘটনা ঘটলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে বেজিং-ইসলামাবাদ সম্পর্কে। অতীতে একাধিক হামলার ঘটনায় সেই উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
তবু গ্বদর থেকে সরে আসাও চিনের পক্ষে সহজ নয়। কারণ এই বন্দরের পিছনে শুধু কয়েকটি বাণিজ্যিক প্রকল্প নয়, রয়েছে বিআরআই-এর দীর্ঘমেয়াদি কৌশল। গ্বদর সফল হলে মধ্য এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্গে চিনের যোগাযোগ আরও মজবুত হতে পারে। সেই সম্ভাবনা থেকেই বিপুল বিনিয়োগের পরেও প্রকল্পটি ছেড়ে দিতে চাইছে না বেজিং।
ফলে পরিস্থিতি অনেকটাই ‘সাপের ছুঁচো গেলা’র মতো। একদিকে গ্বদরকে নিয়ে চিনের কৌশলগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে নিরাপত্তা সঙ্কট, বালোচ বিদ্রোহীদের হামলা, স্থানীয় ক্ষোভ, দুর্গম ভৌগোলিক পরিস্থিতি এবং আর্থিক অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে ড্রাগনের পথ ক্রমশ কঠিন হচ্ছে। এক দশক আগে যে প্রকল্পকে চিনের পশ্চিমমুখী বাণিজ্যিক সম্প্রসারণের অন্যতম বড় হাতিয়ার বলে মনে করা হয়েছিল, সময়ের সঙ্গে সেই প্রকল্পই এখন বেজিংয়ের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।
প্রশ্ন তাই একটাই—বিপুল অর্থ ও কৌশলগত স্বার্থ জড়িয়ে থাকা গ্বদরকে শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর করে তুলতে পারবে চিন? নাকি বালোচিস্তানের অস্থিরতা, পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি এবং পাকিস্তানের অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক দুর্বলতার জেরে বেজিংয়ের সেই স্বপ্ন ক্রমশই অধরা থেকে যাবে?