নিয়োগ দুর্নীতির তদন্তে গঠিত সিবিআইয়ের বিশেষ তদন্তকারী দল বা সিট ভেঙে দেওয়ার আর্জি জানিয়েছিল কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। তবে সেই আবেদনে মঙ্গলবার কোনও সিদ্ধান্ত নিল না কলকাতা হাই কোর্ট। বরং সিবিআইকে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হওয়ার পরামর্শ দিল আদালত। বিচারপতি অমৃতা সিংহের মন্তব্য, এই সংক্রান্ত মামলার শুনানির উপর যেহেতু শীর্ষ আদালতের স্থগিতাদেশ রয়েছে, তাই এই পরিস্থিতিতে হাই কোর্টের পক্ষে সিট ভেঙে দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়।
মঙ্গলবার মামলার শুনানিতে বিচারপতি অমৃতা সিংহ বলেন, ‘‘এই সংক্রান্ত মামলার শুনানির উপর সুপ্রিম কোর্টের স্থগিতাদেশ রয়েছে। এই অবস্থায় এই আদালত কী করবে? সিট ভাঙতে চেয়ে সিবিআই সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করুক।’’ অর্থাৎ, হাই কোর্টে করা আবেদনের মাধ্যমে আপাতত সিট ভেঙে দেওয়ার পথ খুলল না। এখন সিবিআই চাইলে শীর্ষ আদালতের কাছে গিয়ে নিজেদের বক্তব্য জানাতে পারে।
রাজ্যে শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী নিয়োগের পাশাপাশি পুরসভায় নিয়োগেও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। সেই সব অভিযোগের তদন্তভার পায় সিবিআই। তদন্তকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য ২০২২ সালে কলকাতা হাই কোর্টের তৎকালীন বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় সিবিআইকে বিশেষ তদন্তকারী দল বা সিট গঠনের নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেই নির্দেশের পর নির্দিষ্ট আধিকারিকদের নিয়ে গঠিত হয় সিট। দীর্ঘ সময় ধরে ওই দলই নিয়োগ দুর্নীতির একাধিক মামলার তদন্ত চালিয়ে আসছে।
তবে সময়ের সঙ্গে তদন্তকারী আধিকারিকদের দায়িত্ব এবং পদে পরিবর্তন এসেছে। সিবিআইয়ের দাবি, সিট গঠনের সময় যাঁরা ছিলেন, তাঁদের অনেকেই বর্তমানে অবসর নিয়েছেন। আবার কয়েক জন আধিকারিকের পদোন্নতি হয়েছে। ফলে তাঁদের এখনও সিটের দায়িত্বে রাখা হলে প্রশাসনিক এবং তদন্ত সংক্রান্ত কাজের ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হচ্ছে বলে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার বক্তব্য।
এই কারণেই সিট ভেঙে দেওয়ার আর্জি নিয়ে গত মাসে কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিল সিবিআই। আদালতে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার তরফে জানানো হয়েছিল, সিটের হাতে থাকা অধিকাংশ মামলার তদন্ত ইতিমধ্যেই শেষ হয়ে গিয়েছে। ফলে আগের মতো আলাদা করে বিশেষ তদন্তকারী দল রাখার প্রয়োজনীয়তা আর নেই। বাকি যে তদন্তগুলি রয়েছে, সেগুলি সিবিআইয়ের দুর্নীতিদমন শাখার আধিকারিকেরা সামলাতে পারবেন বলেই আদালতে দাবি করা হয়।
মঙ্গলবারও সিবিআইয়ের হয়ে আদালতে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল ধীরজ ত্রিবেদী। তিনি সিটের বর্তমান পরিস্থিতি এবং আধিকারিকদের নিয়ে তৈরি হওয়া সমস্যার কথা আদালতকে জানান। তাঁর বক্তব্য, গত প্রায় পাঁচ বছর ধরে সিট কাজ করে আসছে। এই সময়ের মধ্যে তদন্তকারী দলের বেশ কিছু আধিকারিক অবসর নিয়েছেন। আবার কয়েক জনের পদোন্নতিও হয়েছে। কিন্তু তাঁরা এখনও সিট থেকে আনুষ্ঠানিক ভাবে বেরোতে পারেননি। ফলে তাঁদের অন্য দায়িত্বও কিছু ক্ষেত্রে আটকে থাকছে বলে আদালতে জানান তিনি।
সিবিআইয়ের যুক্তি ছিল, তদন্তের বড় অংশ শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও পুরনো কাঠামোয় সিট চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। বাকি তদন্তগুলি সংশ্লিষ্ট শাখার মাধ্যমে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। তাই সিট ভেঙে দিয়ে আধিকারিকদের তাঁদের নিয়মিত দায়িত্বে ফেরানোর অনুমতি দেওয়া হোক— এমনই আবেদন জানানো হয়েছিল।
তবে মামলার বৃহত্তর আইনি প্রেক্ষাপটের দিকে নজর দেয় হাই কোর্ট। নিয়োগ দুর্নীতি সংক্রান্ত এই মামলাগুলির একাংশ নিয়ে ইতিমধ্যেই সুপ্রিম কোর্টে মামলা চলছে। সেই শুনানির উপর শীর্ষ আদালতের স্থগিতাদেশও রয়েছে। ফলে ওই অবস্থায় হাই কোর্ট সিট ভাঙার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিলে তা আইনি ভাবে জটিলতা তৈরি করতে পারে বলে আদালতের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে।
এই কারণেই সিবিআইকে সরাসরি সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে হাই কোর্ট। বিচারপতি অমৃতা সিংহ স্পষ্ট করে দেন, সিট ভাঙার প্রয়োজন রয়েছে বলে যদি সিবিআই মনে করে, তা হলে শীর্ষ আদালতের কাছেই সেই আবেদন জানানো যেতে পারে।
ফলে আপাতত কলকাতা হাই কোর্টে সিবিআইয়ের করা সিট ভাঙার আবেদনের কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হল না। নিয়োগ দুর্নীতির তদন্তে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা এই বিশেষ তদন্তকারী দল ভবিষ্যতে কী ভাবে কাজ করবে, সিটের আধিকারিকদের দায়িত্বে কী পরিবর্তন আসবে এবং বাকি তদন্ত কোন পথে এগোবে— সে বিষয়ে এখন নজর থাকবে সুপ্রিম কোর্টের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।