খুব সম্ভব নিজেরাই মেরে', কণ্ঠশিল্পী প্রলয় চাকীর মৃত্যু, ক্ষোভে ফুঁসছেন তসলিমা


গানই ছিল তাঁর আসল পরিচয়। মানুষের ভালবাসা, মঞ্চের আলো আর সুরের ভুবনেই তিনি বুনে নিয়েছিলেন স্বপ্নের নানা রঙ। কিন্তু সেই মানুষটিই জীবনের শেষ লড়াইয়ে পরাস্ত হলেন হাসপাতালে। রবিবার রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী ও আওয়ামী লীগ নেতা প্রলয় চাকী। মৃত্যুর আগে তিনি প্রায় দু’বছর ধরে পাবনা জেলা সংশোধনাগারে বন্দি ছিলেন।

প্রলয় চাকীর মৃত্যু, তাঁর ব্যক্তিগত যাত্রার সমাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে থেমে যাওয়া, এক পরিচিত কণ্ঠের প্রতীকেও রূপ নেয়। পরিবারের সদস্যদের দাবি, সময়মতো সঠিক চিকিৎসা পেলে, এই মৃত্যু এড়ানো সম্ভব ছিল। তাঁদের অভিযোগ, চিকিৎসার অবহেলা ও প্রশাসনিক গাফিলতিই তাঁকে অকালে প্রাণ দিতে বাধ্য করেছে। পরিবারের এই ক্ষোভ ও প্রশ্ন ধীরে ধীরে জনমতেও প্রতিফলিত হচ্ছে।

গান ছাড়াও প্রলয় চাকী সক্রিয় ছিলেন রাজনীতির ময়দানে। আওয়ামী লীগের সঙ্গে, ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত এই শিল্পী, পাবনা জেলা শাখার সাংস্কৃতিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। সংগীতের পাশাপাশি তিনি, বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উদ্যোগেও যুক্ত ছিলেন, যা তাঁকে দুই জগতেই পরিচিত মুখে পরিণত করেছিল। ও আমার দেশের মাটি থেকে শুরু করে, এইতো এসেছি প্রথম- প্রলয় চাকীকে গান গাইতে, মূলত লাইভ পরিবেশনা বা স্থানীয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বেশি শোনা গেছে।

বাংলাদেশের ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের উত্তাল সময় পরিস্থিতি বদলে যেতে শুরু করে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে নির্বাসনে যাওয়ার পর দেশজুড়ে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হয়। বহু নেতা-কর্মীর সঙ্গে তখন গ্রেফতার হন প্রলয় চাকীও। 

এই ঘটনার প্রেক্ষিতে লেখিকা তসলিমা নাসরিন সামাজিক মাধ্যমে কড়া সমালোচনা করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন সরকার বিরোধিতা সহ্য করতে না পেরে, রাজনৈতিকভাবে অপ্রিয় ব্যক্তিদের গ্রেফতার বা হত্যার আশ্রয় নিচ্ছে। তাঁর দাবি, জেলের ভেতরে মৃত্যুগুলো নিছক অসুস্থতার কারণে হচ্ছে কিনা, নাকি এর পেছনে আরও অন্ধকার কোনো প্রক্রিয়া আছে- তা স্পষ্ট হওয়া জরুরি। তিনি প্রশ্ন তোলেন, জেলে থাকা নাগরিকদের জীবন, নিরাপত্তা এবং বিচার পাওয়ার অধিকার রাষ্ট্র কতটা নিশ্চিত করছে।

তসলিমা লিখছেন, "উড়ে এসে জুড়ে বসা জিহাদি সরকার যাকে পছন্দ হচ্ছে না, তাকেই সন্ত্রাসী পাঠিয়ে খুন করছে, নয়তো জেলে ঢোকাচ্ছে । জেলের ভেতর টুপটাপ মরছেও মানুষ। রোগশোকে মরছে, নাকি মেরে ফেলা হচ্ছে? অধিকাংশের ধারণা মেরে ফেলা হচ্ছে। সংগীত শিল্পী প্রলয় চাকীকেও জেলে নিক্ষেপ করা হয়েছে গত ১৬ই ডিসেম্বরে। কোনও মামলা ছিল না তাঁর বিরুদ্ধে। তাঁর অপরাধ একটিই, তিনি জেলা আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক ছিলেন। আওয়ামী লীগ নামে একটি রাজনৈতিক দল ছিল বাংলাদেশে, সেটির প্রচুর সদস্য ছিল, সমর্থক ছিল। নির্বিচারে সবাইকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলাই এখন জিহাদি সরকারের উদ্দেশ্য। অনেকে প্রাণ বাঁচাতে দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। কিন্তু প্রলয় চাকী পালাতে চান নি। তিনি ভেবেছিলেন তিনি কোনও অন্যায় করেননি, তিনি পালাবেন কেন। খুব সম্ভব নিজেরাই মেরে এখন প্রচার করছে যে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা গেছেন চাকী। যারা জেলে আছে, তাদের সবাইকে কি এক এক করে এরকমভাবে মেরে ফেলা হবে? জেলের বাইরের মবসন্ত্রাস আমরা দেখতে পাচ্ছি। জেলের ভেতরের সন্ত্রাস কিন্তু দেখতে পাচ্ছি না। জেলের ভেতর কীভাবে হত্যাকাণ্ড চলে, তা জানতে চাই আমরা। জেলে যারা আছে, তারাও নাগরিক, তাদেরও নাগরিক অধিকার আছে বাঁচার এবং বিচারে পাওয়ার।"

Post a Comment

Previous Post Next Post