সম্মতির সম্পর্কে ধর্ষণের অভিযোগ! সুপ্রিম কোর্টের প্রশ্ন, পুরুষের কি ব্রেক আপের অধিকার নেই?


# সম্মতির সম্পর্কে ধর্ষণের অভিযোগ! সুপ্রিম কোর্টের প্রশ্ন, সম্পর্ক ভাঙার অধিকার কি পুরুষের নেই? ‘উদ্বেগজনক প্রবণতা’ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ

বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সহবাস, পরে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া কিংবা বিয়ে না করায় ধর্ষণের অভিযোগ—সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এমন একাধিক মামলা সামনে এসেছে। এবার এই ধরনের অভিযোগ ঘিরেই গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করল সুপ্রিম কোর্ট। পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে তৈরি হওয়া কোনও সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর সেটিকে ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়নের অভিযোগে পরিণত করার প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে দেশের শীর্ষ আদালত। একই সঙ্গে আদালতের প্রশ্ন, কোনও সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার বা বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কি একজন পুরুষের নেই? শুধুমাত্র সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া কিংবা বিয়ে না করার সিদ্ধান্তের কারণে কি তাঁর বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা দায়ের করা যেতে পারে?

সম্প্রতি এক যুবকের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া ধর্ষণের মামলার শুনানি চলছিল সুপ্রিম কোর্টে। সেই মামলার শুনানিতেই বিচারপতি বিভি নাগরত্ন এবং বিচারপতি আর মহাদেবনের ডিভিশন বেঞ্চ এই গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করে। আদালতের মতে, সম্মতির ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সম্পর্ক পরবর্তীকালে ভেঙে গেলে কিছু ক্ষেত্রে অতীতের ঘটনাগুলিকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এমন কিছু বিষয় খোঁজা হচ্ছে, যার ভিত্তিতে পরবর্তীকালে সেই সম্পর্ককে যৌন নিপীড়ন বা হিংসার ঘটনা হিসেবে তুলে ধরা যায়। এই প্রবণতা যথেষ্ট উদ্বেগজনক বলেই মনে করছে শীর্ষ আদালত।

শুনানিতে বিচারপতিরা বলেন, “আমরা একটা ভয়ঙ্কর ও উদ্বেগজনক প্রবণতার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। অনেক সময় দেখা যাচ্ছে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সম্পর্ক শেষ হয়ে যাওয়ার পর, সেগুলিকে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে পুনরায় পর্যালোচনা করা হচ্ছে। উদ্দেশ্য হচ্ছে, এমন কিছু খুঁজে বের করা, যা পরবর্তীকালে হিংসা বা যৌন নিপীড়ন হিসেবে গণ্য হতে পারে।” আদালতের এই পর্যবেক্ষণকে ঘিরে নতুন করে আইনি ও সামাজিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।

**সম্পর্ক ভাঙলেই কি ধর্ষণের মামলা?**

সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণের কেন্দ্রে রয়েছে সম্মতি এবং বিয়ের প্রতিশ্রুতির মধ্যে আইনি পার্থক্য। অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ ওঠে, কোনও যুবক বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে এক তরুণীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন। পরে বিয়ে করতে অস্বীকার করায় তাঁর বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা দায়ের করা হয়েছে। কিন্তু আদালতের সামনে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল, শুরু থেকেই যদি দু'জনের মধ্যে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে সম্পর্ক তৈরি হয়ে থাকে, তাহলে পরবর্তী সময়ে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া বা বিয়ে না করার সিদ্ধান্তকে কীভাবে ধর্ষণের অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত করা হবে?

আইনের দৃষ্টিতে এই দুই পরিস্থিতির মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। কোনও ব্যক্তি যদি শুরু থেকেই বিয়ের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে অপর পক্ষের সম্মতি আদায় করেন এবং সেই প্রতিশ্রুতি প্রতারণার উদ্দেশ্যেই দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টি একভাবে বিবেচিত হতে পারে। অন্যদিকে, কোনও সম্পর্কের শুরুতে বিয়ের ইচ্ছা থাকলেও পরবর্তীকালে পরিস্থিতি বদলে গেলে বা সম্পর্ক ভেঙে গেলে সেটিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ধর্ষণ বলে গণ্য করা যায় না। প্রতিটি মামলার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতি, প্রমাণ এবং সম্মতির প্রকৃতি খতিয়ে দেখা জরুরি।

**ভুয়ো অভিযোগ নিয়ে উদ্বেগ আদালতের**

শীর্ষ আদালতের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, সম্মতির ভিত্তিতে তৈরি হওয়া সম্পর্কের পরিণতি খারাপ হলে কিছু ক্ষেত্রে ফৌজদারি আইনের আশ্রয় নেওয়া হচ্ছে। সম্পর্কের মধ্যে মতবিরোধ, বিচ্ছেদ কিংবা বিয়েকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া সমস্যাকে ধর্ষণের অভিযোগের রূপ দেওয়া হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। আদালতের বক্তব্যের তাৎপর্য এখানেই। কারণ, ধর্ষণের মতো গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে যেমন অভিযোগকারীর বক্তব্য ও নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিতে হবে, তেমনই অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা যাচাই করাও বিচারব্যবস্থার দায়িত্ব।

তবে আদালতের এই পর্যবেক্ষণের অর্থ কখনওই এই নয় যে বিয়ের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে যৌন সম্পর্কে জড়ানোর অভিযোগ গুরুত্বহীন। কোনও সম্পর্কের ক্ষেত্রে সম্মতি আদৌ স্বাধীনভাবে দেওয়া হয়েছিল কি না, শুরু থেকেই প্রতারণার উদ্দেশ্য ছিল কি না এবং সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতিতে অপরাধের উপাদান রয়েছে কি না, তা বিচার করেই সিদ্ধান্তে পৌঁছতে হবে।

সব মিলিয়ে, সম্মতির সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর ধর্ষণের অভিযোগ দায়েরের প্রবণতা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের এই পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ব্যক্তিগত সম্পর্ক, সম্মতি, প্রতিশ্রুতি এবং ফৌজদারি আইনের সীমারেখা কোথায়—তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। আদালতের এই মন্তব্য আগামী দিনে একই ধরনের মামলার বিচারপ্রক্রিয়ায় কতটা প্রভাব ফেলে, এখন সেদিকেই নজর আইনজীবী মহলের।

Post a Comment

Previous Post Next Post