ব্রহ্মাণ্ডের ৯৫ শতাংশই অদৃশ্য! ডার্ক ম্যাটার এবং ডার্ক এনার্জির রহস্যসন্ধানে মহাকাশে নতুন টেলিস্কোপ পাঠাচ্ছে নাসা


ব্রহ্মাণ্ডকে আমরা যতটা দেখি, তার চেয়ে অনেকটাই যেন অদৃশ্য। নক্ষত্র, গ্রহ, গ্যালাক্সি-সহ পরিচিত বা ‘স্বাভাবিক’ পদার্থ গোটা মহাবিশ্বের মাত্র প্রায় ৫ শতাংশ। বাকি প্রায় ৯৫ শতাংশের মধ্যে আনুমানিক ২৭ শতাংশ ডার্ক ম্যাটার এবং ৬৮ শতাংশ ডার্ক এনার্জি। এই দুই রহস্যময় উপাদান আসলে কী, তা এখনও পুরোপুরি জানা যায়নি। এবার সেই অন্ধকার জগতের রহস্য উন্মোচনে আরও শক্তিশালী হাতিয়ার নিয়ে মহাকাশে পাড়ি দিতে চলেছে নাসার ‘ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ’।
নাসার পরিকল্পনা অনুযায়ী, রোমান স্পেস টেলিস্কোপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে বিশাল পরিসরে মহাবিশ্বের মানচিত্র তৈরি করা। টেলিস্কোপটি কয়েকশো মিলিয়ন গ্যালাক্সির তথ্য সংগ্রহ করতে পারবে। এর সাহায্যে বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বে পদার্থ কী ভাবে ছড়িয়ে রয়েছে এবং সময়ের সঙ্গে সেই বিন্যাস কী ভাবে বদলেছে, তা বিশ্লেষণ করবেন। নাসা জানিয়েছে, টেলিস্কোপটির উৎক্ষেপণ ২০২৬ সালের শরৎকালে হওয়ার কথা।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ ডার্ক ম্যাটার?
ডার্ক ম্যাটারকে সরাসরি দেখা যায় না। এটি আলো শোষণ, প্রতিফলন বা নির্গত করে না। কিন্তু এর মহাকর্ষীয় প্রভাবের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা এর অস্তিত্ব সম্পর্কে ধারণা পান। গ্যালাক্সি ও গ্যালাক্সি ক্লাস্টারের কাঠামো গড়ে ওঠা এবং তাদের গতিবিধির ক্ষেত্রে ডার্ক ম্যাটারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করা হয়।
অন্যদিকে ডার্ক এনার্জি আরও বড় রহস্য। মহাবিশ্ব ক্রমশ দ্রুত গতিতে প্রসারিত হচ্ছে—এই ত্বরিত প্রসারণের নেপথ্যে যে অজানা কারণকে বিজ্ঞানীরা ‘ডার্ক এনার্জি’ নামে অভিহিত করেছেন। তবে সেটি আসলে কোনও শক্তি, ক্ষেত্র, নাকি মহাকর্ষের বর্তমান ধারণার কোনও পরিবর্তনের ইঙ্গিত—তা এখনও নিশ্চিত নয়।
কী ভাবে রহস্যের সন্ধান করবে রোমান?
রোমান স্পেস টেলিস্কোপের বিস্তৃত পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা বিজ্ঞানীদের বিপুল সংখ্যক গ্যালাক্সির ত্রিমাত্রিক তথ্য সংগ্রহে সাহায্য করবে। বিশেষ করে গ্যালাক্সির আলো কী ভাবে মহাকর্ষের কারণে বেঁকে যাচ্ছে, অর্থাৎ ‘গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং’-এর মতো প্রভাব বিশ্লেষণ করে অদৃশ্য ডার্ক ম্যাটারের বণ্টন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে। নাসার পরিকল্পিত সমীক্ষায় আকাশের ৫,০০০ বর্গ ডিগ্রিরও বেশি এলাকা পর্যবেক্ষণ করার কথা রয়েছে।
এর পাশাপাশি ডার্ক এনার্জির প্রভাবে মহাবিশ্বের প্রসারণ কী ভাবে বদলাচ্ছে, সেটিও খতিয়ে দেখা হবে। এই গবেষণার ফল মহাবিশ্বের উৎপত্তি, বিবর্তন এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের ধারণাকে আরও স্পষ্ট করতে পারে।
এর আগে নাসার জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের তথ্য ব্যবহার করেও ডার্ক ম্যাটারের অন্যতম বিস্তারিত মানচিত্র তৈরি হয়েছে। প্রায় ৮ লক্ষ গ্যালাক্সির তথ্যের সাহায্যে বিজ্ঞানীরা অদৃশ্য পদার্থটির মহাকর্ষীয় প্রভাব বিশ্লেষণ করেছেন।
ফলে রোমান স্পেস টেলিস্কোপের যাত্রা শুধু নতুন একটি মহাকাশ মিশন নয়, বরং মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় অমীমাংসিত প্রশ্নগুলির উত্তর খোঁজার নতুন অধ্যায়। আমরা যে মহাবিশ্বকে দেখি, তার সামান্য অংশই যদি দৃশ্যমান হয়, তবে অদৃশ্য সেই বিশাল অংশের রহস্য উদ্ঘাটিত হলে মহাকাশ সম্পর্কে মানুষের বর্তমান ধারণাতেও বড় পরিবর্তন আসতে পারে।

Post a Comment

Previous Post Next Post