রাশিয়া থেকে তেল কেনা নিয়ে ভারতের উপর আরও চাপ বাড়াল আমেরিকা। রাশিয়ার জ্বালানি ব্যবসার উপর চাপ তৈরি করতে মার্কিন সেনেটে পাস হয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ নিষেধাজ্ঞা বিল। এই আইনে পরবর্তী সময়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের বড় ক্রেতা দেশগুলির পণ্যের উপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্ক বসানোর ক্ষমতা দেওয়া হতে পারে। ভারতের পাশাপাশি চিন-সহ আরও কয়েকটি দেশ রয়েছে সম্ভাব্য নিশানায়।
৮৬-১১ ভোটে সেনেটে পাস
‘Lindsey O. Graham Sanctioning Russia and Iran Act of 2026’ নামে বিলটি শুক্রবার মার্কিন সেনেটে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পাস হয়েছে। ভোটাভুটিতে বিলের পক্ষে পড়ে ৮৬টি ভোট, বিপক্ষে ১১টি। রাশিয়ার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর পাশাপাশি ইরানের বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞা আরও শক্তিশালী করার প্রস্তাব রয়েছে এতে।
তবে সেনেটে পাস হওয়া মানেই এখনই ভারতের উপর ১০০ শতাংশ শুল্ক বসে যাচ্ছে না। বিলটিকে এখনও মার্কিন হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে অনুমোদন পেতে হবে এবং তার পর প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষর প্রয়োজন। অর্থাৎ, আপাতত এটি সম্ভাব্য শুল্কের আইনি ক্ষমতা তৈরির একটি ধাপ।
কেন ভারতের দিকে নজর ওয়াশিংটনের?
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ভারত রাশিয়ার কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে অপরিশোধিত তেল কিনে আসছে। তুলনামূলক সস্তা রুশ তেল ভারতের জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আমেরিকার যুক্তি, রাশিয়ার জ্বালানি বিক্রির আয় মস্কোর যুদ্ধ চালানোর আর্থিক সক্ষমতা বজায় রাখতে সাহায্য করছে। তাই রাশিয়ার বড় ক্রেতাদের উপর চাপ সৃষ্টি করাই এই আইনের অন্যতম লক্ষ্য।
এই কারণেই ভারতের নাম উঠে আসছে বারবার। নতুন বিলের আওতায় রাশিয়ার তেল বা প্রাকৃতিক গ্যাসের সবচেয়ে বড় ক্রেতা দেশগুলির উপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের সুযোগ রাখা হয়েছে।
শুধু ভারত নয়, নজরে চিনও
ভারতের পাশাপাশি চিন এই ব্যবস্থার অন্যতম বড় সম্ভাব্য লক্ষ্য। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী রাশিয়ার অপরিশোধিত তেলের পাঁচ বৃহত্তম ক্রেতার তালিকায় রয়েছে চিন, ভারত, স্লোভাকিয়া, হাঙ্গেরি এবং আজারবাইজান। ফলে নতুন মার্কিন আইন কার্যকর হলে এই দেশগুলিও শুল্কের আওতায় পড়তে পারে।
রাশিয়ার প্রাকৃতিক গ্যাসের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি কিছুটা আলাদা। গ্যাসের বড় ক্রেতাদের মধ্যে চিনের পাশাপাশি জাপান, ফ্রান্স, হাঙ্গেরি ও বেলজিয়াম রয়েছে বলে মার্কিন কংগ্রেসের তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
৫০০ শতাংশ থেকে ১০০ শতাংশ—কেন বদলাল প্রস্তাব?
এখানেও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। প্রথম দিকের প্রস্তাবে রাশিয়ার জ্বালানি কিনতে থাকা দেশগুলির উপর সর্বোচ্চ ৫০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্কের কথা বলা হয়েছিল। পরে সংশোধিত বিলে সেই প্রস্তাব বদলে বিশ্বের সবচেয়ে বড় পাঁচ ক্রেতা দেশের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্কের ব্যবস্থা করা হয়।
অর্থাৎ, ভারতের জন্য ১০০ শতাংশ শুল্কের আশঙ্কা নতুন করে তৈরি হলেও সেটি এখনও কার্যকর হয়নি এবং স্বয়ংক্রিয়ও নয়। আইন কার্যকর হলে প্রেসিডেন্টের হাতে এই শুল্ক আরোপের ক্ষমতা থাকবে।
ভারতের উপর কী প্রভাব পড়তে পারে?
যদি শেষ পর্যন্ত এই ব্যবস্থা কার্যকর হয়, তা হলে ভারত-মার্কিন বাণিজ্যে বড় চাপ তৈরি হতে পারে। আমেরিকার বাজারে ভারতীয় পণ্যের উপর অতিরিক্ত শুল্ক চাপানো হলে রফতানিকারীদের জন্য পরিস্থিতি কঠিন হতে পারে। পাশাপাশি ভারতকে রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনার নীতি নিয়েও নতুন করে হিসাব করতে হতে পারে।
তবে ভারতের দিক থেকে বিষয়টি শুধু বাণিজ্যের নয়, জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গেও যুক্ত। তাই নয়াদিল্লির সামনে একদিকে রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘদিনের জ্বালানি সম্পর্ক বজায় রাখা, অন্যদিকে আমেরিকার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সম্পর্ক—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখার চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে।
এখন পরবর্তী নজর হাউসে
সেনেটে বিল পাস হলেও এখনই ভারতের উপর ১০০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হচ্ছে না। পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ধাপ মার্কিন হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস। সেখানে বিলটির ভবিষ্যৎ কী হয় এবং শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কী সিদ্ধান্ত নেন, তার উপরই নির্ভর করবে ভারতের বিরুদ্ধে এই শুল্ক বাস্তবে প্রয়োগ করা হবে কি না।
তবে সেনেটের বিপুল ভোটে বিল পাস হওয়া স্পষ্ট করে দিয়েছে—রাশিয়ার তেল কেনা দেশগুলির উপর চাপ বাড়াতে ওয়াশিংটন এবার আরও কঠোর পথে হাঁটতে চাইছে। আর সেই তালিকায় ভারত ও চিন যে আমেরিকার অন্যতম প্রধান নজরে, তা নিয়ে কোনও সংশয় নেই।