সেই শ্রীভূমিতে ২০০৯–১০ নাগাদ একটি রিয়েল এস্টেট সংস্থা ফ্ল্যাটবাড়ি বানাতে শুরু করেছিল। কয়েক বছরের মধ্যে 'জি প্লাস ফোর' সেই ফ্ল্যাটবাড়ির কাজ থমকে যায়। মূলত টাকার অভাবে। ততদিনে রাজ্যে ক্ষমতায় চলে এসেছে তৃণমূল। শ্রীভূমি জুড়ে তখন একটিই নাম — সুজিত বসু। সেই 'শেষ না হওয়া' ফ্ল্যাটবাড়ির নির্মাণ এবং তাকে ঘিরে নিয়োগ দুর্নীতির যে অভিযোগ লিখিত আকারে ইডি আদালতে পেশ করেছে, আইনজীবীদের দাবি, তা হার মানাতে পারে যে কোনও সিনেমার চিত্রনাট্যকে।
আদালতে পেশ করা ইডি–র নথি অনুযায়ী — সেই রিয়েল এস্টেট সংস্থা দ্বারস্থ হয়েছিল সুজিতের। ঠিক হয় সুজিত নিজে বিনিয়োগ করবেন সেখানে। সেটা ২০১৪ সাল। সুজিত তখন একাধারে বিধায়ক এবং দক্ষিণ দমদম পুরসভার ভাইস চেয়ারম্যান। ইডির অভিযোগ, সুজিত ইনভেস্টমেন্টের নামে প্রথমে ১৬ লক্ষ টাকা এবং পরে ২০১৮–য় ৩০ লক্ষ টাকা ওই রিয়েল এস্টেট সংস্থার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমা করেন। সব মিলিয়ে ৪৬ লক্ষ টাকা।
তার আগেই ২০১৬ নাগাদ ওই বাড়ির কাজ শেষ হয়। ওই এলাকায় সেই বাড়ি অন্যতম বিলাসবহুল বাড়ি হিসেবে পরিচিত। ইডি–র অভিযোগ, সেই গোটা বাড়িটিই চলে যায় সুজিতের দখলে। গ্রাউন্ড ফ্লোরের পার্কিং–এ ঢুকে যায় মন্ত্রী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের গাড়ি। আদালতে ইডি–র অভিযোগ, ওই গোটা বাড়ির পরিবর্তে সেই রিয়েল এস্টেট সংস্থাকে আরও এক কোটি ১১ লক্ষ ৯৯ হাজার ১৮২ টাকা দেওয়ার কথা ছিল মন্ত্রীর। সেই টাকা আজও বাকি রয়েছে। যার ফলে সুজিতের নামে ওই বাড়ির রেজিস্ট্রি করা হয়নি। যাঁরা বিনিয়োগ করে বাড়িটি বানিয়েছিলেন, তাঁরা কেন মেনে নিলেন এই 'ব্যবস্থা'? এখানেই গল্পের দ্বিতীয় 'টুইস্ট'।
লিখিত ভাবে ইডি আদালতে জানিয়েছে, বাড়ি দখলের পরিবর্তে ওই রিয়েল এস্টেট সংস্থার মালিকের পরিবারের মোট পাঁচ জনকে দক্ষিণ দমদম পুরসভায় চাকরি দেন সুজিত। এখানেই শেষ নয়। যে জমির উপরে ওই বাড়িটি তৈরি হয়েছিল, সেই জমির মালিককেও পুরসভায় চাকরি পাইয়ে দেন সুজিত। যাঁরা সচ্ছল, ব্যবসায়ী পরিবারের সদস্য, তাঁরা পুরসভায় কী চাকরি পেলেন? ইডির দাবি, মজদুর এবং চুক্তিভিত্তিক কর্মীর চাকরি দেওয়া হয়েছিল তাঁদের। তদন্তকারীদের দাবি, সেই চাকরি অবশ্যই তাঁরা করেননি। শুধু খাতায়–কলমে নাম রয়ে যায় তাঁদের। সেখান থেকে প্রতি মাসে বেতন পৌঁছে যেত তাঁদের অ্যাকাউন্টে। ইডির তদন্তকারীদের দাবি, দীর্ঘমেয়াদি মাসিক বেতনের বদলে চারতলা বাড়ি করায়ত্ত করেছিলেন তৎকালীন দমকলমন্ত্রী।
এই পুর–নিয়োগ দুর্নীতির অভিযোগে ইডি গ্রেপ্তার করেছে সুজিতকে। তিনি এখন ইডি হেফাজতে। তদন্তকারীদের দাবি, পুর নিয়োগের তদন্তে নেমে এমন অনেক কর্মীর নাম তাঁদের নজরে আসে, যাঁদের প্রোফাইলের সঙ্গে পুরসভার পদের কোনও মিল নেই। তখনই সেই পুরসভার 'কর্মী', সংশ্লিষ্ট রিয়েল এস্টেট সংস্থার এক পার্টনারের বয়ানে চাঞ্চল্যকর এই তথ্যপ্রমাণ উঠে আসে। ২০২৫–এর ১৭ নভেম্বর তাঁর বয়ান রের্কড করে ইডি। জানা যায়, তিনি নিজে দক্ষিণ দমদম পুরসভার চুক্তিভিত্তিক কর্মী। তাঁর স্ত্রী পুরসভার স্কুলে অপ্রশিক্ষিত শিক্ষকের চাকরি পান ২০১৪–য়। ওই একই বছরে ওই পার্টনারের দুই ভাই পুরসভার মজদুর পদে কাজ পান। ওই জমির মালিকও মজদুর পদে চাকরি পান।
ইডির অভিযোগ, বেনিয়ম করে চাকরি দিয়ে পরিবর্তে চারতলা ফ্ল্যাটবাড়ির দখল নিয়ে সরাসরি অপরাধের সম্পত্তি ভোগ করেছেন সুজিত। পুর–নিয়োগ দুর্নীতির ঘুষের বদলে ওই সম্পত্তি। এই সংক্রান্ত যাবতীয় প্রামাণ্য নথি ইডি আদালতে জমা করেছে। ইডির বিস্ফোরক অভিযোগের ভিত্তিতে সুজিতের ছেলে সমুদ্র বসু অবশ্য আগেই জানিয়েছেন, 'ইডি যা অভিযোগ করছে, কোর্টে তা প্রমাণ করতে হবে। ডিফেন্ড করব।'