মেলেনি রাফালের সোর্স কোড, তবু ভরসা ফ্রান্সকেই! ষষ্ঠ প্রজন্মের জেট বানাতে বড় ঝুঁকি নিচ্ছে নয়াদিল্লি?


রাফাল যুদ্ধবিমান ঘিরে ভারত-ফ্রান্সের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও এক নতুন অধ্যায়ের দিকে এগোচ্ছে। একদিকে ১১৪টি রাফাল কেনার প্রক্রিয়া এগোচ্ছে, অন্যদিকে ফ্রান্সের নেতৃত্বাধীন ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান কর্মসূচিতে ভারতের যোগদানের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। কিন্তু এর মধ্যেই উঠছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—রাফালের গুরুত্বপূর্ণ সফটওয়্যারের সোর্স কোড নিয়েই যেখানে মতপার্থক্য রয়েছে, সেখানে ভবিষ্যতের আরও জটিল যুদ্ধবিমান তৈরিতে ফ্রান্সের উপর এতটা আস্থা রাখা কতটা নিরাপদ?
সম্প্রতি প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, রাফালের গুরুত্বপূর্ণ সফটওয়্যার ও মিশন-সিস্টেমের পূর্ণ সোর্স কোড ভারতকে দেওয়ার বিষয়ে ফ্রান্সের আপত্তি রয়েছে। ভারতীয় প্রতিরক্ষা মহলে এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ নিজস্ব অস্ত্র ও দেশীয় প্রযুক্তি রাফালে সংযুক্ত করার ক্ষেত্রে সফটওয়্যার-নির্ভরতা বড় বিষয়। তবে ভারতীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের সঙ্গে যুক্ত সূত্রের বক্তব্য অনুযায়ী, বিদেশি নির্মাতাদের কাছ থেকে সম্পূর্ণ মালিকানাধীন সোর্স কোড পাওয়া সাধারণত অত্যন্ত বিরল; বরং দেশীয় অস্ত্র ও সিস্টেম সংযুক্ত করার মতো প্রয়োজনীয় সক্ষমতা নিশ্চিত করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
রাফালের পর এবার ষষ্ঠ প্রজন্ম
এই পরিস্থিতির মধ্যেই ফ্রান্সের নেতৃত্বাধীন Future Combat Air System বা FCAS কর্মসূচি ভারতের সামনে নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, জার্মানি এই উদ্যোগ থেকে সরে যাওয়ার পর ভারত ফ্রান্সের সঙ্গে সম্ভাব্য অংশীদার হিসেবে কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে। ভারতীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রক জানিয়েছে, এ নিয়ে ফ্রান্সের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান বলতে শুধু একটি নতুন বিমান নয়—তার সঙ্গে উন্নত সেন্সর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর ব্যবস্থা, মানববিহীন প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে সমন্বয় এবং অত্যাধুনিক নেটওয়ার্ক-কেন্দ্রিক যুদ্ধক্ষমতার মতো প্রযুক্তির সমন্বিত ব্যবস্থা বোঝানো হয়। ফলে এই ধরনের প্রকল্পে অংশগ্রহণ করলে ভারতের নিজস্ব বিমান-প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য বড় সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তাহলে ঝুঁকি কোথায়?
মূল প্রশ্নটি প্রযুক্তি হস্তান্তর ও নিয়ন্ত্রণ ঘিরে। রাফালের ক্ষেত্রে পূর্ণ সোর্স কোড না পাওয়ার অভিযোগ যদি সত্যি হয়, তাহলে ভবিষ্যতের যৌথ প্রকল্পে ভারত কতটা প্রযুক্তিগত স্বাধীনতা পাবে, সেটিই বড় প্রশ্ন।
অন্যদিকে, সম্পূর্ণ নিজস্ব ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান তৈরি করতে গেলে দীর্ঘ সময়, বিপুল অর্থ এবং অত্যন্ত জটিল প্রযুক্তিগত সক্ষমতার প্রয়োজন। সেই জায়গায় ফ্রান্সের মতো অভিজ্ঞ বিমান নির্মাতা দেশের সঙ্গে যৌথ উন্নয়ন ভারতের জন্য সময় ও প্রযুক্তিগত ঝুঁকি কমাতে পারে।
রাফাল চুক্তি কি বড় সেতু?
রাফাল নিয়ে দু’দেশের সহযোগিতা ইতিমধ্যেই গভীর হয়েছে। ১১৪টি রাফাল কেনার প্রস্তাবে ভারতে বড় পরিসরে উৎপাদনের বিষয়টিও রয়েছে। সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, ফ্রান্স এই চুক্তির জন্য প্রযুক্তিগত ও বাণিজ্যিক প্রস্তাব জমা দিয়েছে।
ফলে নয়াদিল্লির হিসাবটা সম্ভবত শুধু আরও যুদ্ধবিমান কেনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রাফাল, ভবিষ্যৎ ইঞ্জিন সহযোগিতা এবং ষষ্ঠ প্রজন্মের বিমান প্রকল্প—এই একাধিক স্তরের সহযোগিতাকে দীর্ঘমেয়াদি বিমান-প্রযুক্তি অংশীদারিত্বে পরিণত করার চেষ্টা হতে পারে।
বড় পরীক্ষা ভারতের জন্যও
তবে এই অংশীদারিত্ব ভারতের জন্য নিঃশর্ত সাফল্য নয়। যৌথ প্রকল্পে ভারতের কতটা নকশাগত অধিকার থাকবে, প্রযুক্তি হস্তান্তরের পরিধি কতটা হবে, দেশীয় সংস্থাগুলি কতটা কাজ পাবে এবং ভবিষ্যতে বিমানটির উন্নয়ন বা পরিবর্তনে ভারত কতটা স্বাধীন থাকবে—এসব বিষয় চুক্তির শর্তের উপর নির্ভর করবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, বিদেশি সহযোগিতার পাশাপাশি ভারতের নিজস্ব AMCA কর্মসূচিও যেন পিছিয়ে না যায়। কারণ দীর্ঘমেয়াদে প্রকৃত প্রযুক্তিগত আত্মনির্ভরতার মাপকাঠি হবে নিজস্ব নকশা, ইঞ্জিন, সফটওয়্যার এবং বিমান-প্রযুক্তি বিকাশের সক্ষমতা।
অর্থাৎ, ফ্রান্সের উপর আস্থা রাখা একেবারে অযৌক্তিক নয়। বরং অত্যাধুনিক প্রযুক্তি অর্জনের ক্ষেত্রে এটি ভারতের জন্য বড় সুযোগ হতে পারে। কিন্তু রাফালের সোর্স কোড নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে—ভবিষ্যতের যে কোনও যৌথ প্রকল্পে শুধু অত্যাধুনিক বিমান পাওয়া নয়, প্রযুক্তির উপর কতটা নিয়ন্ত্রণ থাকবে, সেটিই নয়াদিল্লির কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হওয়া উচিত।

Post a Comment

Previous Post Next Post