সোশ্যাল মিডিয়ায় সর্বক্ষণই হাসিমুখের ছবি কিন্তু তার পেছনেই লুকিয়ে ভয়ংকর কষ্ট। সেই কষ্টের কাছেই নতিস্বীকার করে অবশেষে নিজেকে শেষ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সংগীতশিল্পী দেবলীনা নন্দী। আপাতত তিনি হাসপাতালে চিকিত্সাধীন। কী ঘটেছিল দেবলীনার সঙ্গে? জানতে যোগাযোগ করা হয়েছিল দেবলীনার মায়ের সঙ্গে। তিনিই বললেন, বিয়ের পর থেকেই শারীরিক মানসিক নির্যাতনের শিকার দেবলীনা। দেবলীনার মা বলেন, "আমার মেয়ে সবসময়েই চেয়েছে দুই পরিবারকে নিয়ে থাকবে। বিয়ের আগেই শ্বশুরবাড়িতে আমার মেয়ে বলেছিল যে প্রথম থেকেই মা আমার গান-বাজনার, অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত। আগামীতেও যুক্ত থাকবেন। তখন সব মেনে নিয়েছিল। বিয়ের পরেই দাবি করে পরিবারের সঙ্গে কোনও যোগাযোগ রাখা যাবে না। আমার স্বামী বহুদিন ধরেই অসুস্থ। তাই ওঁকে সবজায়গায় জড়াই না। আমিই দেবলীনার পাশে থাকি। বিয়ের পরেই বর ও শ্বশুরবাড়ির দাবি, মা সব জায়গায় ওর সঙ্গে যেতে পারবে না। এদিকে দেবলীনা মনে করে যে আমি ওর জন্য লাকি। তাই সবজায়গায় আমাকে নিয়ে যায়। ও চাইত, শ্বশুরবাড়ির লোকেরাও যাক। আমি জানি না, কেন ওরা আমায় পছন্দ করে না।""কিছুদিন আগেই দেবলীনার শাশুড়িমা তাঁর বাপের বাড়ির সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হয়ে ভেঙে পড়েছিলেন। ও বলল, শাশুড়ি মা ডিপ্রেসড। আমিই বললাম, উনি ঘুরতে ভালোবাসেন। চল, আমরা দার্জিলিং ঘুরে আসি। আমার মেয়েই দুই মাকে নিয়েই গেল, আমরা এনজয় করলাম। ফিরে আবার অশান্তি। ওদের দাবি, ২৮ বছরের মেয়ের সঙ্গে সবসময় মা কেন যাবে? ও একা যাবে, নইলে শ্বশুরবাড়ির কেউ যাবে। আমি চাইছিলাম, ওরাও যাক। একসময় তো আমি আর যেতে পারব না, তখন তো ওদেরই যেতে হবে। কিন্তু ওদের দাবি, আমি নাকি মেয়ের ব্রেন ওয়াশ করি।", দাবি দেবলীনার মায়ের।
শুধু দেবলীনা নয়, তাঁর মাকেও অকথ্য ভাষায় অপমান করত দেবলীনার শ্বশুরবাড়ির লোকেরা। তিনি বলেন, "আমি কক্ষনো চাইনি, আমার মেয়ের সংসার ভাঙুক। কোনও মা চাইবে? সবসময় আমাকে কেন্দ্র করে মেয়েকে উল্টোপাল্টা কথা বলবে। আমার ডানহাতের আঙুলে চোট আছে, তাই আমি মেসেজ করতে পারিনা। ওরা সবসময় বলে, আমি নাকি অশিক্ষিত, আমি দেখতে বাজে, আমি মুর্খ। ছোটবেলায় আমি মাকে হারিয়েছি, অনেক কষ্টে বড় হয়েছি। আমি বেশি লেখাপড়া করতে পারিনি, এটা ঠিক, কিন্তু আমি অসভ্য় নই। তাহলে আর আমি মেয়েকে নিয়ে এতদূর এগোতে পারতাম না"।
কাঁদতে কাঁদতে দেবলীনার মা বলেন, "ওকে প্রচুর মারধর করত, তাও আমি সংসার ভাঙতে বলিনি। ওকে বোঝাতাম,ধৈর্য্য ধরতে, ভালোবেসে বিয়ে করেছিল প্রবাহকে। তাও আমি চেয়েছিলাম স্টেপ নিতে, কিন্তু আমার মেয়ে কোনওদিন আমায় পুলিসে যেতে দেয়নি। আমার মেয়ে বলত, সবাই ভাবে ইন্ডাস্ট্রির মেয়েরা খারাপ হয়। সংসার ছেড়ে আসলে, সবাই আমাকেই খারাপ ভাববে, বলবে আমিই সংসার করতে পারিনি। সমাজ কী বলবে, এই ভয়ে ও বেরিয়ে আসতে পারেনি"।
"বিশ্বাস করুন, একদিন ফোন না করলে, মেসেজ না করলে মনে হত, এই বুঝি আমার মেয়েকে মেরে ফেলে দিয়েছে ওরা। মেয়েকে মেরে ফেলেছে বলেই হয়তো মেয়ে রিপ্লাই করছে না। ভয়েস নোট পাঠাতাম, 'কীরে ঠিক আছিস তো? রিপ্লাই করে শুধু বলিস যে সুস্থ আছিস' কোনওদিন মেয়েকে বলিনি যে আমার কাছে এসে থাক। প্রবাহ যদি বলত, তুমি আমার পায়ে থাকো, মেয়েকে ভালো রাখব, আমি তাই মেনে নিতাম। আমি সেধে সেধে কথা বলতাম প্রবাহর সঙ্গে। অষ্টমঙ্গলার পর একদিনও আসেনি", কান্নায় গলা বুজে যায় দেবলীনার মায়ের।
দেবলীনার মা আরও জানান যে, "গত ভাদ্রমাসে দেবলীনাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিল ওরা। দুদিনের জন্য ওর শ্বশুর শাশুড়ি চন্দননগর থেকে নিউটাউন গিয়েছিল, মেয়ের কাছে থাকবে বলে। সেই সময় প্রবাহ কাজের সূত্রে বাইরে ছিল। অনুষ্ঠানের জন্য দেবলীনাকে সকাল সকাল বেরোতে হল, ফিরতে রাত হত। আমার মেয়ে তখন ফিরছে, ড্রাইভ করছে, ফোন করে বিশাল বকাঝকা। ওরা বলতে থাকে, 'সকালে বেরিয়ে রাতে ফিরিস, এটা সংসার। সাংসারিক মেয়েরা এসব করে?'"
তাহলে কী সেপারেশনেই ছিলেন তারা? সংগীতশিল্পীর মা বললেন, "অগাস্টে ওকে প্রথম বাড়ি থেকে বের করে দিল। প্রবাহ বলল, 'তুমি আছ কেন? বেরিয়ে যাও'। তারপর শ্বশুর শাশুড়ি বলল, 'তোমরা সেপারেশনে থাকো'। আমার ছেলেকে বলল,'দেবলীনাকে নিয়ে চলে যাও'। শ্বশুর বলল, 'তুমি কি শুধু শুতে আসবে নাকি! শুতে আসা চলবে না'। আমার বড় মেয়ে প্রতিবাদ করে কিন্তু আমরা ওকে নিয়ে চলে আসি। তখনও কোনও অভিযোগ করিনি।"
"পঞ্চমীর দিন প্রবাহ ফোন করল আমার মেয়েকে। ও সবসময়ই চাইত, প্রবাহ ডাকলে আমি যাবই। আমার মনে সবসময় চিন্তা থাকত, কিন্তু তাও চেয়েছিলাম সব ঠিক হয়ে যাক। এরমাঝে গোয়া গিয়েছিল, সেখান থেকেই ফিরে ফের ওকে মারে। সারাদিন ফোনে পাচ্ছি না মেয়েকে, টেনশন হচ্ছিল। পরে ওদের সঙ্গে একজন গিয়েছিল, তার মুখে শুনলাম। ও কেন এরকম করে, আমি কোনওদিন প্রবাহকে জিজ্ঞেস করিনি, তারপরেও আমি খারাপ।" দাবি দেবলীনার মায়ের।
নানাভাবে অপমান করা হত দেবলীনার মাকেও। তিনি বলেন, "২০২২ সালে আমার মেয়ে গাড়ি কিনেছিল, সেই সময় আমিও ছিলাম ওর সঙ্গে। সেই গাড়িতে উঠলেই আমাকে বলে, 'লজ্জা করে না! আমাকে ভিখিরির বাচ্চা, নিকিরির বাচ্চা, কত কী বলেছে!' আমি মেয়ের গাড়িতে উঠলেই সমস্যা। সব সমস্যা আমাকে নিয়েই।"
এখন কেমন আছেন দেবলীনা? তাঁর মা জানালেন, "এখন দেবলীনা বিপন্মুক্ত। আমরা ওকে এসএসকেএমে নিয়ে এসেছি। দেবলীনা খুবই ভেঙে পড়েছে। তবে ও কী সিদ্ধান্ত নেবে, সেটা সবটাই মেয়ের উপর ছেড়ে দিয়েছি। এরপরে আমি আর কিছু বলব না। বাকিটা ওর সিদ্ধান্ত।"
এতকিছুর পরেও থানা কোনও অভিযোগ নেই বলেই দাবি করেন দেবলীনার মা। তিনি বলেন, "চন্দননগর পুলিস স্টেশনে গিয়েছিলাম অভিযোগ জানাতে। ৫ ঘণ্টা চন্দননগর থানায় অপেক্ষা করেছি, কোনও অভিযোগ নেয়নি। আমাদের বলেছে, 'দেবলীনা সুস্থ হলে ওকে সঙ্গে নিয়ে আসুন। মেজবাবু উল্টে বললেন, দেবলীনাও তো অপরাধ করেছে, ওর নামেও কেস হবে'।" জানা যায় যে এখনও অবধি দেবলীনার কোনও খবর নেননি তাঁর পাইলট স্বামী প্রবাহ ও তাঁর পরিবারের লোকজন।