কাঁটাতারের বেড়া দিতে ১.৪৪ বর্গমাইল ভূমি বিনিময়! সীমান্ত সুরক্ষায় পুবের পড়শিকে ‘জমি দান’ করবে ভারত?


সীমান্তের অমীমাংসিত অংশের দ্রুত নিষ্পত্তি এবং কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের পথ মসৃণ করতে মায়ানমারের সঙ্গে জমি বিনিময়ের একটি প্রস্তাব ঘিরে নতুন করে চর্চা শুরু হয়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, মণিপুরের চন্দেল জেলার ভারত-মায়ানমার সীমান্তের একটি অংশে প্রায় ১.৪ বর্গমাইল জমি বিনিময়ের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে বিষয়টি এখনও প্রস্তাবের পর্যায়ে রয়েছে এবং কেন্দ্র বা মণিপুর সরকার কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করেনি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রস্তাবিত এলাকাটি সীমান্তের ৬৫ থেকে ৬৮ নম্বর বর্ডার পিলারের মধ্যবর্তী অংশে। মণিপুরের চন্দেল জেলার এই এলাকা মায়ানমারের সাগাইং অঞ্চলের কাবাও উপত্যকার সংলগ্ন। দীর্ঘদিন ধরে এই অংশে আন্তর্জাতিক সীমান্তের সঠিক সীমানা নির্ধারণ নিয়ে জটিলতা রয়েছে।
কেন জমি বিনিময়ের ভাবনা?
ভারত-মায়ানমার সীমান্তের দৈর্ঘ্য প্রায় ১,৬৪৩ কিলোমিটার। এর একটি অংশ এখনও পুরোপুরি চিহ্নিত ও নির্ধারিত হয়নি। সীমান্তের অমীমাংসিত অংশগুলির মধ্যে মণিপুরের মোলচাম এলাকা অন্যতম। রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, সীমান্তের এই অংশের পুনর্নির্ধারণ হলে সেখানে নতুন ও সহায়ক সীমান্ত স্তম্ভ বসানো এবং পরবর্তী সময়ে বেড়া নির্মাণের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সহজ হবে।
ভারতের বৃহত্তর সীমান্ত-নিরাপত্তা পরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য হল আন্তর্জাতিক সীমান্তে বেড়া ও নজরদারি ব্যবস্থা শক্তিশালী করা। এর মাধ্যমে অবৈধ অনুপ্রবেশ, আন্তঃসীমান্ত অপরাধ এবং বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলির চলাচল নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা চলছে।
‘জমি দান’, নাকি সীমান্ত পুনর্বিন্যাস?
এই জায়গাতেই তৈরি হয়েছে বিতর্ক। প্রস্তাবটি প্রকাশ্যে আসার পর মণিপুরের নাগরিক সংগঠন Coordinating Committee on Manipur Integrity (COCOMI) কেন্দ্রের কাছে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দাবি করেছে। সংগঠনটির বক্তব্য, মণিপুরের কোনও জমি অন্য দেশের হাতে তুলে দেওয়া হলে তা রাজ্যের ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রশ্নের সঙ্গে জড়িয়ে পড়বে।
COCOMI আরও প্রশ্ন তুলেছে, প্রস্তাবিত বিনিময়ের ক্ষেত্রে মায়ানমার ভারতকে সমপরিমাণ বা অন্য কোনও জমি দেবে কি না, সেই বিষয়ে প্রকাশিত নথিতে স্পষ্ট তথ্য নেই। ফলে ‘ল্যান্ড এক্সচেঞ্জ’ কথাটি নিয়েও তৈরি হয়েছে সংশয়।
একাধিক জায়গায় সীমান্ত নিয়ে জট
মণিপুর-মায়ানমার সীমান্তে শুধু মোলচাম নয়, আরও কয়েকটি অংশে দীর্ঘদিন ধরে সীমারেখা নিয়ে সমস্যা রয়েছে। এর মধ্যে ৬৪ থেকে ৬৮ নম্বর বর্ডার পিলারের মধ্যবর্তী মোলচাম, ৭৫ থেকে ৭৯ নম্বর পিলারের কাছে মোরে এবং ৮৮ থেকে ৯৫ নম্বর পিলারের কাছে চোরো খুনৌ এলাকার নাম উঠে এসেছে।
রিপোর্টে আরও দাবি করা হয়েছে, ২০২৬ সালের মে মাসের একটি সরকারি নথিতে সীমান্ত নির্ধারণের কাজ দ্রুত শেষ করার লক্ষ্য উল্লেখ ছিল। মায়ানমারের সামরিক নেতা মিন অং হ্লাইংয়ের ভারত সফরের সময়ও সীমান্ত-সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছিল বলে সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও নয়
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—ভারত সরকার মায়ানমারকে ১.৪ বর্গমাইল ভারতীয় ভূখণ্ড দিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এমন কোনও সরকারি ঘোষণা এখনও নেই। প্রকাশিত খবরগুলি একটি সরকারি নথির ভিত্তিতে প্রস্তাবটি খতিয়ে দেখার কথা বলছে। কেন্দ্র ও মণিপুর সরকারের তরফে এই প্রস্তাবের চূড়ান্ত বাস্তবায়ন সম্পর্কে কোনও নিশ্চিত ঘোষণা করা হয়নি।
অর্থাৎ, আপাতত বিষয়টি ‘জমি দান’-এর চেয়ে বেশি করে অমীমাংসিত সীমান্ত নির্ধারণ, সীমান্ত সুরক্ষা এবং সম্ভাব্য ভূখণ্ড বিনিময় নিয়ে একটি প্রস্তাব হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে মণিপুরে বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হওয়ায় আগামী দিনে কেন্দ্রের অবস্থান স্পষ্ট করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

Post a Comment

Previous Post Next Post