স্ত্রী, সন্তানের খরচ জোগানো স্বামীর ‘পবিত্র কর্তব্য’, মনুস্মৃতির শ্লোক উদ্ধৃত করে বলল এলাহাবাদ হাই কোর্ট


# স্ত্রী, সন্তানের ভরণপোষণ স্বামীর ‘পবিত্র কর্তব্য’, মনুস্মৃতির শ্লোক উদ্ধৃত করে তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য এলাহাবাদ হাই কোর্টের

স্ত্রী এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের ভরণপোষণের দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারেন না কোনও স্বামী। তাঁদের জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় খরচ জোগানো প্রত্যেক স্বামীর ‘পবিত্র কর্তব্য’। একটি খোরপোশ সংক্রান্ত মামলার শুনানিতে এমনই তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করল এলাহাবাদ হাই কোর্ট। শুধু আধুনিক আইনের বাধ্যবাধকতার কথাই নয়, নিজের পর্যবেক্ষণের সমর্থনে প্রাচীন ধর্মীয় গ্রন্থ মনুস্মৃতির শ্লোকও উদ্ধৃত করেছেন বিচারপতি। আদালতের এই মন্তব্যকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

মামলাটি উত্তরপ্রদেশের বাসিন্দা পিঙ্কি বর্মার। স্বামীর কাছ থেকে ভরণপোষণ বা খোরপোশের অর্থ দাবি করে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন তিনি। সেই আবেদনের ভিত্তিতে কানপুর নগরের একটি পারিবারিক আদালত তাঁর প্রাপ্য খোরপোশের পরিমাণ নির্দিষ্ট করে দেয়। কিন্তু পারিবারিক আদালতের নির্ধারিত অর্থে সন্তুষ্ট ছিলেন না পিঙ্কি। তাঁর দাবি, বর্তমান পরিস্থিতিতে ওই পরিমাণ অর্থ যথেষ্ট নয়। তাই খোরপোশের পরিমাণ বৃদ্ধির আবেদন জানিয়ে শেষ পর্যন্ত এলাহাবাদ হাই কোর্টের দ্বারস্থ হন তিনি।

বিচারপতি প্রবীণকুমার গিরির বেঞ্চে মামলাটির শুনানি হয়। শুনানি চলাকালীন স্ত্রী ও অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের ভরণপোষণের দায়িত্ব নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করেন বিচারপতি। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল, পরিবারের আর্থিকভাবে নির্ভরশীল সদস্যদের জীবনধারণের দায়িত্ব কোনওভাবেই এড়িয়ে যেতে পারেন না পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। বিশেষ করে স্ত্রী ও নাবালক সন্তানদের প্রয়োজনীয় খরচ বহন করা স্বামীর দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে।

এই প্রসঙ্গেই মনুস্মৃতির একাদশ অধ্যায়ের ১০ নম্বর শ্লোক উদ্ধৃত করেন বিচারপতি। আদালতের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে, প্রাচীন ওই গ্রন্থেও আর্থিকভাবে দুর্বল স্ত্রী, অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তান এবং বয়স্ক বাবা-মায়ের ভরণপোষণের দায়িত্বের কথা উল্লেখ রয়েছে। পরিবারের এই সদস্যরা যদি নিজেদের জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ উপার্জনে অক্ষম হন, তবে তাঁদের দেখভাল করা একজন সামর্থ্যবান ব্যক্তির পবিত্র কর্তব্য।

আদালতের এই পর্যবেক্ষণ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছেন আইনজীবীদের একাংশ। কারণ, দাম্পত্য সম্পর্কের অবসান বা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিবাদ তৈরি হলেও ভরণপোষণের দায়িত্বের প্রশ্নটি আইনের চোখে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্ত্রী ও অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্যই খোরপোশ সংক্রান্ত আইনি বিধান রয়েছে। সেই দায়িত্ব পালনে স্বামীর গাফিলতি গ্রহণযোগ্য নয় বলেই আদালতের পর্যবেক্ষণে স্পষ্ট হয়েছে।

উল্লেখ্য, ভারতে স্ত্রী ও সন্তানদের ভরণপোষণের অধিকার আইনি স্বীকৃতি পেয়েছে। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে স্ত্রী, সন্তান এবং বাবা-মা আদালতের মাধ্যমে ভরণপোষণের অর্থ দাবি করতে পারেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আর্থিক সামর্থ্য, আবেদনকারীর প্রয়োজন এবং মামলার অন্যান্য পরিস্থিতি বিবেচনা করেই আদালত খোরপোশের পরিমাণ নির্ধারণ করে।

পিঙ্কি বর্মার মামলায় খোরপোশের পরিমাণ বাড়ানোর আবেদন ঘিরেই এই গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ সামনে এসেছে। তবে আদালতের এই মন্তব্যের পাশাপাশি মামলার চূড়ান্ত নির্দেশ কী হয়েছে, সেদিকেও নজর রয়েছে। সব মিলিয়ে স্ত্রী ও অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের ভরণপোষণ যে কেবল পারিবারিক দায়িত্ব নয়, আইনি বাধ্যবাধকতার বিষয়ও—এলাহাবাদ হাই কোর্টের পর্যবেক্ষণে সেই বার্তাই আরও একবার উঠে এল।

Post a Comment

Previous Post Next Post