# আদিবাসীদের চিকিৎসায় জীবন উৎসর্গ, খনিবিরোধী আন্দোলনে যোগ দিয়ে গ্রেফতার চিকিৎসক! ওড়িশায় চাঞ্চল্য
চিকিৎসাশাস্ত্র নিয়ে পড়াশোনা শেষ করে চেনা শহরের আরামদায়ক জীবন ছেড়ে প্রত্যন্ত গ্রামে আদিবাসীদের চিকিৎসায় নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন তিনি। ম্যালেরিয়া থেকে যক্ষ্মা, অপুষ্টি থেকে গর্ভবতী মহিলাদের স্বাস্থ্য—বিভিন্ন সমস্যায় আক্রান্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোই হয়ে উঠেছিল তাঁর জীবনের অন্যতম লক্ষ্য। কিন্তু সেই চিকিৎসকই এ বার ওড়িশায় বক্সাইট খনির বিরুদ্ধে আদিবাসীদের আন্দোলনে সমর্থন জানিয়ে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হলেন। ধৃত চিকিৎসকের নাম র্যান্ডাল সেকুয়েরা। বয়স ৩৯ বছর। তাঁর সঙ্গে লক্ষ্মণ নায়ক নামে আরও এক আন্দোলনকারীকেও গ্রেফতার করেছে পুলিশ। খুনের চেষ্টা, দাঙ্গা ছড়ানো এবং বেআইনি অস্ত্র রাখার মতো গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে তাঁদের বিরুদ্ধে। গত ১৬ অক্টোবর গ্রেফতারের পর বর্তমানে রায়গড়া সাব-জেলে বিচারবিভাগীয় হেফাজতে রয়েছেন সেকুয়েরা।
চিকিৎসকের গ্রেফতারির ঘটনাকে কেন্দ্র করে ওড়িশার কালাহান্ডি ও রায়গড়া এলাকায় নতুন করে চর্চা শুরু হয়েছে। এক দিকে আদিবাসী অধ্যুষিত প্রত্যন্ত এলাকায় স্বাস্থ্য পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার জন্য দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেছেন সেকুয়েরা, অন্য দিকে বক্সাইট খনির বিরোধিতায় স্থানীয় বাসিন্দাদের আন্দোলনে তাঁর অংশগ্রহণকে কেন্দ্র করেই এই গ্রেফতারি। তবে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে আদালতে বিচারপ্রক্রিয়া এখনও বাকি। ফলে অভিযোগগুলিকে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
**শহরের স্বচ্ছন্দ জীবন ছেড়ে আদিবাসীদের পাশে**
আদতে কর্নাটকের মেঙ্গালুরুর বাসিন্দা র্যান্ডাল সেকুয়েরা। তবে তাঁর বেড়ে ওঠা এবং স্কুলজীবন কেটেছে মুম্বইয়ে। পরবর্তী সময়ে বেঙ্গালুরুর সেন্ট জনস মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাশ করেন তিনি। এর পর রাজস্থানের সওয়াই মান সিংহ মেডিক্যাল কলেজ থেকে ইন্টারনাল মেডিসিনে এমডি ডিগ্রি অর্জন করেন। চিকিৎসাশাস্ত্রে উচ্চশিক্ষা শেষ করার পর চাইলে শহরের কোনও প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালে কাজ করে স্বচ্ছন্দ জীবন কাটাতে পারতেন তিনি। কিন্তু সেই পথে না হেঁটে প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের চিকিৎসার দায়িত্ব নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন সেকুয়েরা।
২০১৭ সালে ওড়িশার কালাহান্ডি এলাকায় গিয়ে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সঙ্গে কাজ শুরু করেন তিনি। মূলত আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় স্বাস্থ্য পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার কাজেই নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন এই চিকিৎসক। পরবর্তী সময়ে স্বাধীন ভাবে বিভিন্ন প্রত্যন্ত গ্রামে ঘুরে ঘুরে রোগীদের চিকিৎসা করতে শুরু করেন তিনি। ম্যালেরিয়া ও যক্ষ্মার মতো রোগে আক্রান্ত মানুষের চিকিৎসার পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত নানা সমস্যার সমাধানে সাহায্য করতেন সেকুয়েরা।
**শুধু ওষুধ নয়, রোগের সামাজিক কারণও বুঝতেন**
সেকুয়েরার সহকর্মী চিকিৎসক দেওয়াল সাওয়ারকরের বক্তব্য, চিকিৎসার ক্ষেত্রে সেকুয়েরার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল কিছুটা আলাদা। তাঁর কাজ শুধু রোগ নির্ণয় করা কিংবা ওষুধ দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। কোনও এলাকায় অপুষ্টি বা সংক্রামক রোগের প্রকোপ কেন বেশি, তার পিছনে সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কী ভূমিকা রয়েছে, সেগুলিও বোঝার চেষ্টা করতেন তিনি।
প্রত্যন্ত এলাকার বহু মানুষের কাছে নিয়মিত চিকিৎসা পরিষেবা পাওয়া সহজ নয়। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দূরত্ব, আর্থিক অনটন এবং সচেতনতার অভাবের মতো নানা কারণে অনেকেই সময়মতো চিকিৎসকের কাছে পৌঁছতে পারেন না। এই পরিস্থিতিতে গ্রামে গ্রামে গিয়ে রোগীদের চিকিৎসা করা এবং তাঁদের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন করে তোলার কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন সেকুয়েরা।
অপুষ্টিতে ভোগা শিশু এবং গর্ভবতী মহিলাদের জন্য স্বাস্থ্যশিবির আয়োজনের ক্ষেত্রেও উদ্যোগী ছিলেন তিনি। পাশাপাশি আদিবাসী পরিবারের পড়ুয়াদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ করে দেওয়ার চেষ্টা করতেন। মেডিক্যাল প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রস্তুতিতেও স্থানীয় পড়ুয়াদের সাহায্য করতেন এই চিকিৎসক। অর্থাৎ, স্বাস্থ্য পরিষেবার পাশাপাশি শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও আদিবাসী সমাজের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন তিনি।
**বক্সাইট খনির বিরুদ্ধে আন্দোলন ঘিরে বিতর্ক**
ওড়িশার কালাহান্ডি ও রায়গড়া এলাকায় বক্সাইট খনিকে কেন্দ্র করে আদিবাসীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। খনির কাজকে ঘিরে জমি, জীবিকা এবং স্থানীয় পরিবেশের উপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে খনিবিরোধী আন্দোলনে স্থানীয় আদিবাসীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন সেকুয়েরা বলে জানা গিয়েছে।
তবে আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ঠিক কী ঘটেছিল এবং তার সঙ্গে ধৃতদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সম্পর্ক কী, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সামনে আসা প্রয়োজন। পুলিশের তরফে সেকুয়েরা ও লক্ষ্মণ নায়কের বিরুদ্ধে খুনের চেষ্টা, দাঙ্গা ছড়ানো এবং বেআইনি অস্ত্র রাখার মতো অভিযোগ আনা হয়েছে। গত ১৬ অক্টোবর তাঁদের গ্রেফতার করা হয়। বর্তমানে তাঁরা বিচারবিভাগীয় হেফাজতে রয়েছেন।
চিকিৎসকের গ্রেফতারির ঘটনায় তাঁর দীর্ঘদিনের সামাজিক কাজ এবং আন্দোলনে অংশগ্রহণের বিষয়টি সামনে এসেছে। তবে আদিবাসীদের স্বাস্থ্য পরিষেবায় তাঁর ভূমিকা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলির বিচারও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই হওয়া প্রয়োজন।
**আদিবাসী এলাকায় স্বাস্থ্য পরিষেবা নিয়ে প্রশ্ন**
সেকুয়েরার কাজের পরিধি থেকে আরও এক বার স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, প্রত্যন্ত আদিবাসী এলাকায় স্বাস্থ্য পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া কতটা কঠিন। অনেক জায়গায় চিকিৎসক, ওষুধ এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর অভাব রয়েছে বলে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ ওঠে। সেই পরিস্থিতিতে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা এবং স্বাধীন ভাবে কাজ করা চিকিৎসকেরা বহু মানুষের কাছে প্রাথমিক চিকিৎসা পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
সেকুয়েরার মতো চিকিৎসকেরা শুধু রোগের চিকিৎসাই করেন না, স্থানীয় মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তুলে স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর কাজও করেন। শিশুদের অপুষ্টি, গর্ভবতী মহিলাদের স্বাস্থ্য এবং ম্যালেরিয়া-যক্ষ্মার মতো রোগের মোকাবিলায় তাঁদের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
তাই তাঁর গ্রেফতারির ঘটনা ঘিরে চিকিৎসা পরিষেবা, আদিবাসীদের অধিকার এবং খনিবিরোধী আন্দোলনের মতো একাধিক বিষয় আলোচনায় উঠে এসেছে। তবে এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র বুঝতে হলে পুলিশের বক্তব্য, আন্দোলনকারীদের দাবি এবং আদালতের পরবর্তী পদক্ষেপ—সব দিকই সামনে আসা জরুরি।
শহরের পরিচিত জীবন ছেড়ে প্রত্যন্ত গ্রামে গিয়ে আদিবাসীদের চিকিৎসায় নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন র্যান্ডাল সেকুয়েরা। সেই চিকিৎসকই এখন গুরুতর অভিযোগে বিচারবিভাগীয় হেফাজতে। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের নিষ্পত্তি কী ভাবে হয়, সেদিকেই এখন নজর থাকবে।