চোখে চশমা, পায়ে স্নিকার্স, মুখে হাসি — সেই চেনা ইমেজ নিয়ে 'ভোটের জল' মাপছেন বেহালা পশ্চিমের তৃণমূল প্রার্থী রত্না চট্টোপাধ্যায়।
প্রচারের কৌশল দেখে মনে হতেই পারে, তিনি ভোট চাইতে নয়, যেন কোনও আত্মীয়ের বাড়িতে নিমন্ত্রণে এসেছেন। বলতে চাইছেন, 'বেহালা তার মেয়েকেই চায়'। কিন্তু, বাস্তবটা অন্যরকম। সামান্য বৃষ্টিতে রাস্তায় জল দাঁড়িয়ে যাওয়ার কারণে বেহালার মুকুটে আগে থেকে 'ভেনিসের' তকমা তো ছিলই। সঙ্গে জুড়েছে বিরোধীদের খোঁচা 'চাকরি চোর' স্লোগান। এমন বাউন্সারের জবাবে রত্না চট্টোপাধ্যায়ের মুখে শুধুই 'উন্নয়নের পাঁচালি'।সকালে জনসংযোগ, দুপুরে রোড-শো, বিকেলে পাড়ায় পাড়ায় হুডখোলা জিপে ঘোরা। প্রচারে ভিড় আছে, হাততালিও পাচ্ছেন। আর অনুভব করছেন নিয়োগ দুর্নীতিতে বিদ্ধ রাজ্যের প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের ফেলে যাওয়া বেহালা পশ্চিমের আসনে এ বারের লড়াইটা বেশ 'কঠিন'। নিয়োগ দুর্নীতি প্রকাশ্যে আসার পরে এটাই প্রথম বিধানসভা নির্বাচন যে!
এর আগের বার কলকাতার প্রাক্তন মেয়র শোভন চট্টোপাধ্যায়ের আসনে লড়ে বেহালা পূর্বে জিতেছিলেন স্ত্রী রত্না। গত বার রত্নার জয়ের কৃতিত্বে ভাগ বসিয়েছিল প্রাক্তন মেয়রের 'ক্যারিশমা'। এমনটাই অনুযোগ ছিল কারও কারও। এ বার পূর্ব ছেড়ে পশ্চিমে এসে পুরো দায়িত্বটাই রত্নার একার কাঁধে। সঙ্গে কাঁটার মুকুটও। এই পরিস্থিতিতে বিরোধীদের সঙ্গে লড়াই তো রয়েইছে, ভোটে জিতে দলের অন্দরেও নিজের 'জাত' চেনাতে চান প্রবীণ রাজনীতিবিদ দুলাল দাসের কন্যা!
বেহালা পশ্চিমের ইতিহাসের পাতা খুললে জ্বলজ্বল করবে পার্থর নাম। ২০০১ থেকে টানা পাঁচ বারের বিধায়ক ছিলেন তিনি। ব্যবধান গড়ার নজির রয়েছে। তবে, ২০২২–এ ইডির হাতে গ্রেপ্তার হতেই একদা দলের মহাসচিবের নামেই এখন 'অ্যালার্জি' নেতানেত্রীদের একাংশের মুখে। রত্নাও এই অধ্যায় থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকতে চাইছেন। সখেরবাজারে ভোট প্রচারের ফাঁকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্রীর কথায়, 'জেল থেকে বেরনোর পরে পার্থদার সঙ্গে আমার কোনও কথা হয়নি। তিনিও যোগাযোগ করেননি। মানুষ চাইছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ফের রাজ্যে ক্ষমতায় আনতে। ওঁর মুখ হয়ে আমি দাঁড়িয়েছি। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, যুবসাথী, কন্যাশ্রী, বেকার ভাতা, কী না করেছেন মুখ্যমন্ত্রী।'
আর বেহালার প্রচারে আরজি কর ধর্ষণ-খুনের ঘটনা থেকে শুরু করে 'অনুন্নয়নের পাঁচালি' বিজেপির চিকিৎসক প্রার্থী ইন্দ্রনীল খাঁয়ের মুখে। এমন ভঙ্গিতে প্রচার করছেন, যেন গত ২৫ বছরে বেহালার মানুষ কার্যত 'আইসিইউ'-তে চলে গিয়েছেন। তাঁর ডায়াগনোসিসে উঠে এসেছে দুর্নীতি নামক 'ক্যান্সার' রোগ। ভোটারদের সঙ্গে কখনও হাত মিলিয়ে, কখনও টেবিল টেনিস খেলতে খেলতে প্রেসক্রিপশনে লিখছেন, 'বেহালার উন্নয়ন চাইলে, বিজেপিকেই ভোট দিন'। আবাসিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের মুখে ইন্দ্রনীলের জবাব, 'আগামী ২৯ তারিখ আমাকে দেখুন। পুলিশ-প্রশাসন বদলালেই সুশাসন আসবে। বিদ্যাসাগর হাসপাতালে ক্যান্সারের চিকিৎসা হবে, হার্টের চিকিৎসা হবে। এটা আমার গ্যারান্টি।'
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের দাবি, এত সংখ্যায় ভোটার বাতিল হওয়ায় যে কারও দিকে পাল্লা ঝুঁকতে পারে। খেলা ঘোরাতে এ বার সিপিএমের ভরসা বেহালায় 'কাছের মানুষ' নীহার ভক্ত। ডোর-টু-ডোর আড্ডার ফাঁকে প্রচার সেরে ফেলছেন কলকাতা পুরসভার এই প্রাক্তন কাউন্সিলার। তিনি সেই স্কুল–ছাত্র, যিনি পরীক্ষার আগে বেশি মাথা ঘামান না। বিশ্বাস করেন শুধু রেজ়াল্টে। নীহারের কথায়, 'তৃণমূল ও বিজেপির যে সেটিং রয়েছে, তা বুঝে গিয়েছেন মানুষ। মানুষের চোখ থেকে রঙিন চশমা খুলে গিয়েছে। আগামী ৪ তারিখ বেহালার মানুষ চমক দেবেন।'