নিজস্ব প্রতিবেদন:
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে সংঘাত যত বাড়ছে, ততই সামনে আসছে তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার পুরনো যোগসূত্রের প্রসঙ্গ। ইরানের হাতে থাকা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের প্রযুক্তিগত বিকাশে পিয়ংইয়ংয়ের ভূমিকা বহু বছর ধরেই আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনার বিষয়। ফলে ইরানের নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা এবং উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সম্ভাব্য সহযোগিতা নিয়ে ফের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে ওয়াশিংটনে।
ইরান ও উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র সহযোগিতার ইতিহাস নতুন নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিক থেকেই দু’দেশের মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি সংক্রান্ত যোগাযোগের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ইরানের শাহাব-৩ ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার নোডং প্রযুক্তির সাদৃশ্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা হয়েছে। আন্তর্জাতিক গবেষণাতেও দু’দেশের মধ্যে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা চলার প্রমাণ ও সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে।
তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ২০২৬ সালে ইরানকে লক্ষ্য করে আমেরিকা ও ইজ়রায়েলের সামরিক অভিযানে দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন পরিকাঠামো ও লঞ্চ সাইট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে। ফলে ভবিষ্যৎ প্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় রাখতে তেহরানকে ফের নিজের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার ও উৎপাদন পরিকাঠামো শক্তিশালী করতে হতে পারে। এই জায়গাতেই উত্তর কোরিয়ার সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
এরই মধ্যে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজ়তবা খামেনেইয়ের সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার শাসক কিম জং উনের সম্পর্ক নিয়েও নজর বেড়েছে। মোজ়তবাকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে বেছে নেওয়ার পর উত্তর কোরিয়া তাঁর নেতৃত্বকে সমর্থন জানায় এবং ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকা ও ইজ়রায়েলের হামলার সমালোচনা করে।
যদিও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও সামনে রয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার মূল্যায়ন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সংঘাত শুরু হওয়ার পর উত্তর কোরিয়া ইরানকে অস্ত্র বা সামরিক সরঞ্জাম পাঠিয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। বরং পিয়ংইয়ং ইরান থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখছে বলেই সে সময় সিউল জানিয়েছিল।
তাই এখনই কিম-মোজ়তবা ‘যুগলবন্দি’ থেকে সরাসরি নতুন অস্ত্র সরবরাহ বা যৌথ ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি শুরু হয়েছে বলে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। কিন্তু দুই দেশের দীর্ঘদিনের প্রযুক্তিগত যোগাযোগ, আমেরিকার সঙ্গে তাদের সংঘাত এবং ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তা—সব মিলিয়ে ভবিষ্যতে সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে পশ্চিমা মহলে উদ্বেগ থাকছেই।
অন্য দিকে, উত্তর কোরিয়াও নিজের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আগস্টের শেষেও পিয়ংইয়ং ঘোষণা করেছে যে আমেরিকার ‘শত্রুতাপূর্ণ নীতি’ বদলায়নি এবং নিজেদের পারমাণবিক শক্তি আরও বাড়ানোর অঙ্গীকার করেছে।
ফলে ওয়াশিংটনের কাছে আশঙ্কার জায়গাটা শুধু ইরান নয়। এক দিকে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি, অন্য দিকে পূর্ব এশিয়ায় উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা—দুই ক্ষেত্রেই আমেরিকাকে একসঙ্গে নজর রাখতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে তেহরান-পিয়ংইয়ংয়ের পুরনো প্রযুক্তিগত যোগাযোগ যদি ফের সক্রিয় হয়, তা হলে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সমীকরণ আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।