কোথাও ‘অস্তিত্বহীন’ শিক্ষক! কারও বেতন প্রাপ্যের ১০ গুণ! বিহারে শিক্ষা দফতরের পোর্টালে ‘কেলেঙ্কারি’ মেনে নিলেন মন্ত্রীও


# কোথাও ‘অস্তিত্বহীন’ শিক্ষক, কারও অ্যাকাউন্টে প্রাপ্যের ১০ গুণ বেতন! বিহারের শিক্ষা দফতরের পোর্টালে বড়সড় দুর্নীতির অভিযোগ, তদন্তে নামল পুলিশ

**পটনা:** কোথাও এমন শিক্ষকের নামে বেতন তোলার অভিযোগ, যাঁর বাস্তবে কোনও অস্তিত্বই নেই। আবার কোথাও এক শিক্ষকের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ঢুকেছে প্রাপ্য বেতনের আট থেকে দশ গুণ টাকা! বিহারের শিক্ষা দফতরের বেতন সংক্রান্ত অনলাইন ব্যবস্থায় এমনই একাধিক গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে। সরকারি পোর্টালের অভ্যন্তরীণ অডিটে ধরা পড়েছে বেতন সংক্রান্ত নথিতে কারচুপি, অনুমোদনহীন ভাতা যোগ করা এবং লগইন তথ্যের অপব্যবহারের মতো একাধিক বিষয়। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এই ধরনের অনিয়মের মাধ্যমে প্রায় ১ কোটি ৮৫ লক্ষ টাকার অবৈধ লেনদেন হয়ে থাকতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। পাশাপাশি অভিযুক্ত আধিকারিকদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় পদক্ষেপও করা হয়েছে। অন্তত চার জন আধিকারিককে নিলম্বিত করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।

বিহারের শিক্ষা দফতরের হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এইচআরএমএস) পোর্টালকে ঘিরে এই অভিযোগ সামনে আসার পর রাজ্যজুড়ে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। সরকারি কর্মীদের বেতন সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ, বেতনের হিসাব তৈরি এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কাজের জন্য এই ধরনের ডিজিটাল ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়। সেই ব্যবস্থাতেই কী ভাবে এত বড় অঙ্কের আর্থিক গরমিল হল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। সরকারি ব্যবস্থার নিরাপত্তা এবং বেতন সংক্রান্ত নথি যাচাইয়ের প্রক্রিয়া নিয়েও উঠছে প্রশ্ন।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিহারের পটনা, নওয়াদা এবং ভাগলপুর—এই তিন জেলায় অন্তত তিনটি ঘটনায় গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে। সরকারের অভ্যন্তরীণ অডিটে এই গরমিলগুলি ধরা পড়ে। প্রাথমিক ভাবে সন্দেহ করা হচ্ছে, লগইন সংক্রান্ত তথ্যের অপব্যবহার করে বেতনের নথিতে পরিবর্তন করা হয়েছিল। কোথাও শিক্ষকের বেতনের সঙ্গে অনুমোদনহীন ভাতা যোগ করা হয়েছে বলে অভিযোগ, আবার কোথাও বেতন প্রদানের হিসাবেই অস্বাভাবিক অঙ্কের টাকা দেখা গিয়েছে।

ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা করে পুলিশি তদন্তের পাশাপাশি বিভাগীয় তদন্তও শুরু হয়েছে। কী ভাবে এই অনিয়ম ঘটল, কারা এর সঙ্গে যুক্ত এবং সরকারি অর্থের কতটা অপব্যবহার হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগের পূর্ণ চিত্র স্পষ্ট হবে না।

### প্রাপ্য ৪৬ হাজার, অ্যাকাউন্টে ঢুকল প্রায় ৫ লক্ষ টাকা!

এইচআরএমএস পোর্টালে অনিয়মের অভিযোগ প্রথম প্রকাশ্যে আসে নওয়াদা জেলায়। সেখানে এক প্রাথমিক স্কুলশিক্ষকের বেতন নিয়ে অস্বাভাবিক গরমিলের অভিযোগ ওঠে। নওয়াদার জেলা শিক্ষা আধিকারিক এই ঘটনায় স্থানীয় থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। তাঁর অভিযোগ, জেলার রাজৌলি এলাকার এক প্রাথমিক স্কুলশিক্ষক নির্ধারিত বেতনের তুলনায় অনেক বেশি টাকা পাচ্ছিলেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, গত বছরের এপ্রিল মাসে ওই শিক্ষকের প্রাপ্য বেতন ছিল ৪৬ হাজার ৭৭২ টাকা। কিন্তু তাঁর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমা পড়ে ৪ লক্ষ ৯১ হাজার ৭৭২ টাকা। অর্থাৎ, নির্ধারিত বেতনের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি অর্থ পেয়েছিলেন তিনি। শুধু এপ্রিল মাসেই নয়, পরের মাসেও একই ধরনের আর্থিক গরমিলের অভিযোগ সামনে আসে। ওই মাসে তাঁর অ্যাকাউন্টে ৩ লক্ষ ৪৯ হাজার ৫০০ টাকা বেতন জমা পড়েছিল বলে অভিযোগ।

একজন প্রাথমিক স্কুলশিক্ষকের মাসিক বেতনের অঙ্কের সঙ্গে জমা পড়া টাকার এত বড় পার্থক্য কী ভাবে তৈরি হল, তা নিয়েই তদন্তকারীদের প্রশ্ন। বেতন নির্ধারণের সময় কোনও ভুল হয়েছিল, নাকি পরিকল্পিত ভাবে নথিতে পরিবর্তন করা হয়েছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

জেলা শিক্ষা আধিকারিকের অভিযোগ, এই ঘটনার সঙ্গে শুধু ওই শিক্ষকই নন, শিক্ষা দফতরের আরও দুই কর্মীর ভূমিকা থাকতে পারে। ওই দুই কর্মীর মধ্যে একজন বেতনের নথি তৈরি করার দায়িত্বে ছিলেন। অন্য জনের কাজ ছিল সেই নথি যাচাই করা। অভিযোগ, বেতন সংক্রান্ত নথি তৈরি এবং যাচাইয়ের দায়িত্বে থাকা কর্মীদের মাধ্যমেই অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়েছিল।

### ‘অন্যান্য ভাতা’র নামে লক্ষ লক্ষ টাকা যোগের অভিযোগ

তদন্তে উঠে আসা অভিযোগ অনুযায়ী, ওই শিক্ষকের বেতনের নথিতে অনুমোদন ছাড়াই ‘অন্যান্য ভাতা’ হিসেবে অতিরিক্ত টাকা যোগ করা হয়েছিল। শুধু নির্ধারিত বেতনের অঙ্ক বাড়ানোই নয়, ভাতার খাতেও বিপুল পরিমাণ অর্থ দেখানো হয়েছিল বলে অভিযোগ।

জেলা শিক্ষা আধিকারিকের দাবি অনুযায়ী, গত বছরের এপ্রিল মাসে ওই শিক্ষকের বেতনের নথিতে অনুমোদনহীন ভাবে ৪ লক্ষ ৫২ হাজার ২২২ টাকা অতিরিক্ত যোগ করা হয়েছিল। অভিযোগ, পরের মাসেও একই ধরনের অনিয়ম করা হয়। ফলে দু’মাসে ওই শিক্ষকের অ্যাকাউন্টে মোট ১০ লক্ষ ৪৩ হাজার ৯৫০ টাকা জমা পড়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।

এই বিপুল অঙ্কের টাকা কী ভাবে অনুমোদন পেল, বেতনের হিসাব তৈরির সময় তা কারও নজরে এল না কেন এবং যাচাইয়ের দায়িত্বে থাকা কর্মীরা কী ভূমিকা পালন করেছিলেন, সেই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজছেন তদন্তকারীরা। সরকারি বেতন ব্যবস্থায় একাধিক স্তরে নথি যাচাইয়ের ব্যবস্থা থাকার কথা। তা সত্ত্বেও কী ভাবে এমন ঘটনা ঘটল, তা নিয়েই প্রশাসনিক মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

তবে এই ঘটনায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও কর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে। আর্থিক গরমিলের প্রকৃত কারণ এবং কারা এর জন্য দায়ী, তা এখনও তদন্তসাপেক্ষ।

### তিন জেলায় অনিয়ম, তদন্তে বিশেষ নজর লগইন তথ্যের অপব্যবহারে

নওয়াদার ঘটনা সামনে আসার পর বিহারের অন্যান্য জেলাতেও একই ধরনের অনিয়ম হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে শুরু করে শিক্ষা দফতর। অভ্যন্তরীণ অডিটে পটনা এবং ভাগলপুরেও বেতন সংক্রান্ত গরমিলের অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে। ফলে বিষয়টি আর একটি জেলার বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখছে না প্রশাসন।

প্রাথমিক ভাবে তদন্তকারীদের সন্দেহ, এইচআরএমএস পোর্টালে ব্যবহৃত লগইন তথ্যের অপব্যবহার করে বেতনের নথিতে পরিবর্তন করা হয়ে থাকতে পারে। সরকারি পোর্টালে কারা প্রবেশ করেছিলেন, কোন ব্যবহারকারীর লগইন থেকে বেতনের তথ্য পরিবর্তন করা হয়েছিল এবং সংশ্লিষ্ট পরিবর্তনের জন্য যথাযথ অনুমোদন ছিল কি না, সেগুলি খতিয়ে দেখা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ডিজিটাল ব্যবস্থায় বেতন সংক্রান্ত নথি তৈরি ও যাচাইয়ের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট দায়িত্ব বণ্টন করা থাকে। সেই ব্যবস্থায় কোনও কর্মী নিজের অনুমোদিত দায়িত্বের বাইরে গিয়ে পরিবর্তন করতে পেরেছিলেন কি না, কিংবা অন্য কারও লগইন তথ্য ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, তা তদন্তে স্পষ্ট হতে পারে। পাশাপাশি, অস্বাভাবিক অঙ্কের বেতন জমা পড়ার পরও কেন দ্রুত বিষয়টি ধরা পড়েনি, সেই প্রশ্নও উঠছে।

অভ্যন্তরীণ অডিটের মাধ্যমে একাধিক গরমিল সামনে আসার পর পুলিশি তদন্তের পাশাপাশি বিভাগীয় স্তরে পদক্ষেপ করা হয়েছে। অন্তত চার জন আধিকারিককে নিলম্বিত করার কথা জানা গিয়েছে। তবে তাঁদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে ঠিক কী অভিযোগ রয়েছে এবং তদন্তে তাঁদের ভূমিকা কতটা, তা বিস্তারিত ভাবে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

### অভিযোগ স্বীকার শিক্ষামন্ত্রীর, ৩৮ জেলাতেই অডিট

বিহারের শিক্ষা দফতরের পোর্টাল নিয়ে ওঠা অভিযোগের গুরুত্ব স্বীকার করেছেন রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী মিথিলেশ তিওয়ারি। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় তিনি জানিয়েছেন, যে তিনটি ঘটনার কথা সামনে এসেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। রাজ্যের ৩৮টি জেলাতেই অভ্যন্তরীণ অডিট চালানো হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

শিক্ষা দফতরের বেতন ব্যবস্থায় যাতে ভবিষ্যতে এই ধরনের কারচুপি না ঘটে, তা নিশ্চিত করাই এখন সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। সেই কারণে এইচআরএমএস পোর্টালের নিরাপত্তা ও কার্যপ্রণালী খতিয়ে দেখতে বিশেষজ্ঞদের সাহায্য নেওয়া হচ্ছে। পোর্টালে অননুমোদিত প্রবেশ, নথি পরিবর্তন এবং বেতন প্রদানের প্রক্রিয়ায় কোথাও দুর্বলতা রয়েছে কি না, তা খুঁজে দেখার চেষ্টা চলছে।

শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, দুর্নীতিগ্রস্ত শিক্ষক এবং আধিকারিকদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ করা হবে। অর্থাৎ, তদন্তে কারও বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বার্তাই দিয়েছে সরকার। তবে শুধু অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করাই নয়, গোটা ব্যবস্থায় কোথায় ত্রুটি রয়েছে, তা চিহ্নিত করে সংশোধন করাও জরুরি বলে মনে করছে প্রশাসন।

### ১ কোটি ৮৫ লক্ষ টাকার সম্ভাব্য অনিয়ম, বাড়ছে প্রশ্ন

প্রাথমিক অনুমান অনুযায়ী, বিহারের শিক্ষা দফতরের এই বেতন সংক্রান্ত অনিয়মে প্রায় ১ কোটি ৮৫ লক্ষ টাকার অবৈধ লেনদেন হয়ে থাকতে পারে। যদিও এই অঙ্ক চূড়ান্ত নয়। তদন্ত এবং অডিটের কাজ এগোলে প্রকৃত আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

এই ঘটনায় একাধিক প্রশ্ন সামনে এসেছে। সরকারি পোর্টালে বেতন সংক্রান্ত তথ্য পরিবর্তনের সুযোগ কী ভাবে তৈরি হল? অনুমোদন ছাড়া অতিরিক্ত ভাতা যোগ করা হলে তা যাচাইয়ের সময় ধরা পড়ল না কেন? বেতনের নথি তৈরি ও অনুমোদনের দায়িত্বে থাকা কর্মীদের ভূমিকা কী ছিল? আর কোনও জেলায় একই ধরনের অনিয়ম হয়েছে কি না?

এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতেই এখন বিহারের ৩৮টি জেলায় অডিটের দিকে নজর রয়েছে। তিনটি জেলার ঘটনায় যে ধরনের অভিযোগ সামনে এসেছে, তা অন্য জেলাগুলিতেও রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে। একই সঙ্গে পোর্টালের নিরাপত্তা জোরদার করে ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম ঠেকানোর চেষ্টা করছে সরকার।

সব মিলিয়ে, বিহারের শিক্ষা দফতরের এইচআরএমএস পোর্টাল ঘিরে ওঠা অভিযোগ রাজ্যের সরকারি বেতন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। অস্তিত্বহীন শিক্ষকের নামে টাকা তোলা থেকে শুরু করে প্রাপ্যের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি বেতন জমা পড়ার অভিযোগ—প্রতিটি ঘটনাই প্রশাসনিক নজরদারি ও আর্থিক নিয়ন্ত্রণের গুরুত্ব সামনে এনেছে। এখন নজর পুলিশি তদন্ত, ৩৮ জেলায় অডিটের ফল এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।

Post a Comment

Previous Post Next Post