ঝাড়খণ্ডে সরকারি নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস ও অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে চলা ছাত্র-যুব আন্দোলন এবার আইনি জটিলতায় গড়াল। রাঁচিতে বিধানসভা অভিমুখে বিক্ষোভ মিছিল ঘিরে অশান্তির ঘটনায় পুলিশ প্রায় ৩০০ জন অজ্ঞাতপরিচয়ের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করেছে। পুলিশের দাবি, আন্দোলনের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় জড়িতদের ভিডিও ফুটেজ ও অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতে শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।
ঘটনার সূত্রপাত দীর্ঘদিন ধরে চলা JPSC (ঝাড়খণ্ড পাবলিক সার্ভিস কমিশন) এবং JSSC (ঝাড়খণ্ড স্টাফ সিলেকশন কমিশন)-এর বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষা নিয়ে ক্ষোভ থেকে। পরীক্ষার্থীদের অভিযোগ, প্রশ্নফাঁস, পরীক্ষার ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতার অভাবের কারণে বহু চাকরিপ্রার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এই দাবিগুলিকে সামনে রেখে জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহ থেকেই রাঁচিতে আন্দোলন শুরু হয় এবং ধীরে ধীরে তা বড় আকার নেয়।
১০ আগস্ট বিধানসভা অভিযান ঘিরে উত্তেজনা
১০ আগস্ট হাজার হাজার চাকরিপ্রার্থী ও যুবক রাঁচিতে বিধানসভা অভিমুখে মিছিল করেন। আন্দোলনকারীদের মূল দাবির মধ্যে ছিল নিয়োগ পরীক্ষার অনিয়মের নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে পরীক্ষা বাতিল করে পুনরায় পরীক্ষা নেওয়া এবং পুরো নিয়োগ ব্যবস্থায় সংস্কার। আন্দোলনকারীদের একাংশ কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা দিয়ে তদন্তের দাবিও জানিয়েছে।
মিছিল বিধানসভা এলাকার কাছে পৌঁছালে পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে আন্দোলনকারীদের আটকানোর চেষ্টা করে। এরপর পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পুলিশের দাবি, একাংশ বিক্ষোভকারী ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা করেন এবং পাথর ছোড়ার মতো ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস, জলকামান এবং লাঠিচার্জ ব্যবহার করে। অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, তাঁদের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে পুলিশ অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করেছে।
এফআইআরে অজ্ঞাতপরিচয় ৩০০ জন
অশান্তির পর পুলিশ প্রায় ৩০০ জন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে। পুলিশের বক্তব্য, ঘটনাস্থলের ভিডিও ও অন্যান্য ফুটেজ খতিয়ে দেখে যারা আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গ বা হিংসাত্মক ঘটনায় যুক্ত ছিল, তাদের চিহ্নিত করা হবে।
তবে এদিনের ঘটনায় অভিযুক্তের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। একটি প্রতিবেদনে প্রায় ৬০০ জনের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়েরের কথা বলা হয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ব্যক্তিকে এখনও শনাক্ত করা যায়নি। ফলে বিভিন্ন ঘটনার জন্য দায়ের হওয়া মামলা বা একাধিক এফআইআর মিলিয়ে সংখ্যাটি উল্লেখ করা হচ্ছে কি না, তা স্পষ্টভাবে আলাদা করে দেখা প্রয়োজন।
আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচি ঘিরে কড়া নিরাপত্তা
আন্দোলন আরও বড় আকার নিতে পারে বলে রাঁচি প্রশাসন সতর্ক রয়েছে। ২০ আগস্ট মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবন ঘেরাওয়ের কর্মসূচির কথা আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। সেই কর্মসূচিকে সামনে রেখে মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবনের আশপাশে অতিরিক্ত সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন এবং ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারির ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে খবর।
প্রশ্নফাঁসের অভিযোগের পটভূমি
ঝাড়খণ্ডে পরীক্ষার অনিয়ম নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। চলতি বছর আবগারি দফতরের কনস্টেবল নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের অভিযোগের তদন্তে রাঁচি পুলিশ একটি অভিযানে ১৫৯ জন পরীক্ষার্থীকে আটক করেছিল। পুলিশের দাবি ছিল, তাঁদের কাছ থেকে পরীক্ষার সম্ভাব্য প্রশ্ন ও উত্তর সংক্রান্ত উপকরণ উদ্ধার করা হয়েছিল।
ফলে JPSC-JSSC-সহ বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষা নিয়ে চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে তৈরি হওয়া ক্ষোভ এখন বৃহত্তর আন্দোলনের রূপ নিয়েছে। সরকারের সামনে একদিকে পরীক্ষাব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা ও স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনার চাপ, অন্যদিকে আন্দোলনের সময় আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার চ্যালেঞ্জ—দুই দিকই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এই পরিস্থিতিতে আগামী দিনগুলিতে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সরকারের আলোচনা কতটা এগোয় এবং প্রশ্নফাঁস ও নিয়োগ-অনিয়মের অভিযোগের তদন্তে কী পদক্ষেপ করা হয়, তার ওপরই ঝাড়খণ্ডের এই আন্দোলনের পরবর্তী গতিপথ অনেকটাই নির্ভর করছে।