বলাগড়ে মিনি বন্দরের সংযোগকারী রাস্তা ও ব্রিজের ভূমিপুজো, কর্মসংস্থানের আশায় বুক বাঁধছেন স্থানীয়রা
কলকাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বন্দরের উপর থেকে চাপ কমাতে বড় পদক্ষেপ কেন্দ্রীয় সরকারের। হুগলির বলাগড়ে গড়ে উঠতে চলেছে প্রস্তাবিত মিনি বন্দর। এই প্রকল্পকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই আশায় বুক বেঁধেছেন এলাকার বাসিন্দারা। তাঁদের আশা, বন্দর চালু হলে বদলে যেতে পারে বলাগড়ের অর্থনৈতিক ছবি। তৈরি হবে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ, বাড়বে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং গতি পাবে এলাকার সামগ্রিক উন্নয়ন। সেই লক্ষ্যেই সোমবার বলাগড়ের মিনি বন্দরের সংযোগকারী রাস্তা ও ব্রিজ নির্মাণের ভূমিপুজো অনুষ্ঠিত হল। প্রকল্পের পরবর্তী ধাপের কাজ শুরু হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে।
ভূমিপুজোর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বলাগড়ের বিধায়ক তথা স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী সুমনা সরকার, লকেট চট্টোপাধ্যায়, হুগলির জেলাশাসক খুরশিদ আলি কাদারি-সহ পূর্ত দফতর ও পোর্ট ট্রাস্টের আধিকারিকেরা। মিনি বন্দরকে কেন্দ্র করে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং পরিকাঠামো নির্মাণের কাজ কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা এই উদ্যোগের মাধ্যমে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সংশ্লিষ্ট মহলের আশা, প্রস্তাবিত বন্দর চালু হলে শুধু পণ্য পরিবহণের ক্ষেত্রেই সুবিধা হবে না, এলাকার মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নের পথও প্রশস্ত হবে।
কেন বলাগড়ে মিনি বন্দর?
কলকাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বন্দরের উপর ক্রমবর্ধমান চাপ কমানোই এই প্রকল্পের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। পণ্য পরিবহণের পরিকাঠামো আরও উন্নত করা এবং নদীপথে বাণিজ্যের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর লক্ষ্যেই বলাগড়ে মিনি বন্দর তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। হুগলি নদীর তীরবর্তী এই এলাকায় বন্দর গড়ে উঠলে পণ্য ওঠানো-নামানো এবং পরিবহণের ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রকল্পের জন্য বলাগড়ের শ্রীপুর চরের জমি চিহ্নিত করা হয়েছে। জানা গিয়েছে, ১৯৯৬ সালে সিইএসসি বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরির উদ্দেশ্যে ওই এলাকায় জমি নিয়েছিল। সেই সময় পোর্ট ট্রাস্টের তরফেও কিছু জমি নেওয়া হয়। সেই জমিতেই প্রস্তাবিত মিনি বন্দর গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা বা নির্দিষ্ট প্রকল্পের জন্য চিহ্নিত জমিকে ঘিরে এবার নতুন পরিকাঠামো তৈরির কাজ এগোচ্ছে।
৫৩৯ কোটি টাকার প্রকল্প, তৈরি হবে রাস্তা ও ব্রিজ
প্রস্তাবিত বলাগড় মিনি বন্দর প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে ৫৩৯ কোটি টাকা। প্রকল্পের আওতায় তৈরি হবে প্রায় চার কিলোমিটার দীর্ঘ সংযোগকারী রাস্তা, একটি ব্রিজ, পোর্ট টার্মিনাল এবং দু’টি জেটি। বন্দরের সঙ্গে মূল যোগাযোগ ব্যবস্থার সংযোগ স্থাপনের ক্ষেত্রে এই রাস্তা ও ব্রিজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। পণ্য পরিবহণের জন্য উন্নত পরিকাঠামো তৈরি করা গেলে ভবিষ্যতে বন্দরের কার্যক্রম আরও সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সোমবারের ভূমিপুজো সেই পরিকাঠামো নির্মাণের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের দাবি, আগামী দু’বছরের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করা গেলে দ্রুত বন্দর চালুর প্রস্তুতি এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। তবে প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হওয়াই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
প্রধানমন্ত্রীর শিলান্যাসের পর এগোচ্ছে কাজ
গত জানুয়ারি মাসে সিঙ্গুরে এসে বলাগড়ের মিনি বন্দরের শিলান্যাস করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সেই ঘোষণার পর থেকেই প্রকল্পটি নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। এবার সংযোগকারী রাস্তা ও ব্রিজের ভূমিপুজোর মাধ্যমে বন্দরের পরিকাঠামো নির্মাণের কাজ আরও এক ধাপ এগোল।
একটি বন্দর গড়ে তোলার ক্ষেত্রে শুধু টার্মিনাল বা জেটি তৈরি করলেই হয় না। পণ্যবাহী যান চলাচল, নদীপথের সঙ্গে যোগাযোগ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় পরিষেবার জন্য উপযুক্ত পরিকাঠামোও প্রয়োজন। সেই দিক থেকে চার কিলোমিটার রাস্তা ও ব্রিজ নির্মাণের উদ্যোগ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এই যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠলে বন্দরকে কেন্দ্র করে পণ্য পরিবহণের কাজ আরও সুসংগঠিত করা সম্ভব হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান ১,৫০০ জনের, আশায় স্থানীয়রা
বলাগড়ের মিনি বন্দরকে ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা কর্মসংস্থান। সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বন্দর চালু হলে প্রত্যক্ষভাবে প্রায় ১,৫০০ জনের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। স্থানীয় যুবক-যুবতীদের কাছে এই সম্ভাবনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এলাকার বাইরে গিয়ে কাজ খোঁজার পরিবর্তে নিজেদের আশপাশে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হলে বহু পরিবারের আর্থিক পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।
তবে সম্ভাবনা শুধু বন্দরের সরাসরি চাকরিতেই সীমাবদ্ধ নয়। একটি বন্দরকে কেন্দ্র করে পরিবহণ, পণ্য ওঠানো-নামানো, গুদামজাতকরণ, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন পরিষেবার মতো একাধিক ক্ষেত্রে ব্যবসার সুযোগ তৈরি হতে পারে। সেই সঙ্গে বন্দরের প্রয়োজন মেটাতে ছোট-বড় অনুসারী শিল্প গড়ে ওঠার সম্ভাবনাও রয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের আশা, এই ধরনের শিল্প ও পরিষেবা গড়ে উঠলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বহু মানুষের জীবিকা নির্বাহের সুযোগ তৈরি হবে।
অনুসারী শিল্পে কাজের সুযোগ ১৫ থেকে ২০ হাজার মানুষের?
প্রস্তাবিত মিনি বন্দরকে ঘিরে অনুসারী শিল্পের সম্ভাবনাও যথেষ্ট। প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের অনুমান, বন্দর চালু হওয়ার পর তার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন শিল্প ও পরিষেবা ক্ষেত্রে প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার মানুষের কাজের সুযোগ তৈরি হতে পারে। যদিও এই কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে বন্দরের কার্যক্রম, বিনিয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট শিল্পের বিকাশের উপর।
বন্দরকে কেন্দ্র করে পরিবহণ সংস্থা, গুদাম, প্যাকেজিং, পণ্য সরবরাহ এবং অন্যান্য সহায়ক পরিষেবার চাহিদা বাড়তে পারে। ফলে ছোট ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে স্থানীয় পরিষেবা প্রদানকারীদের জন্যও নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে যেতে পারে। প্রকল্পের সঙ্গে স্থানীয় মানুষকে যুক্ত করা গেলে এলাকার অর্থনীতিতে তার ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন অনেকে।
বদলে যেতে পারে বলাগড়ের অর্থনৈতিক ছবি
হুগলির বলাগড়ের মতো এলাকায় বড় পরিকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে তার প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট নির্মাণস্থলে সীমাবদ্ধ থাকে না। রাস্তা ও ব্রিজ তৈরি হলে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হতে পারে। বন্দর চালু হলে পণ্য পরিবহণের নতুন কেন্দ্র গড়ে উঠবে। তার সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটলে স্থানীয় বাজারেও তার প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশেষ করে কর্মসংস্থানের প্রত্যাশায় রয়েছেন এলাকার বহু বাসিন্দা। তাঁদের আশা, প্রকল্পের কাজ দ্রুত এগোবে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বন্দর চালু হবে। তবে প্রত্যাশিত সুফল পেতে নির্মাণকাজের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় যোগাযোগ ব্যবস্থা, কর্মী নিয়োগ এবং অনুসারী শিল্পের বিকাশের দিকেও নজর দিতে হবে।
সব মিলিয়ে, বলাগড়ে মিনি বন্দর তৈরির উদ্যোগকে ঘিরে নতুন করে আশার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ৫৩৯ কোটি টাকার এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে কলকাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বন্দরের উপর চাপ কমানোর পাশাপাশি হুগলির শিল্প ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনাও বাড়তে পারে। প্রত্যক্ষভাবে ১,৫০০ জনের কর্মসংস্থান এবং অনুসারী শিল্পের মাধ্যমে আরও বহু মানুষের কাজের সুযোগ তৈরির যে প্রত্যাশা রয়েছে, তা বাস্তবে রূপ নেয় কি না, এখন সেদিকেই নজর স্থানীয় বাসিন্দাদের।