স্কুলে শিক্ষকতার চাকরির জন্য দীর্ঘ অপেক্ষার পর হাতে এসেছিল সুপারিশপত্র। কাউন্সেলিং শেষ করে নিয়োগের আশায় ছিলেন বহু প্রার্থী। কারও আবার পুলিশি যাচাইকরণও শেষ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেই স্বস্তি বেশিদিন স্থায়ী হল না। নতুন সংরক্ষণ আইন কার্যকর হওয়ার পর স্কুল সার্ভিস কমিশনের (এসএসসি) প্রকাশিত নয়া তালিকায় ফের অনিশ্চয়তার মুখে পড়লেন একাদশ-দ্বাদশের একাংশের শিক্ষক পদপ্রার্থী। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, কেউ আইনি পথে লড়াইয়ের হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন, কেউ আবার রাস্তায় নেমে আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
সোমবার ওবিসি সংরক্ষণের নতুন আইন মেনে একাদশ-দ্বাদশ স্তরে নতুন করে তালিকা প্রকাশ করেছে এসএসসি। কমিশনের এই তালিকা প্রকাশের পরই ক্ষোভ ছড়িয়েছে শিক্ষক পদপ্রার্থীদের একাংশের মধ্যে। তাঁদের দাবি, ইতিমধ্যেই যাঁরা সুপারিশপত্র হাতে পেয়েছিলেন, তাঁদের ভবিষ্যৎ নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। শুধু সুপারিশপত্র পাওয়া প্রার্থীরাই নন, প্যানেলে নাম থাকা অথচ এখনও সুপারিশপত্র না পাওয়া প্রার্থীরাও একই ভাবে উদ্বেগে রয়েছেন।
পরিস্থিতির প্রতিবাদে একাংশের বক্তব্য, ২০১৬ সালে নিয়োগপ্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকে তাঁরা বার বার অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। প্রায় এক দশক ধরে নিয়োগপ্রক্রিয়ার জটিলতার সঙ্গে লড়াই করতে হচ্ছে তাঁদের। ২০২৬ সালেও সেই পরিস্থিতির কোনও পরিবর্তন হয়নি। বরং নতুন তালিকা প্রকাশের পরে ফের তাঁদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে চাকরি থাকবে কি না, সেই প্রশ্ন।
কেউ কেউ সরকারের কাছে চাকরি বাতিলের পরিবর্তে ‘স্বেচ্ছামৃত্যুর’ অনুমতি চেয়েছেন বলেও জানা গিয়েছে। তাঁদের বক্তব্য, দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগের আশায় অপেক্ষা করতে করতে তাঁরা মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত। অন্য দিকে, আন্দোলনকারীদের আর একাংশ জানিয়েছেন, তাঁরা ফের আইনি পথে লড়াই করবেন। প্রয়োজনে রাস্তায় নেমেও আন্দোলন করা হবে।
২০১৬ থেকে ২০২৬— গত এক দশকে রাজ্যের শিক্ষক নিয়োগপ্রক্রিয়া একাধিক আইনি জটিলতার মধ্যে দিয়ে গিয়েছে। নিয়োগে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের প্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে সুপ্রিম কোর্ট ২০১৬ সালের গোটা এসএসসি প্যানেল বাতিল করে দেয়। এর ফলে প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর চাকরি চলে যায়। পরে যোগ্যদের জন্য নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত স্কুলে কাজ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। প্রথমে ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এবং পরে সেই সময়সীমা বাড়িয়ে ২০২৬ সালের ৩১ অগস্ট পর্যন্ত করা হয়।
এরই মধ্যে নতুন করে শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করে এসএসসি। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে পরীক্ষা নেওয়া হয় এবং ওই বছরই ফল প্রকাশিত হয়। কিন্তু নিয়োগপ্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করা সম্ভব হয়নি। নবম-দশম স্তরে বহু প্রার্থীর ক্ষেত্রে নথি যাচাইয়ের কাজ এগোলেও ইন্টারভিউ-সহ পরবর্তী ধাপ সম্পূর্ণ হয়নি। তুলনায় একাদশ-দ্বাদশ স্তরের নিয়োগপ্রক্রিয়া অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছিল।
একাদশ-দ্বাদশ স্তরে মোট ৩৩টি বিষয়ের মধ্যে ২১টি বিষয়ের কাউন্সেলিং শেষ হয়ে যায়। বহু প্রার্থী সুপারিশপত্র হাতে পান। কারও কারও পুলিশি যাচাইকরণও শেষ হয়ে যায়। ফলে নিয়োগপত্র পাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন তাঁরা। কিন্তু এর মধ্যেই সংরক্ষণ সংক্রান্ত নতুন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় ফের আটকে যায় নিয়োগপ্রক্রিয়ার একটি অংশ।
আগস্টে ১২টি বিষয়ের কাউন্সেলিং শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নতুন সংরক্ষণ আইন কার্যকর হওয়ায় সেই প্রক্রিয়া স্থগিত হয়ে যায়। ফলে ৩১ অগস্টের মধ্যে নিয়োগপ্রক্রিয়া শেষ করা সম্ভব হয়নি। পরে বিষয়টি ফের সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ায়। শেষ বার শীর্ষ আদালত নিয়োগপ্রক্রিয়া শেষ করার সময়সীমা বাড়িয়ে ২০২৭ সালের ৩১ মে পর্যন্ত করেছে।
তার পরেই সোমবার নতুন তালিকা প্রকাশ করল এসএসসি। কমিশনের তরফে অবশ্য জানানো হয়েছে, মোট শূন্যপদের সংখ্যায় কোনও পরিবর্তন হয়নি। মোট ১২,৪৪৫টি শূন্যপদই থাকছে। তবে ওবিসি সংরক্ষণ ১৭ শতাংশ থেকে কমে ৭ শতাংশ হওয়ায় বিভিন্ন বিষয়ের ক্ষেত্রে সংরক্ষিত ও সাধারণ শূন্যপদের বণ্টনে পরিবর্তন এসেছে। আর সেখানেই নতুন করে তৈরি হয়েছে জটিলতা।
প্রার্থীদের একাংশের প্রশ্ন, আগে লিখিত পরীক্ষা ও ইন্টারভিউয়ের নম্বরের ভিত্তিতে যে মেধাতালিকা তৈরি হয়েছিল এবং যার ভিত্তিতে কাউন্সেলিং করে সুপারিশপত্র দেওয়া হয়েছিল, নতুন সংরক্ষণ কাঠামো কার্যকর হওয়ার পরে সেই তালিকার কী হবে? তাঁদের বক্তব্য, নতুন আইনের ফলে মেধাতালিকার কাঠামোই বদলে যাচ্ছে। ফলে ইতিমধ্যে কাউন্সেলিং শেষ করে সুপারিশপত্র পাওয়া প্রার্থীদের নিয়োগও অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন খড়গপুর শ্রীকৃষ্ণপুর হাইস্কুলের কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশনের শিক্ষিকা সঙ্গীতা সাহা। চন্দ্রকোনার ডিগ্রি সোনাটোরিয়াম হাইস্কুলে নিয়োগের জন্য গত মার্চে এসএসসি-র কাছ থেকে সুপারিশপত্র পেয়েছিলেন তিনি। নতুন তালিকা প্রকাশের পর তাঁর বক্তব্য, পূর্বতন এবং বর্তমান— কোনও সরকারের কাছ থেকেই তাঁরা যথেষ্ট সহযোগিতা পাননি।
সঙ্গীতার কথায়, ২০১৬ সালে যে ওবিসি প্রার্থীরা নিয়ম মেনে চাকরি পেয়েছিলেন, তাঁদের অনেকেই নতুন পরিস্থিতিতে বাদ পড়তে পারেন। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গোটা নিয়োগপ্রক্রিয়া শেষ হবে কি না, তা নিয়েও তিনি সংশয় প্রকাশ করেছেন। তাঁর দাবি, কোনও অন্যায় না করেও দীর্ঘদিন ধরে তাঁদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।
তিনি আরও বলেন, এই দীর্ঘ অনিশ্চয়তার মধ্যে উৎকণ্ঠায় অনেক সহকর্মীকে হারিয়েছেন তাঁরা। তাঁর মতে, এই পরিস্থিতির দ্রুত অবসান হওয়া প্রয়োজন।
এখন এসএসসি-র নয়া তালিকা প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই নজর। এক দিকে আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি, অন্য দিকে রাস্তায় নেমে আন্দোলনের হুঁশিয়ারি— দুই পথেই সরব হচ্ছেন চাকরিপ্রার্থীদের একাংশ। ফলে দীর্ঘদিন ধরে জটিলতায় থাকা শিক্ষক নিয়োগপ্রক্রিয়া নতুন করে কোন দিকে মোড় নেয়, তা নিয়েই তৈরি হয়েছে আগ্রহ।