ব্রিটিশের গুলির সামনেও অকুতোভয়, মাতঙ্গিনী হাজরার বাড়িকে হেরিটেজ স্বীকৃতির আবেদন


ব্রিটিশ পুলিশের গুলির সামনে দাঁড়িয়েও জাতীয় পতাকা মাটিতে পড়তে দেননি তিনি। দেশের স্বাধীনতার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন ‘গান্ধীবুড়ি’ মাতঙ্গিনী হাজরা। সেই অগ্নিকন্যার স্মৃতিবিজড়িত বাড়িকে এবার হেরিটেজ স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি উঠেছে। ইতিহাসের এই গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণে দ্রুত সরকারি উদ্যোগের আবেদন জানিয়েছেন স্থানীয় মানুষ ও ইতিহাসপ্রেমীরা।
পূর্ব মেদিনীপুরের তমলুকের কাছে হোগলা গ্রামে মাতঙ্গিনী হাজরার জন্ম। স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে এই গ্রাম এবং তাঁর জন্মভিটের গুরুত্ব অপরিসীম। ১৯৪২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় তমলুক থানা অভিযানে মিছিলের নেতৃত্ব দেন মাতঙ্গিনী। ব্রিটিশ পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হওয়ার পরও তিনি জাতীয় পতাকা আঁকড়ে ধরে এগিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত গুলিবিদ্ধ হয়ে শহিদ হন তিনি।
মাতঙ্গিনী হাজরার জীবন ছিল সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের প্রতীক। অল্প বয়সে বিধবা হওয়ার পরও তিনি থেমে থাকেননি। অসহযোগ আন্দোলন, লবণ সত্যাগ্রহ এবং পরবর্তী সময়ে ভারত ছাড়ো আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। সাধারণ গ্রামীণ পরিবারের এক নারী কীভাবে স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম সাহসী মুখ হয়ে উঠেছিলেন, তাঁর জীবন তারই অনন্য উদাহরণ।
তবে স্বাধীনতার এত বছর পরেও তাঁর জন্মভিটের সংরক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ২০২২ সালেও সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছিল, হোগলা গ্রামের মাতঙ্গিনী কুটিরে বিদ্যুৎ সংযোগ পর্যন্ত ছিল না। পরে শহিদ মাতঙ্গিনী পঞ্চায়েত সমিতির উদ্যোগে সেখানে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
স্থানীয়দের বক্তব্য, শুধু বিদ্যুৎ বা ন্যূনতম পরিকাঠামো নয়, মাতঙ্গিনী হাজরার স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটিকে স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। হেরিটেজ মর্যাদা পেলে বাড়িটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব আরও সুস্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে। পাশাপাশি সেখানে একটি সংগ্রহশালা বা স্মৃতি-গ্যালারি গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হলে নতুন প্রজন্ম মাতঙ্গিনী হাজরার জীবন ও স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস আরও কাছ থেকে জানতে পারবে।
ভারতের জাতীয় মিশন অন মনুমেন্টস অ্যান্ড অ্যান্টিকুইটিজের আওতায় ঐতিহাসিক স্থাপনা ও নির্মিত ঐতিহ্য নথিভুক্ত করার ব্যবস্থাও রয়েছে। ফলে মাতঙ্গিনী হাজরার স্মৃতিবিজড়িত স্থানের যথাযথ সমীক্ষা, নথিভুক্তকরণ এবং সংরক্ষণের দাবি বাস্তবায়নের সুযোগ রয়েছে।
ইতিহাসের পাতায় মাতঙ্গিনী হাজরার আত্মত্যাগ ইতিমধ্যেই অমর। এবার তাঁর স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটিও যথাযথ মর্যাদা পাক—এটাই স্থানীয় বাসিন্দা ও ইতিহাসপ্রেমীদের দাবি। ব্রিটিশের বন্দুকের সামনে যে নারী মাথা নত করেননি, তাঁর স্মৃতির ঠিকানাটিও যেন অবহেলা ও বিস্মৃতির অন্ধকারে হারিয়ে না যায়।

Post a Comment

Previous Post Next Post