লক্ষ্মীপুজোর বাজারে ‘অলক্ষ্মী’র ছায়া, আকাশছোঁয়া দামে নাভিশ্বাস গৃহস্থের


# লক্ষ্মীপুজোর বাজারে ‘অলক্ষ্মী’র ছায়া! পুজোর উপকরণ থেকে আনাজপাতি, আকাশছোঁয়া দামে নাভিশ্বাস গৃহস্থের

কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো মানেই বাঙালির ঘরে ঘরে উৎসবের আমেজ। ধন-সম্পদ, সুখ-সমৃদ্ধি ও মঙ্গল কামনায় মা লক্ষ্মীর আরাধনায় মেতে ওঠেন সাধারণ মানুষ। কিন্তু এ বছর লক্ষ্মীপুজোর আগে বাজারদরের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা সেই উৎসবের আনন্দে অনেকটাই বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুজোর উপকরণ থেকে শুরু করে আনাজপাতি, প্রায় সব কিছুর দামই চড়া। ফলে পুজোর বাজার করতে গিয়ে কার্যত নাজেহাল হচ্ছেন সাধারণ ক্রেতারা। উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলার বাজারেও দেখা যাচ্ছে একই ছবি। ব্যাগভর্তি বাজার করার ইচ্ছা থাকলেও সাধ ও সাধ্যের মধ্যে বিস্তর ফারাক তৈরি হয়েছে। তাই বাধ্য হয়েই পুজোর আয়োজনে কাটছাঁট করে দেবীর আরাধনার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বহু পরিবার।

শুক্রবার থেকেই বিভিন্ন বাজারে লক্ষ্মীপুজোর কেনাকাটাকে কেন্দ্র করে ক্রেতাদের ভিড় বাড়তে শুরু করেছে। তবে বাজারে ভিড় বাড়লেও স্বস্তি নেই ক্রেতাদের। পছন্দের পুজোর উপকরণ কিনতে গিয়ে বিক্রেতাদের সঙ্গে দর কষাকষি করতে হচ্ছে অনেককেই। কিন্তু তাতেও খুব একটা লাভ হচ্ছে না। ক্রেতাদের অভিযোগ, সামান্য কয়েকটি উপকরণ কিনতেই আগের তুলনায় অনেক বেশি টাকা খরচ করতে হচ্ছে। ফলে সংসারের অন্যান্য খরচ সামলে পুজোর আয়োজন করা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে।

লক্ষ্মীপুজোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ ধানের শিষ। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, দেবীর আসনের পাশে ধানের শিষ রাখার রেওয়াজ রয়েছে। কিন্তু সেই ধানের শিষের দামও এখন ক্রেতাদের চিন্তা বাড়াচ্ছে। বাজারে একটি ধানের শিষ বিক্রি হচ্ছে পাঁচ টাকা দরে। ফলে প্রয়োজন অনুযায়ী ধানের শিষ কিনতে গেলেও খরচের অঙ্ক বেড়ে যাচ্ছে। পাঁচ গ্রাম ওজনের পঞ্চশস্যের একটি প্যাকেটের দাম পৌঁছেছে ২০ টাকায়। পুজোর প্রয়োজনীয় এই সামগ্রীগুলির দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেকেই হিসেব কষে কেনাকাটা করতে বাধ্য হচ্ছেন।

শুধু ধানের শিষ কিংবা পঞ্চশস্য নয়, পুজোর অন্যান্য সামগ্রীর দামও যথেষ্ট চড়া। সরু কাগজের মালা কিনতে খরচ হচ্ছে ২৫ টাকা। একই দামে বিক্রি হচ্ছে চাঁদমালা। আলপনা দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ছোট্ট এক টুকরো খড়িমাটির দামও ১০ টাকা। অন্যদিকে, লক্ষ্মীর পায়ের ছাপের স্টিকার কিনতে ক্রেতাদের গুনতে হচ্ছে ১৫ থেকে ২০ টাকা। পুজোর সাজসজ্জার জন্য সামান্য কয়েকটি জিনিস কিনতেই যখন উল্লেখযোগ্য টাকা খরচ হচ্ছে, তখন বড়সড় আয়োজন করতে গিয়ে সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের বাজেট যে চাপে পড়ছে, তা বলাই বাহুল্য।

এদিকে, পুজোর অন্যতম প্রয়োজনীয় সামগ্রী মাটির প্রদীপ, ঘট, ডাব এবং আখের দামও ক্রেতাদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। শুক্রবার বাজারে দুটি সলতে-সহ একটি মাটির প্রদীপের দাম ছিল ১০ টাকা। পুজোর জন্য প্রয়োজনীয় ঘট বিক্রি হয়েছে ২০ টাকায়। ছোট আকারের একটি ডাবের দাম পড়ছে ২৫ টাকা। অন্যদিকে, একটি আখ কিনতে ক্রেতাদের খরচ করতে হচ্ছে ৩০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত। ফলে পুজোর উপকরণ কেনার সময় প্রতিটি সামগ্রীর দাম বিবেচনা করে এগোতে হচ্ছে গৃহস্থদের।

প্রতি বছরই লক্ষ্মীপুজোকে কেন্দ্র করে বাজারে কেনাকাটার চাপ থাকে। তবে এ বছর পুজোর উপকরণ এবং আনাজপাতির চড়া দাম সেই চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। একদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের খরচ, অন্যদিকে উৎসবের আয়োজন—দুইয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য রাখতে গিয়ে সমস্যায় পড়ছেন সাধারণ মানুষ। অনেকেই পুজোর তালিকা ছোট করছেন, কেউ আবার প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনেই কাজ চালানোর পরিকল্পনা করছেন। দেবীর আরাধনায় যাতে কোনও খামতি না থাকে, সেই চেষ্টা থাকলেও আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে ইচ্ছামতো আয়োজন করা সম্ভব হচ্ছে না বহু পরিবারের।

বাজারের বিক্রেতাদের আশঙ্কা, লক্ষ্মীপুজোর আগে শেষ মুহূর্তের কেনাকাটা বাড়লে শনিবার দাম আরও বাড়তে পারে। ফলে পুজোর আগের দিন বাজার করতে আসা ক্রেতাদের আরও বেশি টাকা খরচ করতে হতে পারে। শেষ মুহূর্তে প্রয়োজনীয় উপকরণ কেনার তাগিদে অনেকেই বাধ্য হয়ে চড়া দামেই সামগ্রী কিনবেন বলে মনে করা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে, কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর আগে উত্তরবঙ্গের বাজারে উৎসবের প্রস্তুতির পাশাপাশি উদ্বেগের ছবিও স্পষ্ট। একদিকে মা লক্ষ্মীর আরাধনায় ঘরে ঘরে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি, অন্যদিকে বাজারদরের চাপে হিসেব কষে পুজোর আয়োজন করতে হচ্ছে সাধারণ গৃহস্থকে। ঐশ্বর্যের দেবীর পুজোকে ঘিরে আনন্দের আবহ থাকলেও আকাশছোঁয়া দামের কারণে সেই আনন্দে যেন অদৃশ্য বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘অলক্ষ্মী’র ছায়া।

Post a Comment

Previous Post Next Post