পচা উপকরণ, ড্রেনের পাশেই ফুটছে তেলের কড়াই! ডেকার্স লেন-শিয়ালদহের স্ট্রিট ফুড উচ্ছেদে এবার কড়া 'জিরো টলারেন্স'


কলকাতার স্ট্রিট ফুডের বিপুল চাহিদার পাশাপাশি ডালহৌসির অফিস পাড়া, ডেকার্স লেন এবং শিয়ালদহ স্টেশন চত্বরে খোলা আকাশের নীচে খাবার বিক্রির অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং ফুটপাত দখল নিয়ে বিতর্ক সাম্প্রতিক সময়ে তীব্র আকার ধারণ করেছে। ​কোথাও খোলা ড্রেনের পাশে তেল-ঝোল ফোটানো, পচা বা নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার, আবার কোথাও ফুটপাত স্থায়ীভাবে আটকে হাঁটাচলার পথ বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
প্রধান তিনটি অঞ্চলের বর্তমান পরিস্থিতি ও বিতর্ক
​১. ডেকার্স লেন 
​বিতর্কের কারণ: কলকাতার ঐতিহ্যের অংশ হওয়া সত্ত্বেও এখানে পলিথিন ঢাকা অস্থায়ী দোকান, ফুটপাতে প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলে রাখা, অস্বাস্থ্যকর উপায়ে থালা-বাসন ধোয়া এবং বাসি তেল ব্যবহারের অভিযোগ বারবার উঠেছে।  
​সমস্যা: সরু গলি হওয়ায় আগুনের কাছে রান্নার জন্য অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার অভাব এবং ড্রেনের পাশে খোলা খাবার ফেলে রাখা পরিবেশকে আরও ঘিঞ্জি করে তুলছে। 

২. বি.বি.ডি বাগ ও অফিস পাড়া
​বিতর্কের কারণ: চাকুরিজীবীদের জন্য সস্তা খাবারের চাহিদা মেটাতে গিয়ে ফুটপাত প্রায় পুরোপুরি বেহাত হয়ে গিয়েছে। বড় বড় গ্যাস সিলিন্ডার ও গ্যাসবোর্ডের কারণে সাধারণ পথচারীরা বাধ্য হয়ে মূল সড়কে নামছেন, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।  
​সমস্যা: জল সরবরাহের সঠিক ব্যবস্থা না থাকায় নোংরা বালতির জল বারবার ব্যবহার এবং খাবারের অবশিষ্টাংশ খোলা ড্রেনে ফেলার ফলে এলাকাটিতে দুর্গন্ধ ও মশার উপদ্রব বাড়ে।  

​৩. শিয়ালদহ স্টেশন ও উড়ালপুল চত্বর  
​বিতর্কের কারণ: স্টেশন ও ফ্লাইওভারের নীচের এলাকাটি শহরের অন্যতম ব্যস্ততম হাব হওয়ায় সেখানে কাঁচা মাছ-মাংস ও খোলা খাবারের দোকানের ভিড়ে পরিবেশ অত্যন্ত ঘিঞ্জি।  
​সমস্যা: রেল যাত্রী ও পথচারীদের হাঁটার জায়গা না থাকা, পচা সবজি ও কাটা ফলের উচ্ছিষ্ট রাস্তার ওপর জমিয়ে রাখা এবং ফ্লাইওভারের নীচে বেআইনি স্থায়ী কাঠামো গড়ে ওঠার সমস্যা তীব্র।  

​কলকাতা পুরসভা  ও রাজ্য প্রশাসনের পদক্ষেপ
​পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কলকাতা পুরসভা (KMC), রাজ্য নগরোন্নয়ন দফতর এবং কলকাতা পুলিস বেশ কিছু কঠোর ও সংস্কারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে--  

​স্থায়ী কাঠামো উচ্ছেদ ও হুইল-কার্ট বাধ্যতামূলক: ফুটপাত দখল করে গড়ে ওঠা বেআইনি স্থায়ী স্ট্রাকচার উচ্ছেদে পুরসভা কঠোর অবস্থান নিয়েছে। সম্প্রতি কলকাতা হাইকোর্টও স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছে যে স্ট্রিট ভেন্ডরদের সুরক্ষা নীতি স্থায়ী দখলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। হকারদের শুধু চাকা লাগানো বা সরাতে সক্ষম (Movable Carts) স্টল ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে।  

​নো-ভেন্ডিং জোন (No-Vending Zones) নির্ধারণ: শহরের প্রধান যানজটপূর্ণ মোড়, ফুটপাতের দুই-তৃতীয়াংশ অংশ এবং ফ্লাইওভারের নীচের স্পর্শকাতর এলাকাকে 'নো-ভেন্ডিং জোন' হিসেবে চিহ্নিত করে কড়াকড়ি শুরু হয়েছে।  

​মডেল ফুড স্ট্রিট ও ফুড সেফটি স্পেসিফিকেশন: পুরসভা নিউ মার্কেট, মিলেনিয়াম পার্ক ইত্যাদির মতো স্থানে আধুনিক ও স্বাস্থ্যকর 'স্মার্ট ফুড স্ট্রিট' গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে। যেখানে থাকবে নির্দিষ্ট জল সরবরাহ, বর্জ্য অপসারণ ব্যবস্থা ও উন্নত আলো।  

​FSSAI প্রশিক্ষণ ও সার্টিফাইড ভেন্ডিং: 'Town Vending Committee' (TVC)-র মাধ্যমে হকারদের তালিকাভুক্ত করার পাশাপাশি খাদ্য নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডস অথরিটি অফ ইন্ডিয়া (FSSAI)-এর মাধ্যমে স্ট্রিট ফুড বিক্রেতাদের গ্লাভস ব্যবহার, রান্নার জল পরীক্ষা এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে। ​

নিয়মিত ফুড সেফটি ইন্সপেকশন: পুরসভার স্বাস্থ্য দফতরের ইন্সপেক্টররা বিভিন্ন অফিস পাড়া ও ডেকার্স লেনের মতো স্পর্শকাতর স্থানে গিয়ে বাসি খাবার, কৃত্রিম রং এবং নিম্নমানের তেলের ব্যবহার শনাক্ত করতে আকস্মিক পরিদর্শন করছেন।

Post a Comment

Previous Post Next Post