# ‘বিচার বিভাগকে ভয় দেখানো যাবে না’, সুপ্রিম কোর্টের দিকে মিছিল! রাহুল গান্ধী ও অখিলেশকে নোটিস প্রধান বিচারপতির বেঞ্চের
সুপ্রিম কোর্টের দিকে মিছিল করে যাওয়ার ঘটনায় এ বার কড়া অবস্থান নিল দেশের শীর্ষ আদালত। লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী এবং সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদবকে নোটিস পাঠাল সুপ্রিম কোর্ট। ওই দিনের কর্মকাণ্ডের ব্যাখ্যা চেয়ে তাঁদের জবাব তলব করেছে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের বেঞ্চ। আদালতের পর্যবেক্ষণ, বিচার বিভাগকে কোনও ভাবেই ভয় দেখানো বা চাপের মুখে ফেলার চেষ্টা বরদাস্ত করা হবে না। প্রধান বিচারপতির স্পষ্ট মন্তব্য, “বিচার বিভাগকে কেউ ভয় দেখাতে পারে না।” এই ঘটনায় রাজনৈতিক মহলে নতুন করে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিরোধীদের আন্দোলন, এসআইআর নিয়ে অভিযোগ এবং বিচার বিভাগের ভূমিকা—সব মিলিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে বিতর্ক আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সূত্রের খবর অনুযায়ী, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’ ধারাবাহিক আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। নির্বাচন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর নিয়ে বিরোধীদের একাধিক অভিযোগ রয়েছে। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই রাজনৈতিক ও আইনি স্তরে চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করছে বিরোধী শিবির। এরই মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের দিকে মিছিল করে যাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাহুল গান্ধী ও অখিলেশ যাদবের বিরুদ্ধে আদালতের এই পদক্ষেপ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
## প্রধান বিচারপতির সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলেন রাহুলেরা
ঘটনার সূত্রপাত গত সোমবার। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফার দাবিতে আন্দোলন চালানোর পাশাপাশি নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে নিজেদের অভিযোগ দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব এবং বিচার বিভাগের সামনে তুলে ধরতে চাইছিল বিরোধী জোট। সেই উদ্দেশ্যেই প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের সঙ্গে দেখা করার জন্য সময় চেয়েছিলেন রাহুল গান্ধী-সহ বিরোধী নেতারা।
কিন্তু তাঁদের সেই আবেদন গ্রহণ করেননি প্রধান বিচারপতি। কেন ওই সময়ে তাঁদের সঙ্গে দেখা করা সম্ভব নয়, সে বিষয়ে রাহুল গান্ধী এবং কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গেকে চিঠি পাঠিয়ে নিজের অবস্থানও জানিয়েছিলেন তিনি। ফলে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাতের মাধ্যমে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরার যে পরিকল্পনা বিরোধীদের ছিল, তা সফল হয়নি।
এর পরেই পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয়। প্রধান বিচারপতির সঙ্গে দেখা করার অনুমতি না পাওয়ার পর ওই দিনই মিছিল করে সুপ্রিম কোর্টের দিকে এগিয়ে যান রাহুল গান্ধী-সহ বিরোধী নেতারা। তাঁদের অভিযোগ ছিল, এসআইআর প্রক্রিয়ায় অনিয়ম হচ্ছে। সেই সংক্রান্ত বিষয় আদালতের নজরে আনতেই তাঁরা সুপ্রিম কোর্টে যান এবং মামলা দায়ের করেন বলে জানা গিয়েছে।
তবে আদালতের দিকে মিছিল করে যাওয়া এবং বিচার বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা নিয়েই এ বার প্রশ্ন উঠেছে। ওই দিনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে আদালত রাহুল ও অখিলেশের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়ায় বিষয়টি নতুন করে আইনি গুরুত্ব পেয়েছে।
## ‘বিচার বিভাগকে কেউ ভয় দেখাতে পারে না’
এই ঘটনায় প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের মন্তব্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর বক্তব্য, বিচার বিভাগকে ভয় দেখানো যায় না। অর্থাৎ, কোনও রাজনৈতিক দল বা নেতা নিজেদের দাবি প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে আদালতের উপর চাপ সৃষ্টি করতে পারেন না—এই বার্তাই দিতে চেয়েছে শীর্ষ আদালত বলে মনে করা হচ্ছে।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক দলগুলির আন্দোলন, প্রতিবাদ এবং সরকারের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করার অধিকার রয়েছে। কিন্তু সেই প্রতিবাদের পদ্ধতি নিয়ে আইনি প্রশ্ন উঠলে তার ব্যাখ্যা দেওয়ার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট পক্ষের উপর বর্তায়। বিশেষ করে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং আদালতের মর্যাদা রক্ষার প্রশ্নে সুপ্রিম কোর্ট যে আপসহীন অবস্থান নিতে চাইছে, প্রধান বিচারপতির মন্তব্যে সেই ইঙ্গিত রয়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকদের একাংশ।
তবে নোটিস পাঠানো মানেই সংশ্লিষ্ট নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়ে গিয়েছে, এমন নয়। আদালত তাঁদের বক্তব্য শুনে এবং প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলি বিবেচনা করেই পরবর্তী পদক্ষেপ করবে। ফলে রাহুল গান্ধী ও অখিলেশ যাদব আদালতে কী ব্যাখ্যা দেন, সে দিকেই এখন নজর রয়েছে।
## রাহুলের পাশাপাশি নোটিস অখিলেশকেও
এই ঘটনায় শুধু রাহুল গান্ধী নন, সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদবকেও নোটিস পাঠিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। বিরোধী জোটের দুই গুরুত্বপূর্ণ নেতার কাছে একই ঘটনায় জবাব চাওয়াকে রাজনৈতিক ভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
রাহুল গান্ধী বর্তমানে লোকসভার বিরোধী দলনেতা। অন্য দিকে, অখিলেশ যাদব উত্তরপ্রদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ মুখ এবং বিরোধী শিবিরের অন্যতম প্রধান নেতা। ফলে তাঁদের বিরুদ্ধে আদালতের এই পদক্ষেপ জাতীয় রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠতে পারে।
মামলার পরবর্তী শুনানির দিনই তাঁদের এই বিষয়ে ব্যাখ্যা জানাতে বলা হয়েছে। ওই দিনের ঘটনাক্রম, সুপ্রিম কোর্টের দিকে মিছিল করে যাওয়ার কারণ এবং আদালতের সঙ্গে যোগাযোগের পদ্ধতি নিয়ে তাঁদের বক্তব্য কী হয়, তা গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে। আদালত তাঁদের জবাব খতিয়ে দেখার পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে।
## এসআইআর নিয়ে বিরোধীদের আন্দোলন অব্যাহত
অন্য দিকে, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র আন্দোলনও থেমে নেই। নির্বাচন কমিশনের কাজকর্ম এবং ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে বিরোধীদের একাধিক অভিযোগ রয়েছে। তাঁদের দাবি, নির্বাচন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং ভোটারদের অধিকার সুরক্ষিত করা জরুরি।
এই দাবিগুলি সামনে রেখেই বিরোধী নেতারা ধারাবাহিক ভাবে প্রতিবাদ কর্মসূচি চালাচ্ছেন। ইতিমধ্যে বিরোধী জোটের প্রতিনিধিদল রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে দেখা করে নিজেদের বক্তব্য জানিয়েছে। অর্থাৎ, নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে বিরোধীরা রাজনৈতিক স্তরে যেমন সরব, তেমনই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলির কাছেও বিষয়টি তুলে ধরার চেষ্টা করছেন।
তবে এই আন্দোলনের মধ্যেই সুপ্রিম কোর্টের দিকে মিছিল করে যাওয়ার ঘটনা বিরোধীদের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিচার চাওয়ার পাশাপাশি আদালতের নির্ধারিত নিয়ম ও মর্যাদা বজায় রাখার বিষয়টিও এখন আলোচনায় উঠে এসেছে।
## রাজনৈতিক আন্দোলন বনাম বিচার বিভাগের মর্যাদা
ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোয় নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ এবং রাজনৈতিক দলগুলির নিজস্ব ভূমিকা রয়েছে। নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে অভিযোগ থাকলে রাজনৈতিক দলগুলি আইনি পথেও তার প্রতিকার চাইতে পারে। কিন্তু বিচার বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগের পদ্ধতি এবং আদালতের নির্দেশ মেনে চলার প্রশ্নে কোনও ব্যত্যয় ঘটেছে কি না, তা আদালতই বিচার করবে।
রাহুল গান্ধী ও অখিলেশ যাদবকে নোটিস পাঠানোর মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্ট যে তাঁদের বক্তব্য জানতে চাইছে, তা স্পষ্ট। প্রধান বিচারপতির মন্তব্যও বুঝিয়ে দিয়েছে, আদালতের স্বাধীনতা এবং মর্যাদার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই মামলার চূড়ান্ত ফল কী হবে, তা নির্ভর করবে শুনানিতে উঠে আসা তথ্য ও সংশ্লিষ্ট নেতাদের ব্যাখ্যার উপর।
সব মিলিয়ে, এসআইআর নিয়ে বিরোধীদের আন্দোলন এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবির আবহে সুপ্রিম কোর্টের এই পদক্ষেপ জাতীয় রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করল। এক দিকে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিরোধীদের অভিযোগ, অন্য দিকে বিচার বিভাগের মর্যাদা রক্ষায় শীর্ষ আদালতের কড়া বার্তা—দুইয়ের মধ্যে সংঘাতের আবহ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এখন দেখার, পরবর্তী শুনানিতে রাহুল গান্ধী ও অখিলেশ যাদব কী ব্যাখ্যা দেন এবং সেই ব্যাখ্যার ভিত্তিতে সুপ্রিম কোর্ট কী সিদ্ধান্ত নেয়।