মুড়ি-মিছরির এক দর হয়ে যাচ্ছে! জয় শাহের আইসিসির কাছে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে একটি বদলের আর্জি গাওস্করের


মুড়ি-মিছরির এক দর! টি-টোয়েন্টিতে রেকর্ডের শ্রেণিবিভাগ চেয়ে আইসিসি-কে বিশেষ প্রস্তাব সুনীল গাওস্করের

টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে একের পর এক নজির গড়ছে বিভিন্ন দেশ। কখনও এক ইনিংসে রানের পাহাড়, কখনও আবার অবিশ্বাস্য কম রানে গুটিয়ে যাচ্ছে গোটা দল। কোনও দেশ টানা জয়ের রেকর্ড গড়ছে, আবার কোনও দল বিপুল ব্যবধানে জয় কিংবা হারের নজির তৈরি করছে। কিন্তু এই সমস্ত রেকর্ড কি একই মাপকাঠিতে বিচার করা উচিত? ক্রিকেটের রেকর্ডের মূল্যায়ন নিয়ে এবার সেই প্রশ্নই তুললেন ভারতের প্রাক্তন অধিনায়ক সুনীল গাওস্কর। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পূর্ণ সদস্য দেশ এবং সহযোগী সদস্য দেশগুলির পারফরম্যান্সের মধ্যে পার্থক্য থাকা প্রয়োজন। সেই কারণেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) কাছে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের রেকর্ড সংরক্ষণের ক্ষেত্রে নতুন ব্যবস্থা চালু করার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি।

গাওস্করের বক্তব্য, বর্তমানে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে বিভিন্ন দেশের তৈরি করা রেকর্ড একই তালিকায় জায়গা পাচ্ছে। ফলে ক্রিকেটের শক্তিশালী দেশগুলির কৃতিত্ব এবং তুলনামূলক ভাবে দুর্বল দলগুলির পারফরম্যান্সের মধ্যে কোনও পৃথক শ্রেণিবিভাগ থাকছে না। তাঁর মতে, এই ব্যবস্থায় অনেক ক্ষেত্রেই রেকর্ডের প্রকৃত গুরুত্ব বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই সহযোগী সদস্য দেশগুলির রেকর্ড আলাদা বিভাগে রাখার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত আইসিসি-র।

### ৩৪৪ রান থেকে ৭ রান, টি-টোয়েন্টিতে অদ্ভুত সব নজির!

টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে রেকর্ডের তালিকায় এমন কিছু নজির রয়েছে, যা দেখে অবাক হতে হয়। এক দিকে যেমন কোনও দল প্রতিপক্ষের বোলারদের কার্যত দিশাহারা করে দিয়ে রানের পাহাড় গড়ছে, অন্য দিকে তেমনই কোনও দল ব্যাটিং বিপর্যয়ে অল্প রানেই অল আউট হয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন দেশের ক্রিকেটীয় দক্ষতা, অভিজ্ঞতা এবং প্রতিপক্ষের শক্তির তারতম্যও এই রেকর্ডগুলির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এক ইনিংসে সর্বোচ্চ রানের নজির গড়েছে জ়িম্বাবোয়ে। গাম্বিয়ার বিরুদ্ধে তারা ৩৪৪ রান তুলেছিল। সেই ম্যাচেই গাম্বিয়াকে বিপুল ব্যবধানে হারিয়ে দেয় জ়িম্বাবোয়ে। টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিকের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি রানে জয়ের ব্যবধানও ওই ম্যাচেই তৈরি হয়। অন্য দিকে, আইভরি কোস্টের নামের পাশে রয়েছে মাত্র ৭ রানে অল আউট হয়ে যাওয়ার নজির। অর্থাৎ, একই ফরম্যাটে এক দিকে ৩০০-র বেশি রান, অন্য দিকে এক অঙ্কের রানে ইনিংস শেষ হওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে।

আবার টানা টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ জয়ের ক্ষেত্রেও নজির গড়েছে স্পেন। টানা ২৪টি ম্যাচ জিতে তারা নিজেদের ধারাবাহিকতার প্রমাণ দিয়েছে। এই ধরনের রেকর্ড সামনে আসার পরই প্রশ্ন উঠছে, সব দেশের পারফরম্যান্সকে একই তালিকায় রেখে তুলনা করলে তা কতটা যুক্তিসংগত? গাওস্করের বক্তব্যের মূল সুরও সেখানেই।

### ফুটবলের উদাহরণ টেনে কী বললেন গাওস্কর?

রেকর্ডের শ্রেণিবিভাগ নিয়ে নিজের যুক্তি বোঝাতে ফুটবলের উদাহরণ টেনেছেন গাওস্কর। তাঁর মতে, ফুটবলে বিভিন্ন স্তরের লিগ থাকে। সেখানে দলগুলির পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে উন্নতি বা অবনমন হয়। ফলে কোনও দল কোন ডিভিশনে খেলছে, সেই বিষয়টি স্পষ্ট থাকে। কোনও প্রতিযোগিতায় তৈরি হওয়া রেকর্ডের মূল্যায়ন করার সময়ও সেই স্তর বিবেচনায় নেওয়া সম্ভব হয়।

গাওস্করের কথায়, “ফুটবল লিগে আমরা দেখেছি, বিভিন্ন ডিভিশনে অবনমন ও উন্নয়ন হয়। তাই কোনও রেকর্ড হলে সেটা কোন ডিভিশনে হয়, তা উল্লেখ করা থাকে। কিন্তু ক্রিকেটে তা হয় না। সেখানে বদল দরকার।”

অর্থাৎ, ফুটবলের মতো ক্রিকেটেও প্রতিযোগিতার স্তর অনুযায়ী রেকর্ড সংরক্ষণের ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে বলে মনে করছেন তিনি। তাঁর প্রস্তাব অনুযায়ী, পূর্ণ সদস্য দেশগুলির রেকর্ড এবং সহযোগী সদস্য দেশগুলির রেকর্ড আলাদা বিভাগে রাখা হলে পারফরম্যান্সের তুলনা আরও স্পষ্ট হতে পারে। তাতে কোনও দলের কৃতিত্বকে ছোট করা নয়, বরং রেকর্ডের প্রেক্ষাপটকে গুরুত্ব দেওয়াই হবে মূল উদ্দেশ্য।

### সহযোগী সদস্য দেশগুলির রেকর্ড কি আলাদা হবে?

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পূর্ণ সদস্য দেশগুলির পাশাপাশি সহযোগী সদস্য দেশগুলিও নিয়মিত অংশ নেয়। তবে ক্রিকেটের পরিকাঠামো, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, ঘরোয়া প্রতিযোগিতার মান এবং খেলোয়াড়দের সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে দেশগুলির মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। ফলে সব দেশের রেকর্ডকে একই মাপকাঠিতে বিচার করা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

গাওস্করের প্রস্তাব কার্যকর হলে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে রেকর্ডের তালিকা তৈরির পদ্ধতিতে পরিবর্তন আসতে পারে। সে ক্ষেত্রে কোন রেকর্ড পূর্ণ সদস্য দেশের বিরুদ্ধে তৈরি হয়েছে, কোনটি সহযোগী সদস্য দেশগুলির মধ্যে তৈরি হয়েছে, তা আলাদা করে বোঝার সুযোগ থাকবে। তবে এই ধরনের শ্রেণিবিভাগ চালু হলে তার নিয়ম কী হবে, কোন কোন রেকর্ড আলাদা তালিকায় রাখা হবে এবং আইসিসি আদৌ এই প্রস্তাব বিবেচনা করবে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।

ক্রিকেটে রেকর্ড মানেই শুধু সংখ্যার হিসাব নয়, সেই রেকর্ড কোন পরিস্থিতিতে তৈরি হয়েছে, প্রতিপক্ষ কতটা শক্তিশালী ছিল এবং ম্যাচের প্রেক্ষাপট কী ছিল, সেগুলিও গুরুত্বপূর্ণ। গাওস্করের বক্তব্যকে সেই বৃহত্তর বিতর্কের অংশ হিসাবেই দেখা হচ্ছে।

### রেকর্ডের গুরুত্ব নির্ধারণে নতুন ভাবনা

টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নতুন নতুন দেশের অংশগ্রহণও বেড়েছে। এই বিস্তার ক্রিকেটের পক্ষে ইতিবাচক। একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশের পারফরম্যান্সের তুলনা কীভাবে করা হবে, তা নিয়েও আলোচনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন গাওস্কর।

তাঁর প্রস্তাবের মূল কথা, সব রেকর্ডকে একই তালিকায় রাখলেই তাদের গুরুত্ব সমান হয়ে যায় না। তাই রেকর্ডের পাশে তার প্রেক্ষাপট এবং প্রতিযোগিতার স্তর উল্লেখ করা হলে ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছেও বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে।

এখন দেখার, গাওস্করের এই প্রস্তাব নিয়ে আইসিসি কী অবস্থান নেয়। তাঁর বক্তব্য ঘিরে ক্রিকেটের রেকর্ড সংরক্ষণের পদ্ধতি এবং পূর্ণ সদস্য ও সহযোগী সদস্য দেশগুলির পারফরম্যান্সের মূল্যায়ন নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

Post a Comment

Previous Post Next Post