পাক-সৌদি-তুরস্কের সামরিক চুক্তিতে ‘ইসলামিক নেটো’র জন্ম! বিপদ বুঝে ইহুদিদের সঙ্গে ‘ষড়ভুজ জোটে’ ভারত?


পশ্চিম এশিয়ার বদলে যাওয়া ভূকৌশলগত সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের প্রতিরক্ষা চুক্তি। গত ৭ অগস্ট মক্কায় তিন দেশ ‘মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স এগ্রিমেন্ট’-এ সই করেছে। চুক্তির মূল বক্তব্য—তিন দেশের যে কোনও একটির উপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের বিরুদ্ধেই হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
এই চুক্তির পরই আন্তর্জাতিক মহলে ‘ইসলামিক নেটো’ তৈরির আলোচনা ফের জোরদার হয়েছে। তবে তিন দেশ নিজেরা এমন কোনও নাম ব্যবহার করেনি। পাকিস্তানের বিদেশমন্ত্রী ইসহাক দারও জানিয়েছেন, চুক্তিটি ‘সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক’ এবং কোনও নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে নয়। অন্য দেশগুলিও ভবিষ্যতে এই ব্যবস্থায় যোগ দিতে পারে বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ পাকিস্তান-সৌদি-তুরস্ক সমীকরণ?
তিন দেশের সামরিক ও কৌশলগত সক্ষমতা একে অপরের থেকে আলাদা। পাকিস্তানের রয়েছে পারমাণবিক প্রতিরোধ ক্ষমতা ও দীর্ঘ সামরিক অভিজ্ঞতা, তুরস্ক নেটোর সদস্য এবং তার নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প যথেষ্ট শক্তিশালী, আর সৌদি আরবের রয়েছে বিপুল অর্থনৈতিক ও আঞ্চলিক প্রভাব। ফলে তিন দেশের সহযোগিতা পশ্চিম এশিয়ার নিরাপত্তা কাঠামোয় নতুন ভারসাম্য তৈরি করতে পারে বলে বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন।
তবে এটিকে সরাসরি নেটোর সমতুল্য সামরিক জোট বলা নিয়েও সতর্কতা রয়েছে। নেটোর মতো বিস্তৃত সাংগঠনিক কাঠামো, কমান্ড ব্যবস্থা বা দীর্ঘদিনের যৌথ সামরিক পরিকাঠামো এই নতুন চুক্তির ক্ষেত্রে এখনও নেই।
নজরে ভারতের অবস্থান
এই পরিস্থিতির আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ভারতের সঙ্গে ইজরায়েলের ঘনিষ্ঠ কৌশলগত সম্পর্ক এবং পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে গ্রিস ও সাইপ্রাসের সঙ্গে নয়াদিল্লির ক্রমবর্ধমান যোগাযোগ। ২০২৬ সালে ভারত ও গ্রিস প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি পাঁচ বছরের একটি রোডম্যাপ তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে।
এর মধ্যেই ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ‘হেক্সাগন’ বা ‘ষড়ভুজ’ জোটের একটি বৃহত্তর ধারণার কথা বলেছেন। তাঁর পরিকল্পনায় ভারত, গ্রিস ও সাইপ্রাসের পাশাপাশি আরব, আফ্রিকান ও এশীয় কয়েকটি দেশকে নিয়ে একটি বিস্তৃত কৌশলগত নেটওয়ার্কের কথা রয়েছে।
অর্থাৎ, পাকিস্তান-সৌদি-তুরস্কের প্রতিরক্ষা সমীকরণ যেমন এক দিকে নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর ইঙ্গিত দিচ্ছে, অন্য দিকে ইজরায়েল-ভারত-গ্রিস-সাইপ্রাসের ঘনিষ্ঠতাও নতুন কৌশলগত মাত্রা পাচ্ছে। গ্রিস, সাইপ্রাস ও ইজরায়েল ইতিমধ্যেই যৌথ সামরিক মহড়া এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর পথে এগিয়েছে।
‘ষড়ভুজ জোটে’ কি সত্যিই ভারত?
এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। ইজরায়েলের ‘হেক্সাগন’ ধারণা এখনও কোনও পূর্ণাঙ্গ, আনুষ্ঠানিক ছয় দেশের সামরিক জোট নয়। কোন কোন দেশ শেষ পর্যন্ত এর অংশ হবে, তারও নির্দিষ্ট সরকারি তালিকা প্রকাশিত হয়নি। তাই পাকিস্তান-সৌদি-তুরস্কের চুক্তির জবাব হিসেবে ভারত ইতিমধ্যেই কোনও ‘ষড়ভুজ সামরিক জোটে’ যোগ দিয়েছে—এমন দাবি করার মতো প্রমাণ নেই।
বরং নয়াদিল্লির কৌশলগত অবস্থানকে একাধিক দেশের সঙ্গে পৃথক পৃথক অংশীদারিত্ব বাড়ানোর নীতি হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত। ভারত এক দিকে ইজরায়েলের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বজায় রাখছে, অন্য দিকে গ্রিস ও সাইপ্রাসের সঙ্গে সম্পর্কও জোরদার করছে। ভারতীয় নীতির ক্ষেত্রে পশ্চিম এশিয়া, ভূমধ্যসাগর এবং ইন্দো-মেডিটেরেনিয়ান সংযোগ ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বদলাচ্ছে পশ্চিম এশিয়ার সমীকরণ
সব মিলিয়ে পাকিস্তান-সৌদি-তুরস্কের নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং ইজরায়েলের ‘হেক্সাগন’ ভাবনা—দুই ঘটনাই পশ্চিম এশিয়ার নিরাপত্তা রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে এখনই দুটি আলাদা ‘সামরিক ব্লক’ তৈরি হয়ে গিয়েছে বলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সময়ের আগে হবে।
ভারতের সামনে তাই বড় চ্যালেঞ্জ হল—পাকিস্তানের সঙ্গে সরাসরি বিরোধ থাকা সত্ত্বেও সৌদি আরব ও উপসাগরীয় দেশগুলির সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা এবং একই সঙ্গে ইজরায়েল, গ্রিস ও সাইপ্রাসের সঙ্গে কৌশলগত সহযোগিতা আরও গভীর করা। আগামী দিনে এই ভারসাম্যই নয়াদিল্লির পশ্চিম এশিয়া নীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।

Post a Comment

Previous Post Next Post