# মাছির মতো ঝরে পড়ে একের পর এক ড্রোন! ইউক্রেনে স্টারলিঙ্ক বিভ্রাটের নেপথ্যে কি খোদ এলন মাস্ক? যুদ্ধে বড় ধাক্কা কিয়েভের
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ময়দানে আধুনিক প্রযুক্তির গুরুত্ব যে কতটা, তা বারবার প্রমাণিত হয়েছে। বিশেষ করে ড্রোন পরিচালনা, সেনাবাহিনীর মধ্যে যোগাযোগ এবং যুদ্ধক্ষেত্রে দ্রুত গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে কৃত্রিম উপগ্রহভিত্তিক ইন্টারনেট পরিষেবা স্টারলিঙ্ক। কিন্তু সেই স্টারলিঙ্ক পরিষেবায় বিভ্রাটই ইউক্রেনের সামরিক অভিযানে বড়সড় প্রভাব ফেলেছিল বলে দাবি করা হচ্ছে। একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরিষেবার সঙ্গে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় ইউক্রেনের একাধিক ড্রোন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে আকাশ থেকে ভেঙে পড়ে। সব মিলিয়ে বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে কিয়েভের সেনাবাহিনী। এই ঘটনার পর থেকেই প্রশ্ন উঠছে, যুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত সহায়তার উপর নির্ভরশীলতা ইউক্রেনের জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে? একই সঙ্গে স্টারলিঙ্ক পরিষেবার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মার্কিন ধনকুবের এলন মাস্কের ভূমিকা নিয়েও শুরু হয়েছে আলোচনা।
২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরু করার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে যোগাযোগব্যবস্থা সচল রাখতে স্টারলিঙ্ক পরিষেবা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এলন মাস্কের সংস্থা স্পেসএক্সের পরিচালিত এই স্যাটেলাইটভিত্তিক ইন্টারনেট পরিষেবার সাহায্যে ইউক্রেনের সেনাবাহিনী যুদ্ধক্ষেত্রে যোগাযোগ বজায় রাখা, বিভিন্ন ইউনিটের মধ্যে সমন্বয় তৈরি করা এবং ড্রোন পরিচালনার মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে এসেছে। প্রচলিত যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও স্টারলিঙ্কের মাধ্যমে ইন্টারনেট সংযোগ পাওয়ার সুযোগ থাকায় যুদ্ধের ময়দানে এই প্রযুক্তির গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়।
কিন্তু সাম্প্রতিক বিভ্রাটের ঘটনা সেই নির্ভরতা নিয়েই নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্টারলিঙ্কের সঙ্গে সংযোগে সমস্যা দেখা দেওয়ায় ইউক্রেনের একাধিক ড্রোনের নিয়ন্ত্রণ ও ভিডিও ফিডে বিঘ্ন ঘটে। রাশিয়ার সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালানোর উদ্দেশ্যে এগিয়ে যাচ্ছিল ড্রোনগুলি। ঠিক সেই সময় আচমকাই ড্রোনগুলির ভিডিও ফিড কাজ করা বন্ধ করে দেয় বলে দাবি করেছেন ইউক্রেনের এক সামরিক কমান্ডার। ড্রোনের সঙ্গে স্টারশিল্ডের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় সেগুলির পরিচালনায় সমস্যা তৈরি হয়। এর পর একের পর এক ড্রোন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে আকাশ থেকে ভেঙে পড়ে বলে অভিযোগ।
ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ঘটনায় ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ১০ লক্ষ ডলারেরও বেশি হতে পারে। তবে ক্ষয়ক্ষতির এই হিসাব এবং কতগুলি ড্রোন সরাসরি পরিষেবা বিভ্রাটের কারণে নষ্ট হয়েছে, সে সম্পর্কে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। যুদ্ধের পরিস্থিতিতে সামরিক সরঞ্জামের ক্ষয়ক্ষতির তথ্য যাচাই করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। তা সত্ত্বেও ঘটনাটি ইউক্রেনের ড্রোননির্ভর সামরিক কৌশলের সামনে একটি বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
শুধু ড্রোন হারানোই নয়, পরিষেবায় বিভ্রাটের প্রভাব পড়েছিল সামরিক অভিযানের গতিতেও। সংশ্লিষ্ট কমান্ডারের দাবি অনুযায়ী, সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পর তাঁর অধীনস্থ কয়েকটি ইউনিটকে প্রায় তিন দিন ধরে কার্যত অধিকাংশ কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হয়েছিল। আধুনিক যুদ্ধে যেখানে কয়েক মিনিটের যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতাও অভিযানের গতিপথ বদলে দিতে পারে, সেখানে দীর্ঘ সময় ধরে স্যাটেলাইট সংযোগে সমস্যা তৈরি হলে তার প্রভাব কতটা গুরুতর হতে পারে, এই ঘটনাই তা সামনে এনেছে।
প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, ইউক্রেনের কিছু ড্রোন ঘণ্টায় প্রায় ৪০০ কিলোমিটার গতিতে উড়তে সক্ষম। কিন্তু স্টারলিঙ্ক সংযোগে বিভ্রাটের পর সংশ্লিষ্ট ড্রোনগুলির গতি ঘণ্টায় প্রায় ৬৪ কিলোমিটারে নেমে এসেছিল বলে অভিযোগ। তবে এই গতির পরিবর্তনের কারণ এবং সব ড্রোনের ক্ষেত্রে একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়। ড্রোনের নকশা, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, যোগাযোগের ধরন এবং বিকল্প প্রযুক্তির উপস্থিতির উপরও এ ধরনের সমস্যার প্রভাব নির্ভর করতে পারে।
এই বিভ্রাটের প্রভাব নাকি শুধু আক্রমণাত্মক ড্রোনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাতেও এর প্রভাব পড়েছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। রুশ ড্রোনকে মাঝআকাশে ধ্বংস করার জন্য ইউক্রেন যে ইন্টারসেপ্টর ড্রোন ব্যবহার করে, সেগুলির পরিচালনাতেও সমস্যা দেখা দিয়েছিল বলে খবর। ফলে একদিকে যেমন শত্রুপক্ষের সামরিক ঘাঁটিতে আঘাত হানার অভিযান ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়, অন্যদিকে তেমনই আকাশপথে রুশ ড্রোনের মোকাবিলা করার ক্ষমতা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ে।
এই পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই আলোচনায় উঠে এসেছে এলন মাস্কের সংস্থা স্পেসএক্সের ভূমিকা। ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী স্টারলিঙ্কের উপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হওয়ায় পরিষেবার সামান্য পরিবর্তন বা প্রযুক্তিগত সমস্যাও যুদ্ধক্ষেত্রে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। তবে পরিষেবায় বিভ্রাট ঘটেছে বলেই যে এলন মাস্ক নিজে ইচ্ছাকৃতভাবে তা ঘটিয়েছেন, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর মতো নিশ্চিত তথ্য এখনও সামনে নেই। প্রযুক্তিগত ত্রুটি, পরিষেবার সীমাবদ্ধতা, নেটওয়ার্ক পরিচালনার সিদ্ধান্ত কিংবা অন্য কোনও কারণে এই সমস্যা তৈরি হয়েছিল কি না, তা নির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতেই বিচার করা প্রয়োজন।
স্টারলিঙ্ক এবং স্টারশিল্ডের ভূমিকা নিয়েও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। স্টারলিঙ্ক মূলত স্যাটেলাইটভিত্তিক ইন্টারনেট পরিষেবা। অন্যদিকে, স্টারশিল্ড হল স্পেসএক্সের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত সরকারি গ্রাহকদের জন্য তৈরি পরিষেবা। যুদ্ধক্ষেত্রে সামরিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তিগুলির ব্যবহার এবং তার উপর নির্ভরশীলতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছে। তবে সংশ্লিষ্ট ঘটনায় ঠিক কোন প্রযুক্তিগত স্তরে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছিল, তা স্পষ্ট না হলে বিভ্রাটের প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করা কঠিন।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ক্রমশ প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠেছে। ড্রোন, স্যাটেলাইট যোগাযোগ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধের মতো ক্ষেত্রগুলি সামরিক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বেসরকারি সংস্থার প্রযুক্তির উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কোনও দেশের সামরিক পরিকল্পনায় কতটা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। কারণ, যুদ্ধক্ষেত্রে যোগাযোগব্যবস্থা সচল রাখা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই বিকল্প যোগাযোগের ব্যবস্থা এবং প্রযুক্তিগত বিপর্যয় সামাল দেওয়ার সক্ষমতাও অত্যন্ত জরুরি।
ইউক্রেনের ক্ষেত্রে স্টারলিঙ্কের গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু এই পরিষেবায় বিভ্রাটের জেরে ড্রোন অভিযান ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ ফের মনে করিয়ে দিল, আধুনিক যুদ্ধ শুধু অস্ত্রের শক্তির উপর নির্ভর করে না; নির্ভর করে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ এবং প্রযুক্তিগত পরিকাঠামোর উপরও। এখন এই বিভ্রাটের প্রকৃত কারণ কী ছিল, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কতটা এবং ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে ইউক্রেন কী পদক্ষেপ করে, সেদিকেই নজর থাকবে আন্তর্জাতিক মহলের।