‘ডিজিটাল গ্রেফতার’-এর ভয় দেখিয়ে ৮২ বছরের এক অবসরপ্রাপ্ত ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ১০ কোটি ৭৪ লক্ষ ৬৫ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে চাঞ্চল্যকর সাইবার প্রতারণার পর্দাফাঁস করেছে পুণে সাইবার পুলিশ। তদন্তে উঠে এসেছে আরও বিস্ফোরক তথ্য—প্রতারণার টাকা দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ৫,৪৩৬টি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এই ঘটনায় সমাজমাধ্যমে পরিচিত ‘রিল ক্রিয়েটর’ রোহন রমেশ্বর জাধব-সহ চারজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, অভিযুক্ত রোহন জাধবের বয়স ২৬ বছর। তিনি সমাজমাধ্যমে রিল বানিয়ে পরিচিতি তৈরি করেছিলেন। তদন্তকারীদের দাবি, তাঁর আর্থিক লেনদেনের সূত্র ধরে দেশের বিভিন্ন জায়গায় নথিভুক্ত অন্তত ২৯টি সাইবার প্রতারণার অভিযোগের সঙ্গে যোগসূত্রের সন্ধান মিলেছে। পুলিশের তদন্তে তাঁর সঙ্গে হংকং-ভিত্তিক সাইবার অপরাধীদের যোগাযোগের কথাও উঠে এসেছে।
কীভাবে ফাঁদে ফেলা হয় বৃদ্ধকে?
তদন্ত অনুযায়ী, চলতি বছরের ২৩ থেকে ৩১ জানুয়ারির মধ্যে প্রতারকরা ওই বৃদ্ধের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিজেদের কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার আধিকারিক বলে পরিচয় দেয়। তাঁকে বলা হয়, তাঁর পরিচয়পত্র ব্যবহার করে একটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে এবং সেটি অপরাধমূলক আর্থিক লেনদেনে ব্যবহৃত হয়েছে।
এরপর তাঁকে ‘ডিজিটাল গ্রেফতার’-এর ভয় দেখিয়ে কার্যত মানসিকভাবে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। প্রতারকদের দাবি ছিল, তাঁকে গ্রেফতার করা হতে পারে এবং বিষয়টি মেটাতে হলে তাঁর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে থাকা টাকা ‘যাচাই’-এর জন্য নির্দিষ্ট অ্যাকাউন্টে পাঠাতে হবে।
প্রতারণার কৌশলকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে জাল আদালত-পর্বও সাজানো হয়েছিল বলে তদন্তে জানা গিয়েছে। ভিডিও কলে এক ব্যক্তি বিচারকের ভূমিকায় এবং অন্যজন সরকারি কৌঁসুলির ভূমিকায় ছিলেন। দীর্ঘ সময় ধরে ভিডিও কলে রেখে বৃদ্ধকে পরিবারের সদস্য বা অন্য কারও সঙ্গে যোগাযোগ না করার নির্দেশ দেওয়া হয়। আতঙ্কিত হয়ে শেষ পর্যন্ত তিনি বিপুল পরিমাণ টাকা বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে দেন।
৫,৪৩৬ অ্যাকাউন্টে ঘুরল টাকা
তদন্তকারীদের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল টাকা কোথায় গেল, তার হদিস পাওয়া। পুলিশ জানতে পারে, বৃদ্ধের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া ১০.৭৪ কোটি টাকা সরাসরি একটি বা কয়েকটি অ্যাকাউন্টে রাখা হয়নি। বরং দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ৫,৪৩৬টি ‘মিউল’ ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে টাকার লেনদেন ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
পুলিশের মতে, এ ধরনের অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করা হয় মূল অর্থের উৎস আড়াল করতে এবং তদন্তকারীদের কাছে আর্থিক লেনদেনের পথ জটিল করে তুলতে। তদন্তে আরও জানা গিয়েছে, টাকা ঘোরানোর পর তার একটি অংশ ক্রিপ্টোকারেন্সি, বিশেষ করে USDT-তে রূপান্তর করা হয় এবং কিছু অর্থ নগদে তুলে নেওয়া হয়।
সমাজমাধ্যম প্রভাবীর ভূমিকা কী?
পুলিশের অভিযোগ, রোহন জাধব এই চক্রকে মিউল ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট জোগাড় এবং টাকা স্থানান্তরের কাজে সাহায্য করতেন। তাঁর আর্থিক লেনদেন বিশ্লেষণ করে তদন্তকারীরা আরও একাধিক সাইবার প্রতারণার সঙ্গে যোগসূত্রের সন্ধান পেয়েছেন।
এর আগে এই মামলায় শুবহম ধানাতোলে, সমর্থ দেশমুখ ও অমর আটার্গি নামে আরও তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। রোহন জাধবকে পরে পিম্পলে গুরব এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে আগে থেকেই অ-জামিনযোগ্য পরোয়ানা ছিল বলেও তদন্তে উঠে এসেছে।
পুলিশ ইতিমধ্যেই বিভিন্ন সন্দেহজনক অ্যাকাউন্টে থাকা প্রায় ১.৩৪ কোটি টাকা ফ্রিজ করেছে। তবে পুরো অর্থের হদিস পেতে তদন্ত এখনও চলছে।
‘ডিজিটাল গ্রেফতার’ আসলে কী?
‘ডিজিটাল গ্রেফতার’ নামে কোনও আইনি ব্যবস্থা নেই। এটি সাইবার প্রতারকদের তৈরি একটি প্রতারণার কৌশল। প্রতারকরা সাধারণত পুলিশ, CBI, ED, আদালত বা অন্য কোনও সরকারি সংস্থার আধিকারিক সেজে ফোন বা ভিডিও কল করে। ভুয়ো মামলা, গ্রেফতারি পরোয়ানা কিংবা মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ দেখিয়ে ভয় দেখানো হয়। এরপর ভুক্তভোগীকে দীর্ঘ সময় ভিডিও কলে আটকে রেখে টাকা পাঠাতে বাধ্য করা হয়।
পুণের এই ঘটনা দেখিয়ে দিল, প্রতারকদের কৌশল এখন কতটা সংগঠিত এবং প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠেছে। বিশেষত বয়স্ক মানুষদের ভয়, সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি স্বাভাবিক আস্থা এবং আইনি জটিলতা সম্পর্কে অনিশ্চয়তাকে কাজে লাগিয়ে এই চক্রগুলি কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।
পুলিশ ও সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের বার্তা স্পষ্ট—কোনও সরকারি সংস্থা ভিডিও কলের মাধ্যমে কাউকে ‘ডিজিটাল গ্রেফতার’ করে না এবং তদন্তের নামে টাকা নির্দিষ্ট ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পাঠাতে বলে না। এমন ফোন বা ভিডিও কল এলে সঙ্গে সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে পরিবারকে জানানো এবং সাইবার অপরাধের সরকারি হেল্পলাইন ১৯৩০-এ অভিযোগ করা উচিত।