### চার বছর পর সিংহাসনচ্যুত জাডেজা! বিশ্বসেরা টেস্ট অলরাউন্ডারের মুকুট উঠল প্রোটিয়া পেসার মার্কো জ্যানসেনের মাথায়
দীর্ঘ চার বছরেরও বেশি সময় ধরে টেস্ট ক্রিকেটে বিশ্বের এক নম্বর অলরাউন্ডারের আসন নিজের দখলে রেখেছিলেন ভারতের তারকা ক্রিকেটার রবীন্দ্র জাডেজা। ব্যাট ও বল হাতে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের সুবাদে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি। কিন্তু ক্রিকেটের মঞ্চে কোনও সিংহাসনই চিরস্থায়ী নয়। এ বার সেই রাজত্বেই ইতি টানলেন দক্ষিণ আফ্রিকার তরুণ বাঁহাতি পেস অলরাউন্ডার মার্কো জ্যানসেন। আইসিসির সর্বশেষ টেস্ট প্লেয়ার র্যাঙ্কিংয়ে জাডেজাকে পিছনে ফেলে বিশ্বের এক নম্বর টেস্ট অলরাউন্ডার হওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করেছেন ২৬ বছর বয়সি এই প্রোটিয়া তারকা।
অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ব্যাট ও বল হাতে দুরন্ত পারফরম্যান্সই জ্যানসেনকে এই সাফল্যের শিখরে পৌঁছে দিয়েছে। শুধু অলরাউন্ডারদের তালিকাতেই নয়, বোলারদের র্যাঙ্কিংয়েও নিজের জায়গা আরও মজবুত করেছেন তিনি। তাঁর এই উত্থান দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেটমহলে নতুন করে আশার আলো জাগিয়েছে। অন্য দিকে, দীর্ঘদিন ধরে শীর্ষস্থান ধরে রাখা জাডেজার জন্য এই র্যাঙ্কিং পরিবর্তন নিঃসন্দেহে একটি বড় ধাক্কা। তবে ক্রিকেটে ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ক্ষমতা থাকলে যে কোনও সময় আবার শীর্ষে ফেরা সম্ভব, তা বলাই বাহুল্য।
### অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে একাই ম্যাচের রং বদলে দিলেন জ্যানসেন
জ্যানসেনের এই উত্থানের নেপথ্যে রয়েছে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে কেবেরহায় অনুষ্ঠিত বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের দ্বিতীয় টেস্টে তাঁর অসাধারণ পারফরম্যান্স। শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ সেই ম্যাচে ব্যাট এবং বল—দুই বিভাগেই নিজের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার এই অলরাউন্ডার। তাঁর পারফরম্যান্স বুঝিয়ে দিয়েছে, আধুনিক টেস্ট ক্রিকেটে একজন কার্যকর অলরাউন্ডার কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন।
প্রথম ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে ৮৫ রানের দুরন্ত ইনিংস খেলেন জ্যানসেন। অস্ট্রেলিয়ার বোলিং আক্রমণের বিরুদ্ধে তাঁর এই লড়াকু ইনিংস দক্ষিণ আফ্রিকাকে গুরুত্বপূর্ণ রান এনে দেয়। ব্যাট হাতে দলের প্রয়োজনের মুহূর্তে দায়িত্ব নেওয়ার পাশাপাশি বল হাতেও বিপক্ষকে চাপে রাখার ক্ষমতা রয়েছে তাঁর। আর সেই দক্ষতারই প্রতিফলন দেখা যায় ম্যাচের পরবর্তী পর্যায়ে।
ব্যাট হাতে নিজের কাজ শেষ করার পর বল হাতে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইন-আপে কার্যত ধস নামান জ্যানসেন। একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ উইকেট তুলে নিয়ে বিপক্ষের রান তোলার গতি আটকে দেন তিনি। তাঁর দাপুটে বোলিংয়ের সামনে সমস্যায় পড়ে অস্ট্রেলিয়ার তারকাখচিত ব্যাটিং বিভাগ। শেষ পর্যন্ত পাঁচটি উইকেট তুলে নিয়ে ম্যাচে নিজের প্রভাব আরও স্পষ্ট করে দেন দক্ষিণ আফ্রিকার এই বাঁহাতি পেসার।
জ্যানসেনের ব্যাটিং ও বোলিংয়ের সম্মিলিত অবদান দক্ষিণ আফ্রিকাকে ম্যাচে গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা এনে দেয়। তাঁর পারফরম্যান্সের উপর ভর করেই অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ঘুরে দাঁড়ায় প্রোটিয়ারা। তিন টেস্টের সিরিজ়ে ১-১ সমতা ফেরানোর ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি ম্যাচে ব্যাট হাতে বড় রান এবং বল হাতে পাঁচ উইকেট—এই দুইয়ের সমন্বয়ই তাঁকে বিশ্বের সেরা অলরাউন্ডারদের তালিকায় শীর্ষে পৌঁছে দেওয়ার অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে।
### ৪৫১ রেটিং পয়েন্ট, জাডেজাকে টপকে কেরিয়ারের সেরা সাফল্য
অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে এই দুরন্ত পারফরম্যান্সের পুরস্কার মিলেছে আইসিসির সর্বশেষ টেস্ট র্যাঙ্কিংয়ে। ৪৫১ রেটিং পয়েন্ট নিয়ে বিশ্বের এক নম্বর টেস্ট অলরাউন্ডার হয়েছেন জ্যানসেন। কেরিয়ারে এই প্রথমবার টেস্ট অলরাউন্ডারদের তালিকায় শীর্ষস্থান দখল করলেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে এই জায়গায় থাকা রবীন্দ্র জাডেজাকে পিছনে ফেলে তাঁর এই উত্থান আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
জাডেজা দীর্ঘ সময় ধরে টেস্ট ক্রিকেটে বিশ্বের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার হিসেবে নিজের পরিচয় প্রতিষ্ঠা করেছেন। ব্যাটিং, বোলিং এবং ফিল্ডিং—তিন বিভাগেই তাঁর দক্ষতা ভারতীয় দলের সম্পদ। বিশেষ করে কঠিন পরিস্থিতিতে ব্যাট হাতে রান করা এবং বল হাতে গুরুত্বপূর্ণ উইকেট তুলে নেওয়ার ক্ষমতা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। সেই কারণেই দীর্ঘ চার বছরেরও বেশি সময় ধরে টেস্ট অলরাউন্ডারদের র্যাঙ্কিংয়ে তাঁর আধিপত্য বজায় ছিল।
কিন্তু জ্যানসেনের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স র্যাঙ্কিংয়ের ছবিটাই বদলে দিয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার মতো শক্তিশালী দলের বিরুদ্ধে চাপের মুখে যেভাবে ব্যাটিং ও বোলিংয়ে নিজের সামর্থ্য তুলে ধরেছেন তিনি, তাতে তাঁর অলরাউন্ডার হিসেবে যোগ্যতা আরও স্পষ্ট হয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ধারাবাহিক উন্নতি এবং গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে কার্যকর ভূমিকা পালনের সুবাদে এবার শীর্ষস্থান দখল করলেন এই প্রোটিয়া ক্রিকেটার।
### শুধু অলরাউন্ডার নন, বোলারদের তালিকাতেও শীর্ষে জ্যানসেন!
জ্যানসেনের সাফল্য অবশ্য শুধু টেস্ট অলরাউন্ডারদের র্যাঙ্কিংয়ে এক নম্বর হওয়াতেই সীমাবদ্ধ নয়। বল হাতে তাঁর সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স তাঁকে বোলারদের তালিকাতেও বড় সাফল্য এনে দিয়েছে। আইসিসির র্যাঙ্কিংয়ে পাঁচ ধাপ এগিয়ে টেস্ট বোলারদের তালিকায় শীর্ষস্থানে উঠে এসেছেন তিনি। পিছনে ফেলেছেন অস্ট্রেলিয়ার অভিজ্ঞ বাঁহাতি পেসার মিচেল স্টার্ককেও।
একজন পেস বোলারের পক্ষে টেস্ট ক্রিকেটে ধারাবাহিকভাবে উইকেট নেওয়ার পাশাপাশি ব্যাট হাতেও উল্লেখযোগ্য অবদান রাখা সহজ কাজ নয়। কিন্তু জ্যানসেন নিজের পারফরম্যান্সের মাধ্যমে সেই চ্যালেঞ্জকেই সাফল্যের সঙ্গে সামলাচ্ছেন। তাঁর উচ্চতা, বাঁহাতি পেস এবং বাউন্স আদায়ের ক্ষমতা তাঁকে প্রতিপক্ষের ব্যাটারদের কাছে কঠিন চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরে। পাশাপাশি লোয়ার অর্ডারে ব্যাট হাতে রান করার দক্ষতাও দলের জন্য বাড়তি সুবিধা এনে দেয়।
অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচে পাঁচ উইকেট নেওয়ার পাশাপাশি ৮৫ রানের ইনিংস খেলা তাঁর এই বহুমুখী দক্ষতারই প্রমাণ। ফলে তাঁকে শুধু একজন পেসার হিসেবে বিচার করলে তাঁর সম্পূর্ণ সামর্থ্য বোঝা সম্ভব নয়। বরং ব্যাটিং ও বোলিং—দুই ক্ষেত্রেই ম্যাচের গতিপথ বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে তাঁর। সেই কারণেই বর্তমান টেস্ট ক্রিকেটে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অলরাউন্ডার হিসেবে উঠে এসেছেন জ্যানসেন।
### ব্যাটারদের র্যাঙ্কিংয়েও উন্নতি, এক ধাক্কায় ১৩ ধাপ উপরে
অলরাউন্ডার ও বোলারদের তালিকায় শীর্ষে ওঠার পাশাপাশি ব্যাটারদের র্যাঙ্কিংয়েও উন্নতি করেছেন জ্যানসেন। আইসিসির সর্বশেষ তালিকায় ১৩ ধাপ এগিয়ে ৫৬তম স্থানে উঠে এসেছেন তিনি। অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ব্যাট হাতে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস যে র্যাঙ্কিংয়ে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে, তা এই অগ্রগতিতেই স্পষ্ট।
সাধারণত পেসারদের ক্ষেত্রে ব্যাটিংয়ের অবদান অনেক সময়ই বোলিংয়ের আড়ালে থেকে যায়। কিন্তু জ্যানসেনের মতো ক্রিকেটারদের ক্ষেত্রে ছবিটা আলাদা। তিনি শুধু উইকেট নেওয়ার জন্য দলের ভরসা নন, প্রয়োজনের মুহূর্তে ব্যাট হাতেও রান করে ম্যাচের পরিস্থিতি বদলে দিতে পারেন। টেস্ট ক্রিকেটে এই ধরনের ক্রিকেটারের গুরুত্ব ক্রমশ বাড়ছে। কারণ দীর্ঘ ফরম্যাটের ক্রিকেটে একজন কার্যকর অলরাউন্ডার দলের ভারসাম্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
জ্যানসেনের সাম্প্রতিক র্যাঙ্কিংয়ের উন্নতি তাই তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্যের পাশাপাশি দক্ষিণ আফ্রিকার দলগত শক্তিরও পরিচায়ক। ব্যাটিং, বোলিং এবং অলরাউন্ডার—তিনটি বিভাগেই উন্নতির ছাপ রেখে নিজের জায়গা আরও শক্তিশালী করেছেন তিনি।
### ডেল স্টেইনের ভবিষ্যদ্বাণী কি সত্যি হতে চলেছে?
জ্যানসেনের এই উত্থান নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে ক্রিকেটবিশ্বেও। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রাক্তন কিংবদন্তি পেসার ডেল স্টেইন আগেই তাঁর প্রতিভা নিয়ে আশাবাদ প্রকাশ করেছিলেন। জ্যানসেনের মধ্যে যে অসাধারণ সম্ভাবনা রয়েছে এবং তিনি ভবিষ্যতে বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হয়ে উঠতে পারেন, সেই ইঙ্গিত আগেই দিয়েছিলেন স্টেইন।
একজন তরুণ ক্রিকেটারের মধ্যে প্রতিভা দেখতে পাওয়া এক বিষয়, আর আন্তর্জাতিক মঞ্চে ধারাবাহিকভাবে সেই প্রতিভার প্রমাণ দেওয়া সম্পূর্ণ অন্য বিষয়। জ্যানসেন সাম্প্রতিক সময়ে নিজের পারফরম্যান্সের মাধ্যমে সেই দ্বিতীয় পরীক্ষাতেও সফল হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছেন। অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে তাঁর ম্যাচজয়ী ভূমিকা এবং আইসিসির র্যাঙ্কিংয়ে একাধিক বিভাগে উন্নতি সেই সম্ভাবনাকেই আরও উজ্জ্বল করেছে।
তবে বিশ্ব ক্রিকেটে দীর্ঘদিন নিজের আধিপত্য বজায় রাখতে হলে জ্যানসেনকে ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে হবে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সূচি, প্রতিপক্ষের কৌশল এবং ম্যাচের পরিস্থিতি—সব কিছুর সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে নিয়মিত ভালো পারফরম্যান্স করতে হবে তাঁকে। বিশেষ করে টেস্ট ক্রিকেটে দীর্ঘ সময় ধরে সাফল্য ধরে রাখা যথেষ্ট কঠিন। ফলে এই শীর্ষস্থান ধরে রাখার চ্যালেঞ্জও তাঁর সামনে থাকবে।
### জাডেজার সামনে কি আবার শীর্ষে ফেরার চ্যালেঞ্জ?
অন্য দিকে, র্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষস্থান হারালেও রবীন্দ্র জাডেজার গুরুত্ব একেবারেই কমে যাচ্ছে না। ভারতীয় দলের অন্যতম নির্ভরযোগ্য অলরাউন্ডার হিসেবে তাঁর অভিজ্ঞতা এবং দক্ষতা এখনও গুরুত্বপূর্ণ। টেস্ট ক্রিকেটে ব্যাটিং ও বোলিংয়ের পাশাপাশি ফিল্ডিংয়েও তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য। তাই সাম্প্রতিক র্যাঙ্কিং পরিবর্তনকে তাঁর দীর্ঘদিনের সাফল্যের অবসান হিসেবে দেখার কারণ নেই।
আইসিসির র্যাঙ্কিং মূলত নির্দিষ্ট সময়ের পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে পরিবর্তিত হয়। ফলে আগামী দিনে জাডেজা ভালো পারফরম্যান্স করলে আবারও শীর্ষস্থানে ফেরার সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই ভাবে জ্যানসেনকেও নিজের জায়গা ধরে রাখতে ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে।
সব মিলিয়ে, চার বছরেরও বেশি সময় ধরে জাডেজার দখলে থাকা টেস্ট অলরাউন্ডারের সিংহাসনে এবার নতুন মুখ মার্কো জ্যানসেন। অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ব্যাট হাতে ৮৫ রান, বল হাতে পাঁচ উইকেট এবং আইসিসির র্যাঙ্কিংয়ে একাধিক বিভাগে উন্নতি—সব মিলিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার এই তরুণ পেস অলরাউন্ডার নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন। এখন দেখার, আগামী দিনে তিনি কতটা ধারাবাহিকভাবে এই সাফল্য ধরে রাখতে পারেন এবং জাডেজা ফের শীর্ষস্থান পুনরুদ্ধার করতে পারেন কি না। আপাতত টেস্ট ক্রিকেটের অলরাউন্ডারদের লড়াইয়ে নতুন রাজা জ্যানসেনই।