‘বাবরি নাম না চাইলে মান্যতা দেওয়া ছাড়া উপায় নেই’! শুভেন্দুর কড়া বার্তার পরে মসজিদ নিয়ে সুরবদল হুমায়ুনের


### ‘বাবরি নাম না চাইলে মান্যতা দেওয়া ছাড়া উপায় নেই’! শুভেন্দুর কড়া বার্তার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই সুরবদল হুমায়ুনের, মসজিদ নির্মাণ ঘিরে নতুন বিতর্ক

মুর্শিদাবাদে প্রস্তাবিত বাবরি মসজিদ নির্মাণ ঘিরে রাজনৈতিক তরজা ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কড়া অবস্থানের পরেই নিজের আগের অবস্থান থেকে অনেকটাই সরে এলেন নওদার বিধায়ক হুমায়ুন কবীর। মসজিদের নাম ও নির্মাণ নিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে সংঘাতের সুর শোনা যাচ্ছিল তাঁর গলায়। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর স্পষ্ট বার্তার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই বৃহস্পতিবার সকালে কার্যত সুর নরম করলেন তিনি। হুমায়ুনের বক্তব্য, রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান যে সিদ্ধান্ত নেবেন, সেই সিদ্ধান্ত ও ইচ্ছাকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। আর এই মন্তব্য ঘিরেই নতুন করে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক জল্পনা। বিজেপির কটাক্ষ, মসজিদ নির্মাণের ঘোষণা করলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হবে না। কারণ, হুমায়ুন কবীর কখন কী বলছেন, তার কোনও ঠিক নেই।

প্রসঙ্গত, মুর্শিদাবাদে বাবরের নামাঙ্কিত মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে প্রথম থেকেই বিতর্ক তৈরি হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, রাজ্যে বাবরের নামে কোনও মসজিদ নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হবে না। শুধু রাজনৈতিক আপত্তিই নয়, প্রশাসনিক স্তরেও এই ধরনের মসজিদ নির্মাণের ক্ষেত্রে কোনও ছাড়পত্র দেওয়া হবে না বলে জানানো হয়েছে। মসজিদের নকশা অনুমোদন থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক অনুমতি—কোনও ক্ষেত্রেই বাবরের নামাঙ্কিত মসজিদকে মান্যতা দেওয়া হবে না বলে কড়া অবস্থান নিয়েছে রাজ্য সরকার। মুখ্যমন্ত্রীর এই বার্তার পরেই হুমায়ুনের বক্তব্যে পরিবর্তন নজর কেড়েছে রাজনৈতিক মহলের।

উল্লেখ্য, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে নিজের রাজনৈতিক দল ‘আম জনতা উন্নয়ন পার্টি’ গঠন করেন হুমায়ুন কবীর। নতুন দল গঠনের পর থেকেই মুর্শিদাবাদে বাবরি মসজিদ নির্মাণের ঘোষণা করে রাজ্য রাজনীতিতে আলোড়ন ফেলেছিলেন তিনি। বেলডাঙায় প্রস্তাবিত মসজিদ নির্মাণের প্রাথমিক কাজও শুরু হয়। তাঁর এই উদ্যোগকে কেন্দ্র করে একদিকে যেমন রাজনৈতিক সমর্থন ও বিরোধিতা তৈরি হয়েছে, তেমনই প্রশাসনিক অনুমতি এবং মসজিদের নামকরণ নিয়েও বিতর্ক দানা বেঁধেছে।

হুমায়ুনের এই ঘোষণাকে কেন্দ্র করে রাজ্যের রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে শুরু হয় চাপানউতর। বিশেষ করে বাবরি মসজিদের নাম ব্যবহার এবং মুর্শিদাবাদের মতো স্পর্শকাতর এলাকায় এই ধরনের নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে। বিরোধীদের একাংশের দাবি, রাজনৈতিক প্রচারের উদ্দেশ্যেই এই বিষয়টিকে সামনে আনা হচ্ছে। যদিও হুমায়ুন বারবার নিজের অবস্থানে অনড় থাকার কথা জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা থেকে তিনি পিছিয়ে আসবেন না।

এরই মধ্যে গত ২ নভেম্বর বেলডাঙার একটি সভা থেকে আরও বড় ঘোষণা করেন নওদার বিধায়ক। তিনি দাবি করেন, আগামী ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ধ্বংসের বর্ষপূর্তির দিন মুর্শিদাবাদে জাতীয় সড়ক অবরুদ্ধ করবেন। শুধু তাই নয়, প্রশাসনকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে তিনি বলেন, মুর্শিদাবাদ পুলিশের ক্ষমতা থাকলে তাঁকে আটকে দেখাক। তাঁর দাবি ছিল, ওই দিন ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়কের রেজিনগর থেকে বহরমপুর পর্যন্ত প্রায় ৩০ কিলোমিটার রাস্তা তাঁর কব্জায় থাকবে।

এই মন্তব্যের পরেই পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়। জাতীয় সড়ক অবরোধের ঘোষণাকে কেন্দ্র করে প্রশাসনিক মহলেও প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। কারণ, জাতীয় সড়ক অবরুদ্ধ হলে সাধারণ মানুষের যাতায়াত, যান চলাচল এবং জরুরি পরিষেবার উপর প্রভাব পড়তে পারে। ফলে ৬ ডিসেম্বরের কর্মসূচি ঘিরে প্রশাসন কী পদক্ষেপ করে, সেদিকেই নজর রয়েছে রাজনৈতিক মহলের।

তবে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কড়া অবস্থানের পর বৃহস্পতিবার সকালে হুমায়ুন কবীরের মন্তব্যে স্পষ্ট পরিবর্তন দেখা যায়। তিনি জানান, রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধানের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। অর্থাৎ, মসজিদের নামকরণ এবং নির্মাণ নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর আপত্তি থাকলে সেই অবস্থানকে উপেক্ষা করে এগোনো কতটা সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, প্রশাসনের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে না গিয়ে আপাতত পরিস্থিতি বুঝে এগোতে চাইছেন হুমায়ুন।

অন্যদিকে, হুমায়ুনের এই অবস্থান বদলকে হাতিয়ার করেছে বিজেপি। গেরুয়া শিবিরের কটাক্ষ, মসজিদ নির্মাণ নিয়ে হুমায়ুন যতই বড় বড় ঘোষণা করুন না কেন, বাস্তবে তা হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তাঁদের দাবি, একদিন একরকম বক্তব্য এবং পরের দিন সম্পূর্ণ অন্য সুর—এই অবস্থানের ফলে তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। বিজেপির বক্তব্য, মুখ্যমন্ত্রীর কড়া অবস্থানের পরেই হুমায়ুন বুঝতে পেরেছেন যে প্রশাসনিক অনুমতি ছাড়া এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সহজ নয়।

সব মিলিয়ে, মুর্শিদাবাদে প্রস্তাবিত বাবরি মসজিদ নির্মাণকে কেন্দ্র করে বিতর্ক এখন নতুন মোড় নিয়েছে। একদিকে মুখ্যমন্ত্রীর প্রশাসনিক অবস্থান, অন্যদিকে হুমায়ুন কবীরের আগের ঘোষণা ও সাম্প্রতিক সুরবদল—দুইয়ের মধ্যে তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক সংঘাত। তার উপর আগামী ৬ ডিসেম্বর জাতীয় সড়ক অবরোধের ঘোষণাও পরিস্থিতিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। শেষ পর্যন্ত মসজিদের নাম ও নির্মাণ নিয়ে হুমায়ুন কী অবস্থান নেন এবং প্রশাসন কী পদক্ষেপ করে, এখন সেদিকেই নজর রাজ্য রাজনীতির।

Post a Comment

Previous Post Next Post