খাবারের মান নিয়ে হঠাৎ কেন এত তৎপরতা?


খাবারের মান নিয়ে হঠাৎই যেন নড়েচড়ে বসেছে গোটা দেশ। কোথাও বাসি-পচা খাবার উদ্ধার, কোথাও মেয়াদ পেরিয়ে যাওয়া খাদ্যপণ্য, আবার কোথাও নকল পনির। একের পর এক তল্লাশি, জরিমানা, লাইসেন্স বাতিল—খাদ্য সুরক্ষা দফতরের এমন তৎপরতা সাম্প্রতিক সময়ে নজর কেড়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হল, এতদিন পরে হঠাৎ কেন এই সক্রিয়তা?
ঘটনাপ্রবাহের দিকে তাকালে দেখা যায়, খাবারের মান নিয়ে উদ্বেগ অবশ্য নতুন নয়। ২০০৩ সালেই সংসদ ভবনে কোমল পানীয়ের মান নিয়ে তুমুল বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। অভিযোগ উঠেছিল, কোক-পেপসির মতো জনপ্রিয় কোমল পানীয়তে উচ্চ মাত্রায় কীটনাশকের উপস্থিতি রয়েছে। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয় যে সংসদের ক্যান্টিন থেকে ওই পানীয় সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এমনকী সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির পানীয় পরিবেশনের মেশিন ও রেফ্রিজারেটরও সংসদ চত্বর থেকে সরানোর ব্যবস্থা করা হয়।
তৎকালীন ক্যাটারিং কমিটির চেয়ারম্যান ই আহমেদের নির্দেশের পাশাপাশি সংসদে বিরোধীদের তীব্র প্রশ্নের মুখে পড়ে কেন্দ্রীয় সরকার। তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ বিষয়টি নিয়ে ‘সামগ্রিক তদন্ত’-এর আশ্বাস দেন। দিল্লিভিত্তিক অসরকারি সংস্থা ‘সেন্টার ফর সায়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট’-এর রিপোর্টের উল্লেখ করে অভিযুক্ত বহুজাতিক সংস্থাগুলির বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও ওঠে।
সেই সময় সমাজবাদী পার্টির রামজিলাল সুমন অভিযোগ করেছিলেন, বহুজাতিক সংস্থাগুলি মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে। এআইএডিএমকে-র কে মালাইস্বামী কোমল পানীয়কে ‘স্লো পয়জন’ এবং ‘নীরব ঘাতক’ বলেও আক্রমণ করেছিলেন। সেই ঘটনার পর সংসদ ভবনে ওই ধরনের কোমল পানীয়ের নিষেধাজ্ঞা এখনও বহাল রয়েছে। বর্তমানে সাংসদদের জন্য টাটকা ফলের রস, লস্যি, ছাঁচ, চা এবং কফির মতো বিকল্প পানীয়ের ব্যবস্থা রয়েছে।
অথচ সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে ছবিটা সম্পূর্ণ আলাদা। বাজারে এই পানীয় অবাধে বিক্রি হয়। শুধু বিক্রিই নয়, বিপুল বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের কাছে এগুলির জনপ্রিয়তাও বাড়ানো হয়। স্কুল-কলেজ থেকে শুরু করে দেশের নামী উচ্চশিক্ষা ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলিতেও বিভিন্ন ধরনের খাদ্য ও পানীয়ের বিক্রি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
তাহলে কি দেশে খাদ্য সুরক্ষার জন্য আইন ছিল না? অবশ্যই ছিল। স্বাধীনতার পর থেকে খাদ্যপণ্যের মান ও ভেজাল নিয়ন্ত্রণে একাধিক আইন ও বিধি কার্যকর হয়েছে। ভেজিটেবল অয়েল প্রোডাক্টস (কন্ট্রোল) অর্ডার, ১৯৪৭, খাদ্য ভেজাল প্রতিরোধ আইন, ১৯৫৪, ফল পণ্য আদেশ, ১৯৫৫, মাংস খাদ্য পণ্য আদেশ, ১৯৭৩, ভোজ্য তেল প্যাকেজিং (রেগুলেশন) অর্ডার, ১৯৯৮, দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য আদেশ, ১৯৯২—এমন একাধিক বিধি ছিল।
পরবর্তীতে এই বিচ্ছিন্ন আইনগুলিকে একত্রিত ও আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যেই ২০০৬ সালে আনা হয় Food Safety and Standards Act। এর অধীনে তৈরি হয় Food Safety and Standards Authority of India (FSSAI)। খাদ্যপণ্যের মান নির্ধারণ, উৎপাদন, সংরক্ষণ, বিতরণ, বিক্রি ও আমদানি নিয়ন্ত্রণ এবং খাদ্য সুরক্ষা নিয়ে সচেতনতা তৈরির মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয় এই নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে।
কিন্তু আইন থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন ছিল তার প্রয়োগ নিয়ে। নিয়মিত নজরদারি এবং কঠোর প্রয়োগের অভাবে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে খাদ্যে ভেজাল ও নিম্নমানের খাদ্য বিক্রির অভিযোগ বারবার সামনে এসেছে।
এরই মধ্যে ২০২৩ সালের ৫ এপ্রিল লোকসভায় কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রকের তরফে দেওয়া তথ্য পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ছবি তুলে ধরে। ২০১৯-২০ থেকে ২০২১-২২—এই তিন বছরে দেশজুড়ে প্রায় ৩.৭ লক্ষ খাদ্য নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছিল। তার মধ্যে ৯০ হাজার ৪৭৩টি নমুনা, অর্থাৎ প্রায় ২৪.৬ শতাংশ, নির্ধারিত খাদ্য সুরক্ষা মান পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছিল।
পরিসংখ্যান বলছে, খাদ্যে ভেজালের সমস্যা সময়ের সঙ্গে কমেনি। বরং একাধিক রিপোর্টে ভেজাল শনাক্ত হওয়ার হার বৃদ্ধির কথাও উঠে এসেছে। ২০১২ সালে যেখানে এই হার প্রায় ১৫ শতাংশ ছিল, ২০১৯ সালে তা বেড়ে প্রায় ২৮ শতাংশে পৌঁছেছিল।
এরপর ২০২৬ সালের মে-জুন মাস থেকে ছবিতে যেন আচমকা বদল আসে। মুম্বই থেকে শুরু হয় একের পর এক খাদ্য সুরক্ষা অভিযান। মহারাষ্ট্রের এফডিএ কমিশনার তথা আইএএস আধিকারিক তুকারাম মুন্ডের নেতৃত্বে অভিযানগুলি বিশেষ ভাবে নজরে আসে। পরবর্তীতে দেশের বিভিন্ন রাজ্যেও খাদ্য সুরক্ষা নিয়ে অভিযান জোরদার হতে দেখা যায়।
অভিযানে সামনে আসে নানা চাঞ্চল্যকর ছবি—বাসি ও পচা খাবার, মেয়াদোত্তীর্ণ খাদ্যপণ্য, নিম্নমানের সামগ্রী, এমনকী নকল পনির বিক্রির অভিযোগও। কোথাও লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে, কোথাও আবার সংশোধনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—আইন যখন এত বছর ধরেই ছিল, তাহলে ২০২৬-এ এসে আচমকা এই তৎপরতা কেন?
সম্ভবত উত্তরটা শুধু নতুন কোনও আইন বা নির্দেশে নেই। আসল বিষয় হল নজরদারি ও প্রয়োগের মানসিকতা। আইন তৈরি করলেই খাদ্য নিরাপদ হয় না। নিয়মিত নমুনা পরীক্ষা, দ্রুত রিপোর্ট, কার্যকর শাস্তি এবং বাজারে ধারাবাহিক নজরদারি—সবকিছুর সমন্বয় প্রয়োজন।
অর্থাৎ, আজকের দেশজোড়া খাদ্য সুরক্ষা অভিযানকে শুধু ‘হঠাৎ তৎপরতা’ হিসেবে দেখলে ছবির একটা অংশই দেখা হবে। গত কয়েক দশক ধরে থাকা আইন, বিপুল সংখ্যক অনিরাপদ খাদ্য নমুনার তথ্য এবং দীর্ঘদিনের নজরদারির ঘাটতির পর ২০২৬-এর অভিযান আসলে একটি বড় প্রশ্ন সামনে আনছে—খাদ্যের নিরাপত্তা কি কেবল অভিযান চলাকালীনই নিশ্চিত হবে, নাকি বাজারে প্রতিদিনের নজরদারিই হয়ে উঠবে নিয়ম?

Post a Comment

Previous Post Next Post