রাতের অন্ধকার ক্যানভাসে ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে দুর্গাপুজোর প্যান্ডেল-প্রতিকৃতি, ঠিক যেন আকাশের গায়ে তুলির টান দিচ্ছে কেউ। আনমনে। আপন খেয়ালে। সময় গড়াল ঈষৎ, আড়ম্বরের আনুষাঙ্গিক বাড়ল কিছুটা। আকাশের প্যান্ডেলে প্রবেশ করল ঢাক-ধুনুচি, শুরু হল পুষ্পাঞ্জলি। পাত পেড়ে ভোগ খেতে বসে পড়ল মনুষ্যদল। দেখতে দেখতে, একশো আট প্রদীপের সমন্বয়ে শুরু হল সন্ধি পুজো। ছেলেবেলায় বিড়লা প্ল্যানেটোরিয়ামে দেখা আকাশের গায়ে সিনেমার মতো।
অবিকল। অপরূপ। আর ইডেনের আকাশে এত কিছু করছে যে, এমন ছবির পর ছবি আঁকছে যে, সে রক্তমাংসের কোনও শিল্পীই নয়। প্রথাগত আর্ট কলেজ থেকে সে পাশ করেনি বটে। কিন্তু দুর্গাপুজোর আবহ-আড়ম্বরের জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ-সমস্ত সে জানে, যথেষ্ট সিদ্ধহস্ত। যা সে শহরের মানুষকে, ইডেন গার্ডেন্সকে দেখাতে বড়ই ব্যস্ত। একখানা পোশাকি নাম আছে তার, ‘ড্রোন’। দক্ষতা বিচারে যদিও তা হওয়া উচিত, ‘ড্রোনাচার্য’! কী, আজগুবি গাঁজাখুরি লাগছে? আবোল-তাবোলের আধুনিক সংস্করণ মনে হচ্ছে? যা লেখা হল, সম্পূর্ণ বাস্তব কিন্তু। যা ঘটবে আর ক’দিনে। বাঙালির সারে ইডেন গার্ডেন্সে। বাংলার প্রাণের দুর্গপুজোকে কেন্দ্র করে।
আগামী ১০ অক্টোবর মহালয়ার দিন যে শহরে দুর্গাপুজোর রাজকীয় উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর উপস্থিতিতে, তা সর্বজনবিদিত। ইডেনে প্রবল জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের খবরাখবরও আদ্দিনে সবার জানা। প্রধানমন্ত্রী-মুখ্যমন্ত্রী কখন আসছেন, ইডেনে দুর্গাপুজোর আগমনীর উপকরণ-তালিকায় থাকছে কী কী, প্রচারমাধ্যমের দৌলতে কম-বেশি জেনে গিয়েছে লোকে। গতকালই রাজ্য সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সব দফতরের সঙ্গে বৈঠক হয়ে গিয়েছে সিএবি অধিকারিকদের। তারপর নানাবিধ খবরও বিবিধ সূত্র মারফত পাওয়া গিয়েছে। যেমন, ইডেনে উলুধ্বনিতে বরণ করে নেওয়া হবে প্রধানমন্ত্রীকে। ‘থ্রি ডি’ শো থাকবে। যার নাম ‘মা আসছে’। তিন হাজার ঢাকি, ঢাক বাজাবেন। গল্ফ কার্টে করে ঘুরবেন প্রধানমন্ত্রী। শান্তনু মৈত্র, শান, অন্তরা মিত্র, কৌশিকী চক্রবর্তীর মতো সঙ্গীতশিল্পীরা গান গাইবেন।
শুধু তাই নয়। সূত্রের খবর, দুর্গাপুজোর প্রচার, এবার থেকে হয়ে যাবে বিশ্বজনীন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘টাইমস স্কোয়্যার’, বিলেতের ‘পিকাডেলি সার্কাস’, দুবাইয়ের ‘বুর্জ খলিফা’-য় প্রচার হবে দুর্গপুজোর। ইডেন অনুষ্ঠানের ক্লিপিংস-সহ। আর অনুষ্ঠানের ‘শেষ পাতে’ থাকছে যা, তা-ও বড় মোহিনী। চিত্তাকর্ষক। ভুবনভোলানো। অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে ‘ড্রোন শো’-র সঙ্গে যে আতসবাজি থাকতে চলেছে, জানা ছিল। শুধু জানা ছিল না, তা দিয়ে এমন বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি চলছে। সূত্রের খবর, মহালয়া থেকে বিসর্জন পর্যন্ত মা দুর্গার যাত্রা দেখানো হবে ড্রোন শোয়ে। ইডেন আকাশে ফুটে উঠবে প্যান্ডেল-প্রতিকৃতি। যা ফুটিয়ে তুলবে, ‘ড্রোনাচার্য’। যার নামকরণ হয়েছে- ‘দ্য প্যান্ডেল ইন দ্য স্কাইস’। যেখানে দুর্গাপুজোর প্যান্ডেলে যা যা থাকে, যা যা ঘটে, সবই দেখানো হবে ড্রোনের মাধ্যমে। ঢাক। ধুনুচি নাচ। পুষ্পাঞ্জলি। ছৌ নাচ। ভোগ বিতরণ। সন্ধি পুজো। কী থাকছে না? মহালয়া নিয়ে শোনা গেল, আলাদা একটা বিভাগ থাকছে ‘ড্রোন শো’-এ। যেখানে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের মহিষাসুরমর্দিনীর সঙ্গে শোনা যাবে আগমনীর কাহিনি। মা দুর্গার ঘরে ফেরার গল্প। আর শেষে, সব শেষে, ইডেনের আকাশজুড়ে হবে মা দুর্গার চক্ষুদান। হে শহর, তুমি তৈরি তো? সময় কিন্তু হয়ে গেল। মা আসছেন!