বাংলার উপকূলে আছড়ে পড়বে ঘূর্ণিঝড়? কবে? কলকাতা-জেলায় কতটা প্রভাব?


কলকাতা: অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে কি ঘূর্ণিঝড়ের মুখে পড়তে পারে বাংলা? বঙ্গোপসাগরে একটি নিম্নচাপ তৈরির সম্ভাবনা ঘিরে আবহাওয়ার পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছেন আবহবিদরা। ভারতের মৌসম ভবন (IMD)-এর ২০ অক্টোবর ২০২৬-এর Tropical Weather Outlook অনুযায়ী, দক্ষিণ-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর ও তামিলনাড়ু উপকূল সংলগ্ন এলাকায় থাকা ঘূর্ণাবর্তের প্রভাবে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে একটি নিম্নচাপ অঞ্চল তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি থাইল্যান্ড উপসাগর সংলগ্ন এলাকায় থাকা আরও একটি ঘূর্ণাবর্ত আন্দামান সাগর হয়ে বঙ্গোপসাগরের দিকে এগিয়ে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই দ্বিতীয় ঘূর্ণাবর্তের প্রভাবে ২৩ অক্টোবর নাগাদ দক্ষিণ-পূর্ব ও সংলগ্ন মধ্য-পূর্ব বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ তৈরি হতে পারে বলে পূর্বাভাসে উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে সেটি উত্তর-পশ্চিম দিকে এগিয়ে আরও শক্তিশালী হতে পারে। তবে এই মুহূর্তে ঘূর্ণিঝড় তৈরি হওয়া বা তার সম্ভাব্য গতিপথ সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর সময় আসেনি।
বঙ্গোপসাগরে কী পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে?

মৌসম ভবনের পূর্বাভাস অনুযায়ী, দক্ষিণ-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর ও তামিলনাড়ু উপকূল সংলগ্ন ঘূর্ণাবর্তটি ২০ অক্টোবরও সক্রিয় ছিল। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫.৮ কিলোমিটার উচ্চতা পর্যন্ত বিস্তৃত এই ঘূর্ণাবর্তের প্রভাবে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিম্নচাপ তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে।

অন্যদিকে, থাইল্যান্ড উপসাগর ও সংলগ্ন এলাকায় থাকা আরও একটি ঘূর্ণাবর্ত ২১ অক্টোবরের মধ্যে উত্তর আন্দামান সাগরে প্রবেশ করতে পারে। এরপর সেটি উত্তর-পশ্চিম দিকে এগিয়ে ২৩ অক্টোবর নাগাদ দক্ষিণ-পূর্ব ও সংলগ্ন মধ্য-পূর্ব বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ তৈরি করতে পারে।

এই দ্বিতীয় ব্যবস্থাটি পরবর্তী সময়ে আরও শক্তিশালী হবে কি না, তা নির্ভর করবে সমুদ্র ও বায়ুমণ্ডলের পরিস্থিতির উপর। বর্তমানে ঘূর্ণাবর্ত থেকে নিম্নচাপ এবং সেখান থেকে ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনাকে আলাদা করে দেখা জরুরি।

অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে কি ঘূর্ণিঝড় তৈরি হতে পারে?

Weather Ultima-র সম্ভাব্য পরিস্থিতি বিশ্লেষণে এই ঘূর্ণাবর্তের আরও শক্তিশালী হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। সেই বিশ্লেষণ অনুযায়ী, অনুকূল পরিস্থিতি থাকলে নিম্নচাপটি সুস্পষ্ট নিম্নচাপ, গভীর নিম্নচাপ এবং পরবর্তী সময়ে ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হতে পারে।

সমুদ্রের উপরিভাগের তাপমাত্রা, বায়ুমণ্ডলের আর্দ্রতা, বায়ুপ্রবাহ এবং বায়ুর গতিবেগের পরিবর্তন এই ধরনের ব্যবস্থার শক্তি বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে কোনও ঘূর্ণাবর্তের উপস্থিতি মানেই ঘূর্ণিঝড় তৈরি হবে, এমন নয়।

মৌসম ভবনের ২০ অক্টোবরের বুলেটিনে পরবর্তী ১৬৮ ঘণ্টার মধ্যে নিম্নচাপ থেকে গভীরতর ব্যবস্থায় পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা ধাপে ধাপে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথম ১২০ ঘণ্টায় ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির সম্ভাবনা 'NIL' বা নেই বলে দেখানো হয়েছে। ১২০-১৪৪ ঘণ্টায় সম্ভাবনা 'LOW' এবং ১৪৪-১৬৮ ঘণ্টায় 'MOD' বা মাঝারি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই পূর্বাভাসের সময়সীমা ও পরবর্তী আপডেটের ভিত্তিতেই পরিস্থিতি বিচার করতে হবে।

বাংলার কোন কোন এলাকায় প্রভাব পড়তে পারে?

ঘূর্ণাবর্তটি পরবর্তী সময়ে কোন দিকে এগোবে, তার উপরেই বাংলার আবহাওয়ার সম্ভাব্য প্রভাব অনেকটাই নির্ভর করবে। Weather Ultima-র বিশ্লেষণে কয়েকটি সম্ভাব্য পরিস্থিতির কথা বলা হয়েছে।

প্রথম পরিস্থিতি: ব্যবস্থাটি অন্ধ্রপ্রদেশ বা দক্ষিণ ওড়িশা উপকূলের দিকে এগোলে উপকূলবর্তী এলাকায় বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ার প্রভাব পড়তে পারে। দক্ষিণবঙ্গের অভ্যন্তরীণ জেলাগুলিতে, কলকাতা-সহ আশপাশের এলাকায় হালকা থেকে বিচ্ছিন্নভাবে মাঝারি বৃষ্টির সম্ভাবনার কথা ওই বিশ্লেষণে বলা হয়েছে।

দ্বিতীয় পরিস্থিতি: নিম্নচাপটি উত্তর ওড়িশা বা বাংলাদেশের দিকে এগোলে উপকূলবর্তী এলাকায় প্রভাব তুলনামূলক বেশি হতে পারে। সে ক্ষেত্রে দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় দমকা হাওয়া এবং বিচ্ছিন্নভাবে ভারী বৃষ্টির পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে অনুমান করা হয়েছে।

তৃতীয় পরিস্থিতি: ব্যবস্থাটি যদি পশ্চিমবঙ্গ উপকূলের কাছাকাছি চলে আসে অথবা স্থলভাগে প্রবেশের পর উত্তর-পূর্ব দিকে বাঁক নেয়, সে ক্ষেত্রে দক্ষিণবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকায় আবহাওয়ার পরিবর্তন হতে পারে। উপকূল ও সুন্দরবন এলাকায় প্রভাবের পাশাপাশি উত্তরবঙ্গ, সিকিম এবং সংলগ্ন পাহাড়ি অঞ্চলে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনাও পরিস্থিতি অনুযায়ী খতিয়ে দেখতে হবে।

তবে এই তিনটি পরিস্থিতিই সম্ভাব্য গতিপথের উপর নির্ভরশীল বিশ্লেষণ। এগুলির কোনওটিকেই এখনও নিশ্চিত পূর্বাভাস হিসেবে ধরা যাচ্ছে না।

কলকাতায় কি বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ার আশঙ্কা?

কলকাতা-সহ দক্ষিণবঙ্গে অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে বৃষ্টি বা ঝোড়ো হাওয়া হবে কি না, তা নির্ভর করবে বঙ্গোপসাগরে তৈরি হতে চলা নিম্নচাপের অবস্থান, শক্তি এবং গতিপথের উপর। ব্যবস্থাটি উপকূলের কাছাকাছি এলে আবহাওয়ার পরিবর্তনের সম্ভাবনা বাড়তে পারে। কিন্তু নিম্নচাপ দূরে থাকলে বা অন্য দিকে সরে গেলে প্রভাব অনেকটাই আলাদা হতে পারে।

এই মুহূর্তে কলকাতায় নির্দিষ্ট দিনে ভারী বৃষ্টি, ঝোড়ো হাওয়া কিংবা ঘূর্ণিঝড়ের সরাসরি প্রভাবের বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না। পরবর্তী সময়ে মৌসম ভবনের বুলেটিনে বৃষ্টির পরিমাণ, বাতাসের গতিবেগ এবং সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

শুধু বঙ্গোপসাগর নয়, আরব সাগরেও নিম্নচাপ

মৌসম ভবনের একই বুলেটিনে আরব সাগরের পরিস্থিতির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। দক্ষিণ-পশ্চিম আরব সাগরে থাকা সুস্পষ্ট নিম্নচাপ অঞ্চলটি ২০ অক্টোবর পশ্চিম-উত্তর-পশ্চিম দিকে সরে গিয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত ঘূর্ণাবর্তটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৭.৬ কিলোমিটার উচ্চতা পর্যন্ত বিস্তৃত।

এই ব্যবস্থাটি পরবর্তী ১২ ঘণ্টায় একই দিকে এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এরপর ২১ অক্টোবর পর্যন্ত নিম্নচাপ অঞ্চল হিসেবে এগিয়ে ২২ অক্টোবর নাগাদ সোমালিয়া উপকূলের দিকে পশ্চিম-দক্ষিণ-পশ্চিমমুখী হতে পারে বলে পূর্বাভাসে জানানো হয়েছে।

অর্থাৎ, বঙ্গোপসাগর ও আরব সাগর—দুই এলাকাতেই আবহাওয়ার পরিস্থিতির উপর নজর রাখা হচ্ছে। তবে দুটি ব্যবস্থার গতিপথ ও সম্ভাব্য প্রভাব আলাদা করে বিচার করতে হবে।

এখন কী বলছে আবহাওয়ার পূর্বাভাস?

২০ অক্টোবরের বুলেটিন অনুযায়ী, বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে এবং পরবর্তী সময়ে সেটি শক্তিশালী হতে পারে। কিন্তু ঘূর্ণিঝড় তৈরি হওয়া, তার সম্ভাব্য তীব্রতা, স্থলভাগে প্রবেশের স্থান এবং বাংলায় প্রভাবের মাত্রা এখনও নিশ্চিত নয়।

তাই এখনই ঘূর্ণিঝড়ের সতর্কতা জারি হয়েছে বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়। আবহাওয়ার পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মৌসম ভবনের পরবর্তী বুলেটিন ও সরকারি সতর্কবার্তা অনুসরণ করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষত উপকূলবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের সরকারি নির্দেশিকা মেনে চলা এবং গুজবের বদলে নির্ভরযোগ্য আবহাওয়ার তথ্যের উপর ভরসা করা প্রয়োজন। 

Post a Comment

Previous Post Next Post