সেপ্টেম্বরে আরও বাড়ল খুচরো মূল্যস্ফীতি! খাদ্যপণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতিতে চাপ সাধারণের পকেটে, জানাল সরকারি রিপোর্ট


সেপ্টেম্বরে আরও বাড়ল খুচরো মূল্যস্ফীতি! খাদ্যপণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতিতে চাপে সাধারণ মানুষ, এক মাসে ৪.৮৩% থেকে বেড়ে ৫.৫৪%

নিজস্ব প্রতিবেদন:

উৎসবের মরসুমে বাজারদরের ঊর্ধ্বগতিতে আরও চাপে পড়তে চলেছে সাধারণ মানুষের সংসার খরচ! খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশে ফের বাড়ল খুচরো মূল্যস্ফীতির হার। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের অগস্ট মাসে দেশে খুচরো মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৪.৮৩ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫.৫৪ শতাংশে। অর্থাৎ, মাত্র এক মাসের ব্যবধানে মূল্যস্ফীতির হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতিও। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে গিয়ে সাধারণ মানুষের পকেটে যে বাড়তি চাপ পড়ছে, তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

পরিসংখ্যান ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন মন্ত্রকের প্রকাশিত প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুসারে, সেপ্টেম্বরে দেশে খুচরো মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে ৫.৫৪ শতাংশে পৌঁছেছে। অন্যদিকে, খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে হয়েছে ৭.৭৪ শতাংশ। অর্থাৎ, সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির তুলনায় খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির হার অনেকটাই বেশি। বাজারে চাল, ডাল, শাকসবজি, ফলমূল-সহ বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রীর দাম বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ পরিবারের মাসিক বাজেটে। বিশেষ করে নির্দিষ্ট আয়ের উপর নির্ভরশীল পরিবারগুলির ক্ষেত্রে এই মূল্যবৃদ্ধি বড়সড় সমস্যা তৈরি করতে পারে।

জুলাইয়ে ৪.৪৫ শতাংশ, অগস্টে ৪.৮৩ শতাংশ, সেপ্টেম্বরে ৫.৫৪ শতাংশ

পরিসংখ্যানের দিকে নজর রাখলে দেখা যাচ্ছে, গত কয়েক মাসে খুচরো মূল্যস্ফীতির হার ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। চলতি বছরের জুলাই মাসে দেশে এই হার ছিল ৪.৪৫ শতাংশ। অগস্টে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪.৮৩ শতাংশে। আর সেপ্টেম্বরে সেই হার আরও বেড়ে পৌঁছেছে ৫.৫৪ শতাংশে। অর্থাৎ, জুলাই মাসের তুলনায় সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতির হার এক শতাংশেরও বেশি বেড়েছে।

অগস্টের তুলনায় সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতির এই বৃদ্ধি অর্থনীতির ক্ষেত্রে নতুন করে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। কারণ, মূল্যস্ফীতি বাড়ার অর্থ হল, আগের তুলনায় একই পরিমাণ পণ্য বা পরিষেবা কিনতে সাধারণ মানুষকে বেশি টাকা খরচ করতে হতে পারে। যদিও সমস্ত পণ্যের দাম একই হারে বাড়ে না, তবুও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বৃদ্ধি পেলে তার প্রভাব সরাসরি অনুভব করেন ক্রেতারা।

খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধিই কি মূল উদ্বেগ?

সেপ্টেম্বরের পরিসংখ্যানে সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি। সরকারি রিপোর্ট অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে হয়েছে ৭.৭৪ শতাংশ। অর্থাৎ, খাদ্যসামগ্রীর দাম বৃদ্ধির চাপ সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির উপরেও প্রভাব ফেলছে।

সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে খাদ্যপণ্যের গুরুত্ব অপরিসীম। প্রতিদিনের বাজারে চাল, ডাল, তেল, শাকসবজি, ফলমূল-সহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনতে হয়। এই পণ্যগুলির দাম বাড়লে মাসের শুরুতে তৈরি করা সংসারের বাজেটও অনেক সময় বদলাতে বাধ্য হন পরিবারের সদস্যরা। কম আয়ের পরিবারগুলির ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। কারণ, তাঁদের আয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশই খাবার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস কেনার পিছনে ব্যয় হয়।

খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি দীর্ঘ সময় ধরে বেশি থাকলে পরিবারের অন্যান্য খরচ সামলাতেও সমস্যা তৈরি হতে পারে। বাজার খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণে শিক্ষা, যাতায়াত, চিকিৎসা কিংবা অন্যান্য প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ব্যয়ের পরিকল্পনাও নতুন করে সাজাতে হতে পারে। তাই খাদ্যপণ্যের দামের গতিপ্রকৃতির উপর বিশেষ নজর রাখছেন অর্থনীতির পর্যবেক্ষকেরা।

আমদানি খরচ ও বাজারদরের প্রভাব

অগস্ট মাসে আমদানি খরচ বৃদ্ধির বিষয়টিও মূল্যস্ফীতির আলোচনায় উঠে এসেছিল। আমদানি করা পণ্য বা কাঁচামালের খরচ বাড়লে উৎপাদন ও পরিবহণের ব্যয়েও তার প্রভাব পড়তে পারে। সেই বাড়তি খরচের কিছুটা শেষ পর্যন্ত পণ্যের বিক্রয়মূল্যে যুক্ত হলে ক্রেতাদের বেশি টাকা খরচ করতে হয়। তবে সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতির বৃদ্ধির পিছনে বিভিন্ন পণ্যের দাম, সরবরাহ পরিস্থিতি এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক কারণের ভূমিকা কতটা, তা নির্দিষ্টভাবে বুঝতে বিস্তারিত পরিসংখ্যানের প্রয়োজন।

বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে আবহাওয়া, উৎপাদন, বাজারে সরবরাহ এবং পরিবহণের খরচ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। কোনও পণ্যের সরবরাহ কমে গেলে বা চাহিদার তুলনায় বাজারে পণ্যের জোগান কম থাকলে তার দাম বাড়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাজারে নিয়মিত সরবরাহ বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সাধারণ মানুষের সংসার খরচে বাড়তি চাপ

মূল্যস্ফীতির এই পরিসংখ্যান সামনে আসার পর সাধারণ মানুষের উদ্বেগের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে দৈনন্দিন খরচের হিসাব। মাসিক আয় একই থাকলেও বাজারদর বেড়ে গেলে সংসার চালাতে অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হয়। ফলে অনেক পরিবারকেই খরচের ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হতে হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মূল্যস্ফীতির হার বিচার করার সময় শুধু সামগ্রিক পরিসংখ্যানের দিকে তাকালেই হবে না, খাদ্যপণ্যের দাম কীভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সঙ্গে যুক্ত। নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর দাম দীর্ঘ সময় ধরে বেশি থাকলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার উপরেও চাপ তৈরি হতে পারে।

তবে মূল্যস্ফীতির হার বৃদ্ধি মানেই সব পণ্যের দাম সমান হারে বেড়েছে, এমনটা নয়। বিভিন্ন পণ্য ও পরিষেবার মূল্য পরিবর্তনের ভিত্তিতেই সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির হিসাব তৈরি হয়। তাই কোন কোন পণ্যের দাম সবচেয়ে বেশি বেড়েছে, তা জানতে বিস্তারিত সরকারি তথ্য বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

আগামী দিনে কোন দিকে যাবে মূল্যস্ফীতি?

সেপ্টেম্বরে খুচরো মূল্যস্ফীতির হার ৫.৫৪ শতাংশে পৌঁছনোয় আগামী মাসগুলিতে পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, সেদিকে নজর থাকবে অর্থনীতির পর্যবেক্ষকদের। বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের দাম কমে কি না, বাজারে সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হয় কি না এবং অন্যান্য পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে থাকে কি না, তার উপর পরবর্তী পরিসংখ্যান অনেকটাই নির্ভর করবে।

সব মিলিয়ে, জুলাইয়ের ৪.৪৫ শতাংশ থেকে অগস্টে ৪.৮৩ শতাংশ এবং সেপ্টেম্বরে ৫.৫৪ শতাংশে পৌঁছনো খুচরো মূল্যস্ফীতির হার নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি ৭.৭৪ শতাংশে পৌঁছনোয় সাধারণ মানুষের সংসার খরচের উপর চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এখন দেখার, আগামী মাসগুলিতে খাদ্যপণ্যের বাজারদরে স্বস্তি ফেরে কি না এবং মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণে আসে কি না।

Post a Comment

Previous Post Next Post