### ক্ষমা চেয়েও রেহাই নেই এমবাপের! মাও জ়ে দংকে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য, চুক্তি বাতিল তিন চিনা সংস্থার, চাপে লা লিগাও
চিনের বিপ্লবী নেতা মাও জ়ে দংকে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করে বিপাকে পড়েছেন ফরাসি ফুটবল তারকা কিলিয়ান এমবাপে। নিজের মন্তব্যের জন্য প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়েও পরিস্থিতি সামাল দিতে পারছেন না রিয়াল মাদ্রিদের এই তারকা। ইতিমধ্যেই চিনের তিনটি সংস্থা এমবাপের সঙ্গে বাণিজ্যিক চুক্তি বাতিল করার কথা ঘোষণা করেছে। শুধু তাই নয়, এই বিতর্কের আঁচ পড়তে শুরু করেছে স্পেনের ফুটবল লিগ লা লিগার উপরেও। চিনে লা লিগার সম্প্রচার বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর সামনে আসার পাশাপাশি, সে দেশের সংস্থাগুলির সঙ্গে লিগ কর্তৃপক্ষের বাণিজ্যিক সম্পর্ক নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। পরিস্থিতি সামাল দিতে চিনের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠক করতে হয়েছে লা লিগার সভাপতি জেভিয়ার তেবাসকে।
ফুটবল মাঠের পারফরম্যান্সের জন্য বরাবরই আলোচনায় থাকেন এমবাপে। কিন্তু এ বার মাঠের বাইরের একটি মন্তব্যই তাঁর জন্য বড়সড় সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চিনের মানুষের ভাবাবেগে আঘাত দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। বিতর্কের সূত্রপাত একটি জনপ্রিয় ইন্টারনেট মিম এবং তা নিয়ে এমবাপের মন্তব্য থেকে। প্রথমে বিষয়টি নিছক মজা হিসেবেই দেখা হলেও, পরে তা আন্তর্জাতিক স্তরে বিতর্কের রূপ নেয়। পরিস্থিতি বুঝে ক্ষমা চেয়েছেন এমবাপে। কিন্তু তাতেও ক্ষোভ প্রশমিত হয়নি চিনে।
ক্ষমা চেয়েও থামাতে পারলেন না বিতর্ক
বিতর্ক বাড়তে থাকায় মঙ্গলবার রাতে সমাজমাধ্যমে নিজের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দেন এমবাপে। একই সঙ্গে তাঁর মন্তব্যে যাঁরা আঘাত পেয়েছেন, তাঁদের কাছে ক্ষমাও চান তিনি। ফরাসি তারকার বক্তব্য, তাঁর কথার ভুল ব্যাখ্যা হয়েছে। তবে তাঁর মন্তব্যের কারণে চিনের বহু মানুষ এবং চিনা সম্প্রদায়ের সদস্যরা যে দুঃখ পেয়েছেন, তা তিনি বুঝতে পেরেছেন বলেও জানান।
এমবাপে লেখেন, তাঁর মন্তব্যের ফলে যাঁরা ব্যথিত হয়েছেন, তাঁদের প্রত্যেকের কাছে তিনি ক্ষমাপ্রার্থী। কাউকে আঘাত করা তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না বলেও স্পষ্ট করেন তিনি। চিনের মানুষ এবং সে দেশের ইতিহাসের প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে বলে জানান রিয়াল মাদ্রিদের তারকা। নিজের ভুলের জন্য দুঃখপ্রকাশ করলেও সেই বার্তা বিতর্ক থামাতে যথেষ্ট হয়নি। বরং তার আগেই একাধিক চিনা সংস্থা তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছে।
এমবাপের সঙ্গে চুক্তি বাতিল তিন চিনা সংস্থার
এই বিতর্কের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে এমবাপের বাণিজ্যিক চুক্তিগুলির উপর। চিনের তিনটি সংস্থা মঙ্গলবারই জানিয়ে দিয়েছে, তারা আর ফরাসি ফুটবলারের সঙ্গে চুক্তি বজায় রাখবে না। সংস্থাগুলির বক্তব্য, এমবাপের মন্তব্য চিনের মানুষের ভাবাবেগে আঘাত করেছে। দেশের মানুষের অনুভূতিকে অসম্মান করা হয়েছে বলে মনে করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তিনটি সংস্থার বিবৃতির মূল বক্তব্যও প্রায় একই। তাদের মতে, চিনের মানুষের প্রতি সম্মান এবং দেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতির প্রতি সংবেদনশীলতা বজায় রাখা প্রয়োজন। এমবাপের মন্তব্য সেই প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলেই তারা মনে করছে।
এখানেই শেষ নয়। ফুটবলভিত্তিক ভিডিয়ো গেম তৈরি করে এমন একটি চিনা সংস্থাও তাদের প্ল্যাটফর্ম থেকে এমবাপে সম্পর্কিত যাবতীয় তথ্য ও ছবি সরিয়ে দিয়েছে বলে জানা গিয়েছে। ফলে বিতর্কের জেরে শুধু স্পনসরশিপ নয়, চিনের বাজারে এমবাপের ভাবমূর্তি এবং বাণিজ্যিক উপস্থিতিও ধাক্কা খেতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় ফুটবলার এমবাপে। তাঁর জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন সংস্থা নিজেদের পণ্য ও পরিষেবার প্রচার করে। কিন্তু এই বিতর্কের পর চিনের বাজারে সেই বাণিজ্যিক সম্পর্ক কতটা বজায় থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ক্ষমা চাওয়ার পরেও সংস্থাগুলি তাদের সিদ্ধান্ত বদল না করায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
মাও জ়ে দংকে নিয়ে কী বলেছিলেন এমবাপে?
এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে একটি দীর্ঘদিনের জনপ্রিয় ইন্টারনেট মিম। চিনের প্রাক্তন বিপ্লবী নেতা মাও জ়ে দংয়ের ছবির সঙ্গে এমবাপের মুখ বসিয়ে তৈরি করা ওই মিম ফুটবলপ্রেমীদের একাংশের মধ্যে বেশ পরিচিত। সেই মিমকে কেন্দ্র করেই এমবাপেকে নিয়ে ‘ডিক্টেটর’ নামের একটি ব্যঙ্গাত্মক পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে।
সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকারে এই মিম নিয়ে প্রশ্ন করা হলে এমবাপে জানান, মিমটি তাঁরও পছন্দের। এই পর্যন্ত বিষয়টি নিছক মজার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু এর পরেই তাঁর একটি মন্তব্য ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়। মাও জ়ে দং সম্পর্কে বলতে গিয়ে এমবাপে বলেন, “উনি যেন কে একটা। মনে হয় চিনের কোনও ডিক্টেটর।”
এই মন্তব্যকেই অসম্মানজনক বলে মনে করেছেন চিনের বহু মানুষ। তাঁদের অভিযোগ, দেশের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে নিয়ে এ ভাবে মন্তব্য করা উচিত হয়নি। বিশেষ করে চিনের মতো দেশে জাতীয় ইতিহাস এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বকে ঘিরে মানুষের আবেগের বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। ফলে এমবাপের মন্তব্যকে নিছক মজা হিসেবে দেখেননি অনেকেই।
যদিও এমবাপের বক্তব্যের প্রেক্ষাপট ছিল একটি জনপ্রিয় মিম, তবুও তাঁর মন্তব্যের প্রভাব যে এতটা বড় হতে পারে, তা সম্ভবত ভাবেননি ফরাসি তারকা। এখন সেই কথার জেরেই তাঁকে বাণিজ্যিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে।
চিনে লা লিগার ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন
এমবাপেকে ঘিরে বিতর্কের প্রভাব এবার পড়তে শুরু করেছে লা লিগার উপরেও। স্পেনের অন্যতম জনপ্রিয় ফুটবল প্রতিযোগিতার সঙ্গে চিনের একাধিক সংস্থা যুক্ত রয়েছে। পাশাপাশি চিনের ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যেও লা লিগার যথেষ্ট জনপ্রিয়তা রয়েছে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে চিনে লিগটির সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। ফলে সম্প্রচার এবং বাণিজ্যিক অংশীদারিত্ব—দুই ক্ষেত্রেই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
আশঙ্কা করা হচ্ছে, এমবাপেকে ঘিরে তৈরি হওয়া ক্ষোভের জেরে লা লিগার সঙ্গে যুক্ত চিনা সংস্থাগুলিও নিজেদের চুক্তি নিয়ে নতুন করে ভাবনাচিন্তা করতে পারে। যদিও কোনও সংস্থা চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত নিলে তার প্রভাব কতটা বিস্তৃত হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে এই বিতর্ক যে স্পেনের ফুটবলের জন্য অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে, তা বলাই যায়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে চিনে নিযুক্ত স্পেনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও জিংয়ের সঙ্গে দেখা করেছেন লা লিগার সভাপতি জেভিয়ার তেবাস। চিনের সঙ্গে ফুটবল সংক্রান্ত সম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন তিনি। তেবাসের আশা, একজন ব্যক্তির মন্তব্যের কারণে স্পেনের ফুটবলের প্রতি চিনের মানুষের দীর্ঘদিনের ভালবাসা ও আকর্ষণ নষ্ট হবে না।
একটি মন্তব্যেই বড় ধাক্কা, এখন নজর পরবর্তী পদক্ষেপে
বিশ্ব ফুটবলে এমবাপের জনপ্রিয়তা এবং বাণিজ্যিক গুরুত্ব যথেষ্ট। মাঠে তাঁর সাফল্যের পাশাপাশি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে তাঁর চুক্তিও তাঁকে বিশ্বের অন্যতম পরিচিত ক্রীড়াবিদে পরিণত করেছে। কিন্তু চিনের মতো বড় বাজারে বিতর্ক তৈরি হওয়ায় তাঁর বাণিজ্যিক স্বার্থে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে, লা লিগার ক্ষেত্রেও চিনের বাজার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সে দেশের দর্শকদের কাছে স্পেনের ফুটবলের জনপ্রিয়তা ধরে রাখা এবং বাণিজ্যিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা লিগ কর্তৃপক্ষের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
এমবাপে ক্ষমা চেয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন ঠিকই, কিন্তু তাতে আপাতত বিতর্কের অবসান হয়নি। বরং একের পর এক সংস্থার চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত এবং লা লিগাকে ঘিরে অনিশ্চয়তা বুঝিয়ে দিচ্ছে, আন্তর্জাতিক ক্রীড়াক্ষেত্রে তারকাদের একটি মন্তব্যও কত বড় বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সমস্যার জন্ম দিতে পারে। এখন দেখার, আগামী দিনে এমবাপের ক্ষমাপ্রার্থনা চিনের সংস্থাগুলির মনোভাব বদলাতে পারে কি না এবং লা লিগা শেষ পর্যন্ত এই বিতর্কের আঁচ থেকে নিজেদের কতটা দূরে রাখতে পারে।