তিনি সমাজমাধ্যম ভালবাসেন। সংবাদমাধ্যমকে নয়। তিনি কাতার সরকারের দেওয়া ব্যক্তিগত বিমানে চেপে গোটা বিশ্ব ঘুরে বেড়ান।
তিনি বড় একটি সংগঠনের মাথায় বসে আছেন। তাঁকে সাহায্য করতে কমিটি এবং বিরাট নিয়মের বই রয়েছে। কিন্তু তিনি নিজেই সব আসল সিদ্ধান্তগুলি নেন এবং কী করছেন সে সম্পর্কে খুব কম লোককে জানান।
তিনি ঔজ্জ্বল্য এবং আতসবাজি ভালবাসেন। তিনি কুশনার পরিবারের সঙ্গে আরও বেশি ব্যবসা করতে চান। তা-ও বিশ্বাস করেন, তাঁকে কম অর্থ দেওয়া হয়।
তিনি কখনও কমে খুশি হন না। আরও বেশি চান। এখনও পর্যন্ত সেই দৃষ্টিভঙ্গি কাজেও লেগেছে।
অনেকে বলেন তিনি অসাধারণ। অনেকে তা বিশ্বাস করেন না।
তিনি কে?
উত্তর দেওয়ার জন্য পুরস্কার নেই। তিনি ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। আবার তিনি খবরে এসেছিলেন বিশ্বকাপ বিক্রি করার প্রস্তাব ঘোষণা করে। শেষ পর্যন্ত প্রবল চাপের মুখে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে পিছু হঠতে হল তাঁকে। বিশ্বকাপ বেচার পরিকল্পনা বাতিল করে দিলেন তিনি।
সম্প্রতি ইনফান্তিনো জানিয়েছিলেন, আলাদা একটি কোম্পানি তৈরি করে ফিফার অর্থ উপার্জনের বিষয়টি তাদের হাতে ছেড়ে দিতে চান। ফিফার ২০ শতাংশ বিক্রি করতে চেয়েছিলেন ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীদের কাছে। তার জন্য বিভিন্ন সংস্থাকে টাকার টোপও দিয়েছিলেন। তাঁর প্রস্তাবে রাজি হলে আগামী চার বছর মিলত প্রায় ৪০ কোটি টাকা। এখন ১০ কোটির বেশি পাওয়া যাবে না। প্রস্তাবে রাজি হওয়ার জন্য ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছিল।
যাঁরা তাঁকে সব সময় সমর্থন করেন তাঁদের কাছে প্রস্তাবে রাজি হওয়া সোজা ছিল। কারণ, যে কোনও দেশের ফুটবল সংস্থার সমাধানের জন্য অর্থই সব। আরুবা বা জ়িম্বাবোয়ে নিজেদের দেশের ফুটবলের উন্নতির জন্য অর্থ ছাড়া আর কী চায়!
কিন্তু তাঁর সমালোচকেরা এককাট্টা হয়ে বুঝিয়ে দিলেন, ‘যথেষ্ট হয়েছে, এ বার থামুন’।
কারা নতুন সংস্থায় অর্থ বিনিয়োগ করতেন এবং বিনিময়ে কী পেতেন?
গত মঙ্গলবার আচমকাই ইনফান্তিনোর প্রস্তাব সংবাদমাধ্যমে বেরিয়ে গিয়েছিল। তখনই কিছুটা বিপাকে পড়ে গিয়েছিল ফিফা। তখন দ্রুত তাদের প্রচারকারী সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। এ দিক-ও দিক ফোন করে একটা ইতিবাচক ধারণা গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছিল। দ্রুত প্রেস বিবৃতিতে প্রকাশ করে পরিকল্পনার ব্যাখ্যা দিয়েছিল ফিফা।
মঙ্গলবারই বিকেলে ইনফান্তিনো পাঁচ পাতার চিঠি লিখে সকল সদস্য দেশকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। ফিফা নিজেদের ওয়েবসাইটেও তা প্রকাশ করেছিল।
ফিফা একটি আলাদা সংস্থা তৈরি করতে চাইছিল যার নাম হতো ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজেস (এফএফই)। ফিফার বাণিজ্যিক বিষয় এবং প্রতিযোগিতা পরিচালনার দিকটি দেখার কথা ছিল তাদের। অর্থাৎ এফএফই-র হাতে সম্প্রচারস্বত্ব বিক্রির অধিকার, স্পনসরশিপ এবং পুরুষ এবং মহিলাদের বিশ্বকাপ ও ক্লাব বিশ্বকাপের টিকিট থেকে অর্জিত অর্থ চলে যেত।
ইনফান্তিনো যা পরিকল্পনা করেছিলেন, তাতে ফিফা শুধু ফুটবলের প্রশাসন, শৃঙ্খলা-সহ বাকিটা দেখতো, যার জন্য কেউ টাকা দিত না। পাশাপাশি এফএফই-তে ফিফার ৮০ শতাংশ শেয়ার থাকত। নিজেদের জন্যও ‘ব্যবস্থা’ করে ফেলেছিলেন ইনফান্তিনো। ঠিক হয়েছিল, তিনি বা তাঁর পরে যিনিই সভাপতি হোন, তিনি এফএফই-র বোর্ডের চেয়ারম্যান হওয়ার সুযোগ পেতেন।
যদি ২১১টি দেশের সদস্যদের বেশির ভাগ এই প্রস্তাবে রাজি হতো, তা হলে এফএফই-র বাকি ২০ শতাংশ বিক্রি করা হতো ‘ভৌগোলিক ভাবে বৈচিত্রপূর্ণ বিনিয়োগকারী সংস্থা’ থ্রাইভ এটারনালের কাছে। এ বছরের এপ্রিলে এই সংস্থা দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যার কর্ণধার জোশুয়া কুশনার। তিনি সম্পর্কে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাই জারেড কুশনারের ভাই।
হঠাৎ কেন থ্রাইভকেই এই কাজের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল, তার ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। ফিফার অনেকে বলেছেন, বেসরকারি সংস্থা জেপি মরগ্যান, ইটালির উপদেষ্টা সংস্থা ওপেনইকনমিক্স এবং লিবার্টি মিডিয়া সংস্থার প্রাক্তন মুখ্যকর্তা গ্রেগ মাফেই তাদের বেছে নিয়েছিলেন। এই তিন সংস্থাকেই বা কারা বেছেছিল, তারও কোনও ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়নি।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ফিফা এফএফই-র এক পঞ্চমাংশ থ্রাইভ গোষ্ঠীকে ৪০,১৪৯ কোটি টাকায় বিক্রি করে দিত। সেই টাকার অংশ দেওয়া হতো ফিফার সদস্য সংস্থাগুলিকে। ফিফা ফাস্ট ফরোয়ার্ড নামে একটি নতুন তহবিল তৈরি করা হবে বলে ঠিক হয়েছিল। সেখান থেকে অর্থের বাঁটোয়ারা হতো।
যদি গোটা প্রকল্প অনুমোদিত হতো, তা হলে সদস্য সংস্থাগুলি এককালীন ২০ কোটি টাকা পেত। পরের চার বছরে ঘরে ঢুকত আরও ২০ কোটি টাকা। এখন প্রস্তাব অনুমোদিত না হওয়ায় এখনকার মতোই ১০ কোটি টাকা করে দেওয়া হবে।
প্রস্তাব পাস হয়ে গেলে থ্রাইভ গোষ্ঠীর কাছে সহযোগী সংস্থা খুঁজে বার করা খুব একটা অসম্ভব ছিল না। ‘প্রাইভেট ইকুইটি ফার্ম’ এবং ‘সভারেন ওয়েলথ ফান্ড’গুলি এমন ব্যবসার জন্য বছরের পর বছর ধরে অপেক্ষা করে রয়েছে।
সম্প্রতি ফর্মুলা ওয়ান এবং রাগবি ইউনিয়নের সামনে এমন প্রস্তাব রেখেছে ‘সিভিসি ক্যাপিটাল পার্টনার্স’ সংস্থা। তারা ফিফার এই কার্যকলাপের দিকে নজর রেখেছিল। এ ছাড়া অ্যারেস, ব্ল্যাকস্টোন, অ্যাপোলো গ্লোবাল ক্যাপিটাল, কেকেআর এবং ডাইন্যাস্টির মতো সংস্থারও নজর ছিল। পাশাপাশি সৌদি আরবের পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ডও বিনিয়োগ করতে পারে বলে শোনা গিয়েছিল।
এই সংস্থাগুলির আগ্রহ দেখানোর কারণও ছিল। ফিফার বাণিজ্যিক কার্যকলাপের সহযোগী হওয়ার প্রস্তাব লোভনীয়। এমনিতে যে দিকে সব এগোচ্ছে, তাতে আগামী দিনে ফিফার লাভ আরও বাড়বে। সেই লাভের গুড় খেতে চাইবে না, গোটা বিশ্বে এমন সংস্থা প্রায় নেই।
জোশুয়া কুশনার কে এবং তিনি ট্রাম্পের কতটা কাছের?
আগেই বলা হয়েছে তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাই। তাঁর বাবা চার্লস কুশনার একজন সম্পত্তি নির্মাতা, আইনজীবী এবং বর্তমান ফ্রান্স ও মোনাকোয় আমেরিকার রাষ্ট্রদূত। ২০০৫-এ তাঁর বিরুদ্ধে বেআইনি প্রচারে মদত, কর ফাঁকি এবং সাক্ষ্যপ্রমাণ নষ্টের অভিযোগ উঠেছিল। দু’বছরের কারাবাসের সাজা হয় এবং আমেরিকার তিনটি প্রদেশে আইনজীবী হিসাবে কার্যকলাপে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। তবে প্রেসিডেন্ট হিসাবে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের সময়েই তিনি তাঁর ছত্রছায়ায় চলে আসেন। চার্লস নিজে একজন ডেমোক্র্যাট। ট্রাম্পের প্রচারেও প্রচুর অর্থ ঢালেন।