চিনির চড়া দামের সঙ্গে কর্মিসঙ্কট, বিপাকে মফস্‌সলের বেকারি শিল্প



চড়চড়িয়ে বাড়ছে চিনির দাম, যার জেরে নাভিশ্বাস ওঠার জোগাড় সাধারণ মধ্যবিত্তের। সামনেই উৎসবের মরশুম, ফলে আগামী দিনে দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা অমূলক নয়। তবে চিনির এই লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কেবল আমজনতার পকেটে পড়ছে না, মারাত্মক সঙ্কটে ফেলেছে রাজ্যের বেকারি শিল্পকেও।

পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে চিনির দাম বৃদ্ধির চিত্রটি স্পষ্ট বোঝা যায়। ১০ জুন খোলা বাজারে এক কেজি চিনির দাম ছিল ৪৭ টাকা। ২ জুলাই চিনির দাম এক টাকা বেড়ে হয় ৪৮ টাকা প্রতি কেজি। এর পরে ১৪ জুলাই ফের এক টাকা বেড়ে দাম দাঁড়ায় ৪৯ টাকা। ২৭ জুলাই আরও দু’টাকা বেড়ে চিনির দাম ছুঁয়ে ফেলে ৫১ টাকা প্রতি কেজি। ৬ অগস্ট ফের দু’টাকা বৃদ্ধি পাওয়ায় দাম হয় ৫৩ টাকা। তবে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি আসে অগস্ট মাসের ১৯ তারিখে, যখন একলাফে ১২ টাকা বেড়ে চিনির দাম প্রতি কেজিতে পৌঁছয় ৬৫ টাকায়। কোথাও সেই দাম পৌঁছে গিয়েছে ৭০-এ।

চিনির এই আকাশছোঁয়া দামের কারণে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন মফস্‌সল এলাকার বেকারি মালিকরা। বেকারি শিল্পের মূল কাঁচামাল যেমন বনস্পতি, রিফাইন্ড তেল, ময়দা এবং ইস্টের দাম আগেই বেড়েছে। তার সঙ্গে এখন জুড়ল চিনির অনিয়ন্ত্রিত মূল্যবৃদ্ধি। বাজারে এখন একাধিক নামী ও বড় ব্র্যান্ডের বেকারি সংস্থার দাপট। এই তীব্র মূল্যবৃদ্ধির জেরে মফস্‌সলে ছোট ও মাঝারি বেকারি মালিকরা সেই বহুজাতিক ও বড় ব্র্যান্ডগুলির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছেন।

এর সঙ্গেই নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে তীব্র কর্মী সঙ্কট। দক্ষিণ ভারতে বেকারি পণ্যের দাম এই রাজ্যের তুলনায় অনেকটাই বেশি, ফলে সেখানকার কর্মীদের বেতনও বেশ চড়া। এই কারণে এই রাজ্যের অভিজ্ঞ ও দক্ষ বেকারি কর্মীদের একটা বড় অংশ এখন কাজ ছেড়ে দক্ষিণ ভারতের উদ্দেশে পাড়ি দিচ্ছেন।

দুর্গাপুর ও তার আশপাশে দীর্ঘদিন ধরে বেকারি ব্যবসা চালিয়ে আসছেন আবু জাফর। বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর বক্তব্য, ‘মূল্যবৃদ্ধির জেরে বেকারি ব্যবসায়ীর ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে পড়ছি। বহুজাতিক বেকারি সংস্থার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পেরে উঠছি না। কম দামে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছি। একটা নামী ব্র্যান্ড ১০ টাকায় ফ্রুট কেক বিক্রি করছে। একই পণ্য আমি যদি সামান্য বেশি দামে বিক্রি করি, তা হলে কি গ্রাহক আমাদের পণ্য কিনবেন? কিনছে না। লোকসান হচ্ছে। ক্রমশ ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ছেন বেকারি মালিকরা। তার সঙ্গে কর্মী সঙ্কটের সমস্যা তো রয়েছেই। বেকারি শিল্পের কর্মীরা বেশি বেতনের জন্য এখন বেঙ্গালুরু, হায়দারবাদ, চেন্নাইতে চলে যাচ্ছেন। মফসসলের বেকারি শিল্প ও তাদের মালিকরা ভালো নেই।’

অনুরূপ সুর শোনা গেল পানাগড়ের বেকারি মালিক মহম্মদ মজিবুল মিদ্যার গলায়। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘চিনির দাম যে ভাবে বাড়ছে তা কোথায় গিয়ে থামবে বুঝতে পারছি না। অথচ বেকারি আইটেমের দাম বাড়াতে পারছি না। দাম বৃদ্ধি করলে গ্রাহকরা আমাদের প্রোডাক্ট কিনবে না। ওই দামে বড় ব্র্যান্ডের প্রোডাক্ট কিনবে। কী ভাবে ব্যবসা টিকিয়ে রেখেছি তা একমাত্র আমরা জানি। লোকসানের বোঝা টানতে না-পেরে বহু বেকারি বন্ধ হয়ে গিয়েছে।’

এই কঠিন পরিস্থিতিতে বেকারি শিল্পকে ধ্বংসের হাত থেকে একমাত্র রাজ্য সরকারই বাঁচাতে পারে বলে মনে করছেন কাঁচামাল সরবরাহকারী একটি বহুজাতিক সংস্থার পূর্বাঞ্চলের বিপণন প্রধান দেবাশিস দাস। তিনি বলেন, ‘রাজ্য সরকারের উচিত এই বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা। আরও বেশি করে ফুড প্রসেসিং ইউনিট গড়ে তুলতে হবে রাজ্যে। তা হলে ভিন রাজ্য থেকে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে না। উৎপাদন খরচ কমবে। এখানকার বেকারি শিল্প চাঙ্গা হলে প্রচুর কর্মসংস্থান হবে।’

Post a Comment

Previous Post Next Post