### হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে তিলক-নীতীশের ব্যাটে জয় শ্রেয়সদের, নিউ জ়িল্যান্ডকে ৪ উইকেটে হারালেও উদ্বেগ বাড়াল ভারতের ব্যাটিং
নিউ জ়িল্যান্ডের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় টি-টোয়েন্টি ম্যাচেও জয় ছিনিয়ে নিল ভারত। তবে চার উইকেটের এই জয় স্বস্তি দিলেও ভারতীয় দলের ব্যাটিং নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠে গেল। কিউয়ি বোলারদের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ের সামনে শুরুতেই চাপে পড়ে গেলেন ভারতের উপরের দিকের ব্যাটারেরা। রান তাড়া করতে নেমে একের পর এক উইকেট হারিয়ে ম্যাচ কঠিন করে তুলেছিল ভারত। শেষ পর্যন্ত তিলক বর্মা ও নীতীশ কুমার রেড্ডির গুরুত্বপূর্ণ অবদানে জয় নিশ্চিত করলেন শ্রেয়স আয়ারেরা। নির্ধারিত লক্ষ্যে পৌঁছতে ভারতকে খেলতে হল ১৯.৫ ওভার। ছয় উইকেট হারিয়ে ১৮১ রান তুলে ম্যাচ জিতল ভারত। অন্য দিকে, প্রথমে ব্যাট করে পাঁচ উইকেটের বিনিময়ে ১৮০ রান করেছিল নিউ জ়িল্যান্ড।
ম্যাচের ফল ভারতের পক্ষে গেলেও ব্যাটিংয়ের দুর্বলতা নিয়ে উদ্বেগ থাকছেই। বিশেষ করে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতার আগে উপরের দিকের ব্যাটারদের ধারাবাহিকতা এবং বড় শট খেলার ক্ষেত্রে তাঁদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। চাপের মুখে কী ভাবে ইনিংস এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে, সেই পরীক্ষায় ভারতের একাধিক ব্যাটারকে ব্যর্থ হতে দেখা গেল। তবে কঠিন পরিস্থিতিতে ঠান্ডা মাথায় লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মানসিকতা দেখিয়ে দলকে জয়ের পথে ফেরালেন তিলক ও নীতীশ।
প্রথমে ব্যাট করে লড়াই করার মতো রান নিউ জ়িল্যান্ডের
ক্রাইস্টচার্চের মাঠে টসের পর প্রথমে ব্যাট করতে নেমে ভারতীয় বোলারদের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে নিউ জ়িল্যান্ড। শুরু থেকেই রান তোলার গতি ধরে রাখার চেষ্টা করেন কিউয়ি ব্যাটারেরা। ভারতীয় বোলারেরা মাঝেমধ্যে চাপ তৈরি করলেও সেই চাপকে কাজে লাগিয়ে প্রতিপক্ষকে অল্প রানে আটকে রাখা সম্ভব হয়নি। নির্ধারিত ওভারের শেষে পাঁচ উইকেট হারিয়ে ১৮০ রান তোলে নিউ জ়িল্যান্ড।
টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে ১৮০ রানকে যথেষ্ট প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ স্কোর হিসাবেই ধরা হয়। ফলে জয়ের জন্য ভারতীয় ব্যাটারদের শুরু থেকেই পরিকল্পনা মেনে খেলতে হত। পাওয়ার প্লে-তে দ্রুত রান তোলার পাশাপাশি উইকেট ধরে রাখাও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু রান তাড়া করতে নেমে সেই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বারবার সমস্যায় পড়ল ভারতীয় দল।
বড় শট খেলতে গিয়ে বিপাকে ভারতের উপরের সারি
১৮১ রানের লক্ষ্য নিয়ে ব্যাট করতে নেমে ভারতীয় দলের কাছ থেকে প্রত্যাশা ছিল আত্মবিশ্বাসী শুরু। কিন্তু নিউ জ়িল্যান্ডের বোলিং আক্রমণের সামনে সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারলেন না উপরের দিকের ব্যাটারেরা। সঞ্জু স্যামসন ও অভিষেক শর্মার মতো ব্যাটারেরা ঝুঁকি নিয়ে বড় শট খেলতে গিয়ে উইকেট হারালেন। শুরুতেই উইকেট পড়তে থাকায় ভারতের রান তাড়ার পরিকল্পনা ধাক্কা খায়।
টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে দ্রুত রান তোলার তাগিদ থাকলেও পরিস্থিতি বুঝে ব্যাটিং করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে রান তাড়া করার সময় একের পর এক উইকেট পড়লে পরবর্তী ব্যাটারদের উপর চাপ বাড়ে। ভারতের ক্ষেত্রেও সেই ছবিই দেখা গেল। আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করতে গিয়ে কেউ কেউ নিজেদের ইনিংস বড় করতে পারলেন না। ফলে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পরিবর্তে ভারতীয় দলকে বারবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতে হল।
প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ বৈভব সূর্যবংশীও। তাঁর কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের আশা থাকলেও দলের প্রয়োজনের সময়ে বড় ইনিংস খেলতে পারলেন না তিনি। ফলে ভারতের রান তাড়া করার পথে আরও কঠিন পরিস্থিতি তৈরি হয়। উপরের সারির ব্যাটারদের ব্যর্থতা আবারও মনে করিয়ে দিল, শুধু আক্রমণাত্মক মানসিকতা থাকলেই হয় না, পরিস্থিতি অনুযায়ী শট নির্বাচন এবং উইকেটের মূল্য বোঝাও জরুরি।
চাপ সামলে লড়াইয়ে ফেরালেন তিলক ও নীতীশ
উপরের দিকের ব্যাটারেরা প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারলেও ভারতীয় দলকে ম্যাচ থেকে ছিটকে যেতে দেননি পরবর্তী ব্যাটারেরা। কঠিন পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নিয়ে ব্যাটিং করেন তিলক বর্মা ও নীতীশ কুমার রেড্ডি। তাঁদের অবদান ভারতের রান তাড়ার লড়াইকে ফের জমিয়ে দেয়। প্রয়োজনের সময়ে রান তুলে দলের উপর থেকে চাপ কমানোর চেষ্টা করেন তাঁরা।
ম্যাচের শেষ দিকে প্রতিটি রানই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। লক্ষ্য থেকে দূরত্ব কমতে থাকলেও উইকেট হারানোর আশঙ্কা ছিল। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাটারদের দায়িত্ব ছিল অযথা ঝুঁকি না নিয়ে জয়ের দিকে এগিয়ে যাওয়া। তিলক ও নীতীশের লড়াই ভারতকে সেই সুযোগ করে দেয়। তাঁদের ব্যাটিংয়ের সুবাদেই শেষ পর্যন্ত জয়ের দরজা খুলে যায় শ্রেয়সদের সামনে।
শেষ ওভার পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হলেও ভারতীয় দল লক্ষ্য পূরণ করে। ১৯.৫ ওভারে ছয় উইকেট হারিয়ে ১৮১ রান তুলে চার উইকেটে ম্যাচ জিতে নেয় ভারত। এক সময় যে ম্যাচ কঠিন হয়ে উঠেছিল, শেষ পর্যন্ত সেই ম্যাচেই জয় নিশ্চিত করে ভারতীয় শিবির। তবে এই জয়ের পিছনে যেমন ইতিবাচক দিক রয়েছে, তেমনই রয়েছে ব্যাটিং নিয়ে ভাবনার যথেষ্ট কারণ।
একই দিনে লাল ও সাদা বলের ক্রিকেটে ব্যাটিং ব্যর্থতা
ভারতীয় ক্রিকেটের জন্য দিনের ছবিটা আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে অন্য একটি ম্যাচের ফলের কারণে। একই দিনে নিউ জ়িল্যান্ডের মাটিতে লাল বল ও সাদা বলের ক্রিকেটে ভারতীয় ব্যাটারদের ব্যর্থতা নজরে এসেছে। নিউ জ়িল্যান্ড ‘এ’ দলের বিরুদ্ধে লোকেশ রাহুল, যশস্বী জয়সওয়াল ও সাই সুদর্শনেরা প্রত্যাশা অনুযায়ী পারফর্ম করতে পারেননি। অন্য দিকে, টি-টোয়েন্টি ম্যাচেও শ্রেয়স আয়ারদের উপরের সারির ব্যাটিং সমস্যায় পড়েছে।
দুই ধরনের ক্রিকেটের মধ্যে ফরম্যাটগত পার্থক্য থাকলেও ব্যাটিংয়ের ক্ষেত্রে কিছু মৌলিক বিষয় একই থাকে। পরিস্থিতি বোঝা, বলের গুণমান অনুযায়ী শট নির্বাচন, উইকেটের মূল্য দেওয়া এবং ইনিংসকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দক্ষতা—সব ক্ষেত্রেই এই বিষয়গুলি গুরুত্বপূর্ণ। একই দিনে দুই ফরম্যাটে ব্যাটারদের ব্যর্থতা তাই ভারতীয় দলের প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনার জায়গা তৈরি করেছে।
বিশেষ করে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে দ্রুত রান তোলার চাপ অনেক বেশি। কিন্তু সেই চাপ সামলাতে গিয়ে যদি নিয়মিত উইকেট পড়তে থাকে, তা হলে বড় রান তাড়া করা কঠিন হয়ে যায়। নিউ জ়িল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যাচে ভারতের ব্যাটিংয়ের সেই দুর্বলতাই সামনে এসেছে। তবে ম্যাচ জেতার ফলে দলের আত্মবিশ্বাস বজায় থাকবে বলেই মনে করা হচ্ছে।
জয় এল, কিন্তু প্রশ্ন থাকছেই
নিউ জ়িল্যান্ডের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় টি-টোয়েন্টিতে জয় নিঃসন্দেহে ভারতের কাছে বড় প্রাপ্তি। প্রতিপক্ষের ১৮০ রানের জবাবে ১৮১ রান তুলে ম্যাচ জেতা প্রমাণ করে, কঠিন পরিস্থিতিতেও ভারতীয় দল লড়াই চালিয়ে যেতে পারে। তিলক বর্মা ও নীতীশ কুমার রেড্ডির মতো ব্যাটারদের অবদান দলের গভীরতার দিকটিও সামনে এনেছে।
তবে এই জয়কে সামনে রেখে ব্যাটিংয়ের সমস্যাগুলি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। সঞ্জু স্যামসন, অভিষেক শর্মা এবং বৈভব সূর্যবংশীর মতো ব্যাটারদের আরও দায়িত্বশীল ব্যাটিং করতে হবে। শুরুতেই উইকেট হারালে পরবর্তী ব্যাটারদের উপর যে বাড়তি চাপ তৈরি হয়, তা এই ম্যাচেই স্পষ্ট হয়েছে।
ভারতের কাছে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই ম্যাচ থেকে শিক্ষা নিয়ে পরবর্তী ম্যাচগুলিতে আরও পরিকল্পিত ব্যাটিং করা। আক্রমণাত্মক ক্রিকেট খেলতে হবে ঠিকই, কিন্তু কখন ঝুঁকি নিতে হবে আর কখন উইকেট ধরে রেখে ইনিংস এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে, সেই ভারসাম্য বজায় রাখাও জরুরি। কারণ, শেষ পর্যন্ত জয় এলেও নিউ জ়িল্যান্ডের বিরুদ্ধে এই ম্যাচ বুঝিয়ে দিল, ভারতের ব্যাটিং এখনও পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য হয়ে ওঠেনি।