নমো গাথা নাটকের শেষে স্কুলেও জয় শ্রীরাম স্লোগান!



স্কুলে স্কুলে ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান তুলে শেষ হলো ‘নমো গাথা’ নাটক। প্রধানমন্ত্রীর ৭৬তম জন্মদিন এবং তাঁর প্রাশসনিক জীবনের ২৫ বছর উপলক্ষে বুধবার রাজ্যের স্কুলগুলিতে এই নাটক পরিবেশিত হয়। স্ক্রিপ্ট পাঠানো হয়েছিল রাজ্য শিক্ষা দপ্তর থেকেই। নাটকের নাম ছিল, ‘নমো সেবা: অজানা কাহিনি’। নাটকে অভিনয় করতে হয়েছে স্কুল পড়ুয়াদের। দর্শকাসনেও ছিল পড়ুয়ারাই। নাটকের একেবারে শেষ দিকে একটি জায়গায় সংলাপ এমন ভাবে সাজানাে হয়েছিল যেখানে ‘দিশা’ নামে একটি চরিত্র বলবে—‘৫০০ বছরের প্রতীক্ষার পরে রামলালার মন্দির কে নির্মাণ করেছিলেন?’ স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী তখন দর্শকদের বলতে হবে, ‘মোদীজি’। তার পরে ‘দিশা’ আবার বলবে—‘তা হলে সবাই এক সাথে বলুন, জয় শ্রীরাম’। দর্শকাসনে থাকা পড়ুয়াদের বলতে হবে—‘জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীরাম!’ এ ভাবেই বুধবার শহর ও রাজ্যের নানা প্রান্তে শ’য়ে শ’য়ে স্কুলে শেষ হলো ‘নমো গাথা’ নাটক। স্কুল পড়ুয়াদের দিয়ে এ রকম স্লোগান দেওয়ানো নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে শিক্ষামহলে।

নাটকের বিষয়বস্তুর মধ্যে রয়েছে এ রকম আরও অনেক কিছু। ২০০১–এ গুজরাটে যে ভয়ঙ্কর ভূমিকম্প হয়েছিল, তখন সে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নরেন্দ্র মোদী কী ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন—সেই গাথা দিয়ে শুরু হয় নাটক। নাটক যত এগিয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর ভয়েস ওভার ব্যবহার বেড়েছে স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী। এর পরে আসে ২০১৪-র আগে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকারের সময়কার ভারতের প্রসঙ্গ। কংগ্রেসের নাম না–করে বিভিন্ন সংলাপে বলা হয়েছে—ওই পর্বে দেশটা মূলত ছিল নকশালি, সন্ত্রাসবাদী, দুর্নীতিগ্রস্তদের হাতে। রেলে-বাসে সর্বক্ষণ ঘোষণা করা হতো—কোনও পরিত্যক্ত ব্যাগে হাত দেবেন না। বোমা হতে পারে। এক শিশুর মুখে সংলাপ দেওয়া হয়েছে—‘ওই সময়ে রেল স্টেশনে নিজের ব্যাগের বদলে লোকের ব্যাগের দিকে বেশি তাকিয়ে থাকতে হতো বুঝি?’

২০১৪–য় কেন্দ্রে সরকারের পরিবর্তন হয়। প্রধানমন্ত্রী হন নরেন্দ্র মোদী। নাটকের স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী, তার পর থেকেই নাকি সন্ত্রাসবাদী, নকশালি এবং দুর্নীতিগ্রস্তরা ভয়ে গুটিয়ে গিয়েছে। এসেছে সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের প্রসঙ্গও। পড়ুয়াদের বলতে হয়েছে, ‘যেমন তোরা (শিশুরা) ভয় পেলে ডায়াপার পরিস, তেমনই সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের সময়ে পাকিস্তানে ডায়াপার বিক্রি অস্বাভাবিক বেড়ে গিয়েছিল।’ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময়ে কী ভাবে প্রধানমন্ত্রী ‘অপারেশন গঙ্গা’র মাধ্যমে আটকে থাকা ভারতীয়দের ফিরিয়েছিলেন, সে প্রসঙ্গও রয়েছে নাটকে। কী ভাবে কারও সামনে মাথা নত না করে তেলের জোগান বজায় রেখে প্রধানমন্ত্রী ভারতকে সচল রেখেছেন, সে সব কথাও রয়েছে নাটকে। কোভিডের টিকাকরণ থেকে ৩৭০ অনুচ্ছেদ বিলোপ, ডিজিটাল লেনদেনের মতো প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শিতার কথাও শোনানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নামে জয়ধ্বনি ও ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগানে শেষ হয়েছে নাটক।

এমন রাজনৈতিক উপাদানে ঠাসা নাটকের স্ক্রিপ্ট পাওয়ার পরেই শহরের বেশ কিছু স্কুলের শিক্ষক এবং প্রধান শিক্ষকদের অনেকে আপত্তি তুলেছিলেন। এক প্রধান শিক্ষকের বক্তব্য, ‘সাধারণত বাচ্চাদের আমরা রাজনৈতিক বিষয় থেকে দূরেই রাখি। এখানে এমন সব সংলাপ ব্যবহার করা হয়েছে যা সব ছাত্রছাত্রীর কাছে স্বস্তিদায়ক নাও হতে পারে।’ প্রধান শিক্ষকদের অনেকে জানিয়েছেন, এই নাটকের স্ক্রিপ্টে অজস্র ভাষাগত ও ব্যাকরণগত ভুলও রয়েছে। যেমন, মোদীর আদলে থাকা চরিত্রের একটি সংলাপে রয়েছে, ‘অন্ধকারটা ভীষণ ভারী।’ অন্য এক জায়গায় মোদীর মায়ের কষ্টের বর্ণনায় লেখা হয়েছে—তিনি কাঠের উনুনের ধোঁয়ায় মাকে ‘চোখ জ্বালাতে দেখেছেন’! নাটকের শেষে বলা হয়েছে—‘সৌগন্ধ আমাকে এই মাটির, আমি দেশ মিটতে দেব না।’ মনে করা হচ্ছে, হিন্দি নাটককে এআই-এর মাধ্যমে অনুবাদ করতে গিয়েই ঘটেছে মস্ত সব বিপত্তি।

Post a Comment

Previous Post Next Post