এনকাউন্টারে ছেলের মৃত্যু, এখন সরকারের কাছে ক্ষতিপূরণ চাইছেন প্রহ্লাদের মা


# এনকাউন্টারে ছেলের মৃত্যু, পুলিশের দাবি ঘিরে প্রশ্ন প্রহ্লাদের মায়ের! ন্যায়বিচারের পাশাপাশি সরকারের কাছে ক্ষতিপূরণও দাবি রেখা দাসের

উত্তর ২৪ পরগনার গাইঘাটায় পুলিশের এনকাউন্টারে প্রহ্লাদ দাসের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে রাজ্যজুড়ে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোর। এক নাবালিকাকে ধর্ষণ ও খুনের অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া প্রহ্লাদের মৃত্যু ঘিরে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে বিরোধীরা। এবার গোটা ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন তুললেন নিহতের মা রেখা দাসও। তাঁর দাবি, ঘটনার পুনর্নির্মাণের জন্য পুলিশ যখন প্রহ্লাদকে বাড়িতে নিয়ে এসেছিল, তখন তাঁর হাত বাঁধা ছিল। সেই অবস্থায় কীভাবে সে পুলিশের বন্দুক ছিনিয়ে গুলি চালাল, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন তিনি। একই সঙ্গে ছেলের মৃত্যুর ঘটনায় ন্যায়বিচারের দাবি জানানোর পাশাপাশি সরকারের কাছে ক্ষতিপূরণও চেয়েছেন রেখাদেবী।

ঘটনার পর থেকেই একাধিক প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। পুলিশের বক্তব্য, ঘটনার পুনর্নির্মাণের সময় প্রহ্লাদ এক পুলিশকর্মীর বন্দুক ছিনিয়ে নিয়ে গুলি চালায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে আত্মরক্ষার জন্য পাল্টা গুলি চালাতে বাধ্য হয় পুলিশ। সেই গুলিতেই মৃত্যু হয় অভিযুক্তের। অন্যদিকে, প্রহ্লাদের পরিবারের বক্তব্যে উঠে এসেছে ঘটনার কয়েকটি দিক, যা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে পুলিশের হেফাজতে থাকা অবস্থায় কীভাবে বন্দুক ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটল, সেই প্রশ্নই এখন সামনে আসছে।

## কী ঘটেছিল গাইঘাটায়?

উত্তর ২৪ পরগনার গাইঘাটার বাসিন্দা প্রহ্লাদ দাসকে এক কিশোরীকে ধর্ষণ ও খুনের মামলায় গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। ওই মামলার তদন্তের অঙ্গ হিসেবে ঘটনার পুনর্নির্মাণের জন্য সোমবার রাতে প্রহ্লাদকে নিয়ে যাওয়া হয় বলে জানা গিয়েছে। পুলিশের অভিযোগ, সেই সময় পালানোর চেষ্টা করে সে। এরপর এক পুলিশকর্মীর বন্দুক ছিনিয়ে নিয়ে গুলি চালায় অভিযুক্ত।

পুলিশের দাবি, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে পাল্টা গুলি চালানো হয়। সেই গুলিতেই মৃত্যু হয় প্রহ্লাদের। মঙ্গলবারের এই ঘটনা সামনে আসতেই এলাকায় চাঞ্চল্য ছড়ায়। পরে বিষয়টি রাজ্য রাজনীতিতেও বড় বিতর্কের আকার নেয়।

তবে পুলিশের বক্তব্যের পাশাপাশি ঘটনার পরিস্থিতি এবং অভিযুক্তের মৃত্যুর কারণ নিয়ে একাধিক প্রশ্ন উঠছে। তদন্তের স্বার্থে ঠিক কী পরিস্থিতিতে গুলি চালানো হয়েছিল, সেই বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সামনে আসা জরুরি বলে মনে করছেন অনেকে। এনকাউন্টারের ঘটনা নিয়ে বিরোধীরাও প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন।

## ‘হাত বাঁধা ছিল, তা হলে বন্দুক ছিনিয়ে নিল কীভাবে?’

প্রহ্লাদের মৃত্যুর পর তাঁর মা রেখা দাসের বক্তব্য ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তাঁর দাবি, ঘটনার পুনর্নির্মাণের জন্য সোমবার রাতে পুলিশ প্রহ্লাদকে বাড়িতে নিয়ে এসেছিল। তখন ছেলের হাত বাঁধা ছিল বলে দাবি করেছেন তিনি। সেই অবস্থায় কীভাবে প্রহ্লাদ পুলিশের বন্দুক ছিনিয়ে নিয়ে গুলি চালাল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন রেখাদেবী।

ছেলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তাঁর অবস্থানও জানিয়েছেন প্রহ্লাদের মা। তাঁর বক্তব্য, প্রহ্লাদ অন্যায় করে থাকলে আইন অনুযায়ী তার শাস্তি হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু সেই শাস্তি কীভাবে কার্যকর হবে, তা নিয়ে তাঁর আপত্তি রয়েছে। পুলিশের হাতে ছেলেকে তুলে দেওয়ার সময় তিনি কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু এনকাউন্টারে মৃত্যুর কথা বলেননি বলে জানিয়েছেন রেখা দাস।

তাঁর বক্তব্য, ছেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পর তিনি নিজেই তাকে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। তাঁর কথায়, “আমার ছেলেকে আমি পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছিলাম। বলেছিলাম, ও অন্যায় করেছে, ওর কঠোর শাস্তি হোক। কিন্তু আমি এটা বলিনি যে ওকে এনকাউন্টার করে দিক।”

এই বক্তব্যের মাধ্যমে রেখাদেবী স্পষ্ট করতে চেয়েছেন, ছেলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিচার এবং পুলিশের গুলিতে তার মৃত্যুকে তিনি এক করে দেখছেন না। তাঁর প্রশ্ন, আইন অনুযায়ী শাস্তির সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কী পরিস্থিতিতে এনকাউন্টারের ঘটনা ঘটল?

## রাতের ঘটনার বিবরণ দিলেন প্রহ্লাদের মা

বারাসত মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের মর্গে প্রহ্লাদের দেহের ময়নাতদন্ত হয়। সেখানে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে রাতের ঘটনার বিবরণ দেন রেখা দাস। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সোমবার গভীর রাতে পুলিশ প্রহ্লাদকে বাড়িতে নিয়ে এসেছিল। সেই সময় পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলা হয় এবং কিছু লেখালিখিও করা হয়েছিল বলে দাবি তাঁর।

রেখাদেবীর কথায়, রাত প্রায় দুটোর সময় পুলিশকর্মীরা বাড়িতে এসে তাঁদের সঙ্গে কথা বলেন। তার পর প্রহ্লাদকে নিয়ে চলে যান তাঁরা। এরপর ভোর সাড়ে পাঁচটা নাগাদ আবার বাড়িতে যান পুলিশকর্মীরা। তখন তাঁকে ঠাকুরনগর হাসপাতালে যেতে বলা হয়। পুলিশ জানিয়েছিল, তাঁর ছেলের এনকাউন্টার হয়েছে।

কীভাবে এই ঘটনা ঘটল, তা জানতে চেয়েছিলেন রেখাদেবী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পুলিশ জানায়, প্রহ্লাদ পালানোর চেষ্টা করছিল। কিন্তু এত পুলিশকর্মীর উপস্থিতিতে কীভাবে সে পালানোর চেষ্টা করল, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।

রেখাদেবীর কথায়, “আমি জানতে চাইলাম কেন? বলল, ও পালাতে যাচ্ছিল। কী করে পালায় ছেলে এত গার্ড থাকতে?”

তবে একই সঙ্গে ছেলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের প্রসঙ্গেও মন্তব্য করেছেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে একদিকে যেমন পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে, অন্যদিকে তেমনই ছেলের অন্যায়ের শাস্তি হওয়া উচিত ছিল বলেও জানিয়েছেন তিনি। এই দুই অবস্থানের মধ্যে দিয়েই ছেলের মৃত্যুর ঘটনায় নিজের বক্তব্য তুলে ধরেছেন প্রহ্লাদের মা।

## ন্যায়বিচারের পাশাপাশি ক্ষতিপূরণের দাবি

প্রহ্লাদের মৃত্যুর পর এবার সরকারের কাছে ক্ষতিপূরণ চেয়েছেন রেখা দাস। ছেলের মৃত্যুর ঘটনায় ন্যায়বিচার চান তিনি। পাশাপাশি, সরকারের কাছে আর্থিক ক্ষতিপূরণের দাবিও জানিয়েছেন। তাঁর এই দাবি ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

তবে ক্ষতিপূরণের দাবির বিষয়ে সরকারের তরফে কী পদক্ষেপ করা হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। একইভাবে এনকাউন্টারের পরিস্থিতি নিয়ে ওঠা প্রশ্নেরও বিস্তারিত ব্যাখ্যা সামনে আসা প্রয়োজন। পুলিশের বক্তব্য, পরিবারের দাবি এবং তদন্তে উঠে আসা তথ্য—সবকিছু মিলিয়েই ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি স্পষ্ট হতে পারে।

এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, পুলিশের গুলি চালানোর পরিস্থিতি কী ছিল, বন্দুক ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগের সত্যতা কী এবং ঘটনার পুনর্নির্মাণের সময় ঠিক কী ঘটেছিল—এই বিষয়গুলি। তদন্তের ফলাফলের উপরেই অনেক প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে।

## ভাইয়ের বক্তব্যেও তৈরি হয়েছে আলোচনা

প্রহ্লাদের মৃত্যুর পর তাঁর ভাইয়ের বক্তব্যও সামনে এসেছে। পরিবারের তরফে জানানো হয়েছে, প্রহ্লাদ এমন কাজ করতে পারে, তা তাঁরা ভাবতে পারেননি। ধর্ষণ ও খুনের অভিযোগের ঘটনার রাতে ঠিক কী ঘটেছিল, সেই বিষয়েও নিজের বক্তব্য জানিয়েছেন অভিযুক্তের ভাই।

পরিবারের সদস্যদের এই বক্তব্যের পাশাপাশি পুলিশের দাবি নিয়েও আলোচনা চলছে। তবে কোনও অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে তদন্ত ও আদালতের প্রক্রিয়াই গুরুত্বপূর্ণ। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এবং এনকাউন্টারে মৃত্যুর পরিস্থিতি—দুটি বিষয়কে আলাদা করে বিচার করার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহলের একাংশ।

## এনকাউন্টার ঘিরে রাজনীতির পারদ চড়ছে

মঙ্গলবারের ঘটনার পর থেকেই রাজ্য রাজনীতিতে উত্তাপ বেড়েছে। বিরোধীদের একাংশ এনকাউন্টারের পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। পুলিশের হাতে থাকা অবস্থায় একজন অভিযুক্তের মৃত্যু কীভাবে হল, তা নিয়ে স্বচ্ছ তদন্তের দাবি উঠতে পারে বলে রাজনৈতিক মহলের একাংশের মত।

অন্যদিকে, পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, অভিযুক্ত বন্দুক ছিনিয়ে নিয়ে গুলি চালানোর পর আত্মরক্ষার জন্য পাল্টা গুলি চালানো হয়েছিল। ফলে এই ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি বুঝতে পুলিশের দাবি এবং অন্যান্য প্রমাণ খতিয়ে দেখা জরুরি।

সব মিলিয়ে, গাইঘাটার প্রহ্লাদ দাসের মৃত্যু ঘিরে একাধিক প্রশ্ন সামনে এসেছে। একদিকে নাবালিকাকে ধর্ষণ ও খুনের গুরুতর অভিযোগ, অন্যদিকে পুলিশের এনকাউন্টার নিয়ে বিতর্ক। তার মধ্যেই ছেলের মৃত্যুর ঘটনায় ন্যায়বিচার ও ক্ষতিপূরণ চেয়ে সরকারের দ্বারস্থ হওয়ার কথা জানিয়েছেন রেখা দাস। এখন নজর, এই ঘটনায় তদন্তের মাধ্যমে কী তথ্য সামনে আসে এবং সরকারের তরফে ক্ষতিপূরণের দাবি নিয়ে কোনও পদক্ষেপ করা হয় কি না।

Post a Comment

Previous Post Next Post