### ধূমকেতুর হাত ধরেই কি পৃথিবীতে এসেছিল প্রাণের বীজ? কেমব্রিজের গবেষণায় বড় ধাক্কা শতাব্দীপ্রাচীন তত্ত্বে, নতুন করে উঠছে প্রশ্ন
পৃথিবীতে প্রাণের সৃষ্টি কীভাবে হয়েছিল? কোথা থেকে এসেছিল জীবনের প্রথম উপাদান? কোটি কোটি বছর আগে পৃথিবীর বুকে প্রাণের যে সূচনা হয়েছিল, তার নেপথ্যে কি ছিল এই গ্রহের নিজস্ব পরিবেশ, নাকি মহাকাশ থেকে ছুটে আসা কোনও ধূমকেতু? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে দীর্ঘদিন ধরেই গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। একশো বছরেরও বেশি সময় ধরে বিজ্ঞানীদের একাংশের ধারণা, পৃথিবীতে প্রাণ সৃষ্টির প্রাথমিক উপাদানগুলি এসেছিল মহাকাশ থেকে। বিশেষ করে ধূমকেতুর হাত ধরেই পৃথিবীতে পৌঁছেছিল জীবনের প্রয়োজনীয় জৈব যৌগ। কিন্তু কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক গবেষণা সেই দীর্ঘদিনের অনুমানকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
বিজ্ঞানীদের একাংশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই একটি তত্ত্ব প্রচলিত রয়েছে, যার মূল বক্তব্য হল, পৃথিবীতে প্রাণের সূচনা ঘটানোর মতো প্রয়োজনীয় রাসায়নিক উপাদান মহাকাশ থেকে এসেছিল। সেই তত্ত্ব অনুযায়ী, প্রাচীন পৃথিবীতে আছড়ে পড়া ধূমকেতু ও অন্যান্য মহাজাগতিক বস্তুর সঙ্গে এসেছিল প্রাণ সৃষ্টির প্রাথমিক উপাদান। পৃথিবীর আদিম পরিবেশে সেই উপাদানগুলির রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমেই ধীরে ধীরে প্রাণের অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। তবে এই ধারণার পক্ষে যেমন নানা গবেষণায় কিছু যুক্তি উঠে এসেছে, তেমনই এখনও পর্যন্ত প্রাণের প্রকৃত উৎপত্তি সম্পর্কে নিশ্চিত কোনও ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
কীভাবে এই তত্ত্বকে পরীক্ষা করলেন কেমব্রিজের বিজ্ঞানীরা?
ধূমকেতুর মাধ্যমে পৃথিবীতে প্রাণের প্রাথমিক উপাদান পৌঁছনো আদৌ কতটা সম্ভব, তা খতিয়ে দেখতে কম্পিউটার সিমুলেশনের সাহায্য নেন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা। তাঁদের পরীক্ষার মূল লক্ষ্য ছিল, প্রাণ সৃষ্টির ঠিক আগের পৃথিবীর পরিবেশে বিপুল সংখ্যক ধূমকেতু এসে পড়লে কী ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, তা বোঝা।
এই পরীক্ষায় প্রাচীন পৃথিবীর পরিবেশ, সেই সময়ের পরিস্থিতি এবং ধূমকেতুগুলির পৃথিবীর দিকে ছুটে আসার গতি—সবকিছুরই একটি কৃত্রিম মডেল তৈরি করা হয়। অর্থাৎ, কোটি কোটি বছর আগের পৃথিবীর পরিস্থিতি কম্পিউটারের মাধ্যমে পুনর্নির্মাণ করে বিজ্ঞানীরা বোঝার চেষ্টা করেন, ধূমকেতুর সঙ্গে আসা জৈব উপাদানগুলি পৃথিবীর বুকে পৌঁছে আদৌ টিকে থাকতে পারত কি না।
গবেষণার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এই সিমুলেশনে প্রায় এক লক্ষ ধূমকেতুর পৃথিবীতে আছড়ে পড়ার পরিস্থিতি বিবেচনা করা হয়েছিল। কিন্তু পরীক্ষার ফল বিজ্ঞানীদের প্রত্যাশার সঙ্গে মেলেনি। দেখা গিয়েছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ধূমকেতুর সঙ্গে বহন করে আনা প্রাণ সৃষ্টির প্রাথমিক উপাদানগুলি পৃথিবীর সংস্পর্শে আসার আগেই অথবা আছড়ে পড়ার সময় নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ধূমকেতুর আঘাতেই কি নষ্ট হয়ে যেত প্রাণের উপাদান?
গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, ধূমকেতুর পৃথিবীতে আছড়ে পড়ার সময় তৈরি হওয়া চরম পরিস্থিতি প্রাণের প্রাথমিক উপাদানগুলির টিকে থাকার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। মহাকাশের গভীর থেকে পৃথিবীর দিকে ছুটে আসা ধূমকেতুগুলি বিপুল গতিতে বায়ুমণ্ডল ভেদ করে গ্রহের পৃষ্ঠে পৌঁছত। সেই সংঘর্ষের সময় তৈরি হওয়া তীব্র পরিস্থিতিতে তাদের বহন করে আনা জৈব উপাদানগুলি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল।
ফলে ধূমকেতুতে প্রাণ সৃষ্টির প্রয়োজনীয় উপাদান থাকলেও সেগুলি পৃথিবীর মাটিতে অক্ষত অবস্থায় পৌঁছেছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। অর্থাৎ, মহাকাশ থেকে পৃথিবীতে প্রাণের উপাদান এসে পৌঁছনোর ধারণাটি একেবারে উড়িয়ে দেওয়া না হলেও, ধূমকেতুর মাধ্যমে সেই উপাদান সরবরাহের সম্ভাব্যতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য হচ্ছেন গবেষকেরা।
তাহলে পৃথিবীতে প্রাণের জন্ম কোথায়?
কেমব্রিজের এই গবেষণা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে। যদি ধূমকেতুর মাধ্যমে প্রাণের প্রাথমিক উপাদান পৃথিবীতে পৌঁছনো কঠিন হয়ে থাকে, তা হলে জীবনের সূচনা কি পৃথিবীর বুকেই হয়েছিল? পৃথিবীর আদিম সমুদ্র, আগ্নেয়গিরির আশপাশের পরিবেশ কিংবা সমুদ্রের গভীরে থাকা হাইড্রোথার্মাল ভেন্টের মতো অঞ্চলগুলিতে কি প্রাণ সৃষ্টির অনুকূল রাসায়নিক পরিবেশ তৈরি হয়েছিল?
বিজ্ঞানীদের কাছে এই প্রশ্নগুলির উত্তর এখনও সম্পূর্ণ স্পষ্ট নয়। পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তি নিয়ে একাধিক বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা রয়েছে। কোনও কোনও তত্ত্বে আদিম পৃথিবীর জল ও রাসায়নিক বিক্রিয়াকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আবার অন্য একটি ধারণায় মহাকাশ থেকে আসা জৈব উপাদানের ভূমিকার কথা বলা হয়েছে। তবে কোনও একটি তত্ত্বই এখনও চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি।
শতাব্দীপ্রাচীন অনুমান কি তবে ভুল প্রমাণিত?
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের এই গবেষণাকে ধূমকেতু-তত্ত্বের চূড়ান্ত অবসান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ কম্পিউটার সিমুলেশনের ফলাফল নির্দিষ্ট কিছু অনুমান ও মডেলের উপর নির্ভরশীল। বাস্তবে কোটি কোটি বছর আগের পৃথিবীর পরিবেশ ঠিক কেমন ছিল, সেই সময় ধূমকেতুগুলির গঠন ও সংঘর্ষের পরিস্থিতি কী রকম ছিল, তা নিয়ে এখনও গবেষণা চলছে।
তবে এই পরীক্ষার ফলাফল নিঃসন্দেহে প্রাণের উৎপত্তি নিয়ে প্রচলিত ধারণাকে নতুন করে পর্যালোচনার সুযোগ করে দিয়েছে। ধূমকেতু কি সত্যিই পৃথিবীতে প্রাণের বীজ বয়ে এনেছিল, নাকি জীবনের প্রথম রাসায়নিক উপাদান তৈরি হয়েছিল পৃথিবীর বুকেই? সেই রহস্যের সমাধান এখনও অধরা। আর সেই উত্তর খুঁজতেই মহাকাশবিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞানের গবেষণায় নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তির ইতিহাস।