গবাদি পশুর শামোন্ডা ভাইরাস মানুষের শরীরে! কতটা চিন্তার, কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা?


### গবাদি পশুর শরীর থেকে মানুষের দেহে শামোন্ডা ভাইরাস! কতটা উদ্বেগের, কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা?

চিন থেকে এসেছিল করোনা, এ বার কি ফ্রান্স থেকে নতুন ভাইরাসের আতঙ্ক? গরু-ঘোড়ার শরীরে সংক্রমণ ছড়ানো শামোন্ডা ভাইরাসের মানুষের শরীরে উপস্থিতি ঘিরে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ। পশু থেকে মানুষের শরীরে এই ভাইরাসের সংক্রমণের ঘটনা প্রথম বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এখনই মহামারির আশঙ্কা করা কতটা যুক্তিযুক্ত? ভাইরাসটির সংক্রমণ ক্ষমতা, উপসর্গ এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে নজর রাখছেন বিশেষজ্ঞরা।

করোনা অতিমারির স্মৃতি এখনও মানুষের মনে টাটকা। এক ভাইরাসের সংক্রমণ কী ভাবে গোটা বিশ্বের জনজীবন, অর্থনীতি এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে, তা দেখেছে পৃথিবী। সেই অভিজ্ঞতার পর নতুন কোনও ভাইরাসের মানুষের শরীরে সংক্রমণের খবর সামনে এলেই স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ বাড়ে। সম্প্রতি গবাদি পশুর মধ্যে সংক্রমণ ছড়ানোর সঙ্গে যুক্ত শামোন্ডা ভাইরাসের মানুষের শরীরে উপস্থিতির খবর সেই উদ্বেগকে আরও উসকে দিয়েছে।

প্রাথমিকভাবে যে তথ্য সামনে এসেছে, তাতে ফ্রান্সে এই সংক্রান্ত ঘটনাটি ঘটেছে বলে উল্লেখ করা হচ্ছে। ঘটনাস্থল থেকে বাংলার দূরত্ব প্রায় সাত হাজার আটশো কিলোমিটার। ফলে ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে রাজ্যে এই মুহূর্তে সরাসরি বিপদের আশঙ্কা নিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর সুযোগ নেই। তবে সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে শুধু দূরত্বের হিসাব দিয়ে ঝুঁকি নির্ধারণ করা যায় না। ভাইরাসটির প্রকৃতি, মানুষের শরীরে সংক্রমণের পথ এবং এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তির শরীরে ছড়ানোর ক্ষমতা—এই সমস্ত বিষয় খতিয়ে দেখা জরুরি।

### ফ্রান্সে প্রথম মানব সংক্রমণ, কী জানা যাচ্ছে?

ফ্রান্সের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের অক্টোবর মাসে লিয়ঁ শহরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এক গুরুতর অসুস্থ রোগীর শরীরে শামোন্ডা ভাইরাসের উপস্থিতি শনাক্ত হয়। ওই রোগীর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অত্যন্ত দুর্বল ছিল। অক্টোবরের গোড়ার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়। তবে ভাইরাসটিই সরাসরি মৃত্যুর কারণ কি না, তা নিয়ে তদন্ত চলছে।

এই ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর আগে কয়েক দশক ধরে ভাইরাসটির অস্তিত্ব জানা থাকলেও মানুষের শরীরে সংক্রমণের কোনও নথিভুক্ত ঘটনা সামনে আসেনি। ফলে নতুন এই তথ্য ভাইরাসটির সংক্রমণ ক্ষমতা এবং মানুষের স্বাস্থ্যের উপর সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে আরও গবেষণার প্রয়োজনীয়তা বাড়িয়েছে।

### কী এই শামোন্ডা ভাইরাস?

শামোন্ডা ভাইরাস মূলত গবাদি পশুর মধ্যে সংক্রমণ ছড়ানোর জন্য পরিচিত। এটি Orthobunyavirus গোত্রের একটি ভাইরাস। ১৯৬০-এর দশকে নাইজেরিয়ায় প্রথম এই ভাইরাস শনাক্ত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে আফ্রিকা ও জাপানের বিভিন্ন অঞ্চলে পশুর শরীরে এর উপস্থিতির খবর পাওয়া যায়। ২০২৬ সালে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে গবাদি পশুর মধ্যে ভাইরাসটি শনাক্ত হওয়ার পর নতুন করে নজরদারি শুরু হয়।

গরু, ভেড়া, ছাগল-সহ বিভিন্ন প্রাণী এই ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে। ঘোড়ার শরীরেও ভাইরাসটির উপস্থিতি পাওয়া গিয়েছে। পশুদের ক্ষেত্রে জ্বর, দুধ উৎপাদন কমে যাওয়া এবং প্রজনন সংক্রান্ত সমস্যার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তবে ভাইরাসটির নতুন ইউরোপীয় ধরনের প্রভাব সম্পর্কে এখনও বিস্তারিত গবেষণা চলছে।

### কী ভাবে ছড়ায় এই ভাইরাস?

বিশেষজ্ঞদের মতে, শামোন্ডা ভাইরাস সাধারণত Culicoides প্রজাতির ক্ষুদ্র রক্তচোষা পোকা বা মিজের কামড়ের মাধ্যমে পশুর মধ্যে ছড়ায়। ফ্রান্সে শনাক্ত হওয়া মানব সংক্রমণের ক্ষেত্রেও সংক্রমিত পোকার কামড়কে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে সংক্রমণের প্রকৃত উৎস নিশ্চিত করতে তদন্ত চলছে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, পশুর মধ্যে ভাইরাস ছড়ানো এবং মানুষের মধ্যে সরাসরি সংক্রমণ ছড়ানো এক বিষয় নয়। এখনও পর্যন্ত একজন মানুষের শরীরে সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। সেই ঘটনা থেকে ভাইরাসটি মানুষে মানুষে ছড়াতে পারে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর মতো প্রমাণ মেলেনি।

### করোনা আতঙ্ক কি ফিরতে পারে?

নতুন কোনও ভাইরাসের ক্ষেত্রে করোনার সঙ্গে তুলনা স্বাভাবিক হলেও, দুটি ভাইরাসের সংক্রমণ ক্ষমতা ও বিস্তারের ধরন এক বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। করোনা ভাইরাসের ক্ষেত্রে মানুষে মানুষে সংক্রমণ ছড়ানোর প্রমাণিত ক্ষমতা ছিল। শামোন্ডা ভাইরাসের ক্ষেত্রে এখনও পর্যন্ত তেমন কোনও সংক্রমণের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

ফ্রান্সের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ এবং ইউরোপীয় রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বর্তমান তথ্যের ভিত্তিতে সাধারণ মানুষের জন্য উল্লেখযোগ্য স্বাস্থ্যঝুঁকি চিহ্নিত হয়নি। তবে ঘটনাটি বিরল এবং নতুন হওয়ায় পরিস্থিতির উপর নজর রাখা হচ্ছে।

অতএব, করোনা অতিমারির মতো পরিস্থিতি তৈরি হবে বলে এখনই আশঙ্কা করার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। আবার একটি মানব সংক্রমণের ঘটনা সামনে আসায় ভাইরাসটিকে নিয়ে গবেষণা ও নজরদারি চালিয়ে যাওয়াও জরুরি।

### কতটা চিন্তার? কী বলছে বর্তমান তথ্য?

এখনও পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

* মানুষের শরীরে সংক্রমণ: ফ্রান্সে প্রথম নথিভুক্ত মানব সংক্রমণের ঘটনা সামনে এসেছে।

* সংক্রমণের উৎস: সংক্রমিত ক্ষুদ্র পোকার কামড় একটি সম্ভাব্য কারণ, তবে তদন্ত চলছে।

* মানুষে মানুষে সংক্রমণ: এখনও পর্যন্ত এমন সংক্রমণের কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

* চিকিৎসা ও প্রতিষেধক: ভাইরাসটির বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট চিকিৎসা বা অনুমোদিত টিকা বর্তমানে উপলব্ধ নেই বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য জানাচ্ছে।

* সাধারণ মানুষের ঝুঁকি: বর্তমান প্রমাণের ভিত্তিতে সাধারণ মানুষের জন্য উল্লেখযোগ্য স্বাস্থ্যঝুঁকি শনাক্ত করেনি ফ্রান্সের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ।

সব মিলিয়ে, শামোন্ডা ভাইরাসের মানব সংক্রমণের ঘটনা চিকিৎসাবিজ্ঞানের কাছে গুরুত্বপূর্ণ এবং আরও অনুসন্ধানের দাবি রাখে। কিন্তু একটি বিরল সংক্রমণের খবরকে কেন্দ্র করে নতুন অতিমারির আশঙ্কা ছড়ানোও ঠিক নয়। ভাইরাসটি কী ভাবে মানুষের শরীরে পৌঁছল, সংক্রমণের ক্ষেত্রে এর ভূমিকা কতটা এবং ভবিষ্যতে অন্য কোনও মানুষের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে কি না—এখন সেই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজছেন গবেষক ও স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ।

ফ্রান্স থেকে প্রায় সাত হাজার আটশো কিলোমিটার দূরে বাংলা। কিন্তু শুধু দূরত্বের হিসাব নয়, ভাইরাসের প্রকৃতি এবং সংক্রমণ ছড়ানোর ক্ষমতা বুঝেই ঝুঁকি নির্ধারণ করতে হবে। আপাতত আতঙ্ক নয়, বরং নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে সতর্ক নজরদারিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

Post a Comment

Previous Post Next Post