এই প্রথম বার সন্ধান মিলল সবুজ নক্ষত্রের! তা-ও আমাদের ছায়াপথেই, আয়ু প্রায় শেষ হয়ে যাওয়া তারায় কেন এমন রঙের খেলা?


# এই প্রথম সন্ধান মিলল সবুজ নক্ষত্রের! তাও আবার আমাদের ছায়াপথেই, আয়ুর শেষ পর্যায়ে তারার এমন রঙের রহস্য কী?

মহাকাশের বিস্তীর্ণ অন্ধকারে অসংখ্য নক্ষত্রের বাস। পৃথিবী থেকে রাতের আকাশে তাকালে কখনও উজ্জ্বল সাদা, কখনও নীলচে, আবার কখনও কমলা বা লালচে আভায় জ্বলতে দেখা যায় তাদের। নক্ষত্রের এই রং মূলত তার পৃষ্ঠের তাপমাত্রা ও নির্গত আলোর বৈশিষ্ট্যের উপর নির্ভর করে। কিন্তু কোনও নক্ষত্রকে কি সবুজ রঙের দেখাতে পারে প্রকৃতি? এত দিন এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই হিমশিম খেতে হয়েছে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের। এ বার সেই রহস্যেরই নতুন দিক সামনে এল। গবেষকদের দাবি, আমাদের নিজস্ব ছায়াপথেই এমন এক নক্ষত্রের সন্ধান মিলেছে, যার আলোয় রয়েছে অস্বাভাবিক সবুজ আভা। আর এই আবিষ্কার ঘিরেই মহাকাশবিজ্ঞানের জগতে শুরু হয়েছে নতুন কৌতূহল।

**১৫১টি বামন নক্ষত্রের মধ্যে মিলল ব্যতিক্রমী সন্ধান**

ব্রিটেনের ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্পদার্থবিদ মার্ক হল্যান্ডসের নেতৃত্বে এই গবেষণা চালানো হয়। গবেষণার প্রাথমিক পর্যায়ে মোট ১৫১টি বামন নক্ষত্রের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করেন বিজ্ঞানীরা। সেই বিশ্লেষণের মধ্যেই একটি নক্ষত্রের ক্ষেত্রে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য নজরে আসে, যা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলেছে। গবেষকদের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে সবুজ আভা-সংক্রান্ত এই অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। সম্প্রতি ‘রাস টেকনিক্‌স অ্যান্ড ইনস্ট্রুমেন্টস’ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে তাঁদের গবেষণাপত্র।

তবে এই আবিষ্কারকে ঘিরে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। কারণ, নক্ষত্রের আলো, তার বর্ণালি এবং পৃথিবী থেকে পর্যবেক্ষণের সময় বিভিন্ন প্রভাবের কারণে কোনও মহাজাগতিক বস্তুর রং সম্পর্কে ধারণা তৈরি হতে পারে। তাই নক্ষত্রটি ঠিক কী কারণে সবুজ আভা দেখাচ্ছে, তা নিশ্চিত ভাবে বুঝতে হলে তার আলোর বৈশিষ্ট্য ও রাসায়নিক গঠন আরও বিস্তারিত ভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে।

**নক্ষত্রের রং কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?**

সাধারণত নক্ষত্রের রং তার পৃষ্ঠের তাপমাত্রা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়। তুলনামূলক ঠান্ডা নক্ষত্রকে লালচে বা কমলা রঙের দেখায়। অন্য দিকে, বেশি তাপমাত্রার নক্ষত্র নীলচে বা সাদা আভা ছড়ায়। কিন্তু সবুজ রঙের নক্ষত্রের বিষয়টি এত সহজ নয়। দৃশ্যমান আলোর বর্ণালিতে সবুজ রং থাকলেও, নক্ষত্রের নির্গত আলোকে সামগ্রিক ভাবে মানুষের চোখে সবুজ দেখানো বেশ অস্বাভাবিক।

এর একটি কারণ হল, নক্ষত্র সাধারণত দৃশ্যমান আলোর বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের মিশ্রণ নির্গত করে। সেই আলোগুলি একসঙ্গে আমাদের চোখে পৌঁছলে নক্ষত্রকে অনেক সময় সাদা বা সাদা-হলদে দেখায়। ফলে কোনও নক্ষত্রের আলোতে সবুজ তরঙ্গদৈর্ঘ্য থাকলেই তাকে সবুজ দেখাবে, এমন নয়। এই কারণেই সবুজ নক্ষত্রের সন্ধান নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে এত আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

**আয়ুর শেষ পর্যায়ে নক্ষত্র, কীসের ইঙ্গিত দিচ্ছে এই রং?**

গবেষণায় উঠে আসা নক্ষত্রটির বিবর্তনের পর্যায় নিয়েও আগ্রহ তৈরি হয়েছে। কোনও নক্ষত্রের জীবনের শেষ পর্যায়ে তার অভ্যন্তরীণ গঠন, তাপমাত্রা এবং বাইরের স্তরে নানা পরিবর্তন ঘটতে পারে। নক্ষত্রের ভর ও প্রকৃতির উপর নির্ভর করে এই পরিবর্তনের ধরনও আলাদা হয়। সেই সব পরিবর্তন তার আলো ও বর্ণালিতে বিশেষ ছাপ ফেলতে পারে।

তবে নক্ষত্রটির সবুজ আভা যে সরাসরি তার আয়ুর শেষ পর্যায়ের কারণেই তৈরি হয়েছে, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। এর নেপথ্যে ঠিক কোন ভৌত প্রক্রিয়া কাজ করছে, তা জানতে আরও পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ প্রয়োজন। বিজ্ঞানীদের কাছে তাই এই আবিষ্কার শুধু একটি অস্বাভাবিক রঙের নক্ষত্র খুঁজে পাওয়ার ঘটনা নয়, বরং নক্ষত্রের বিবর্তন ও আলোর বৈশিষ্ট্য বোঝার ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার বিষয়।

**ছায়াপথে কি আরও রয়েছে এমন সবুজ নক্ষত্র?**

গবেষকদলের অনুমান, মহাকাশে এমন বৈশিষ্ট্যের আরও নক্ষত্র থাকতে পারে। প্রাথমিক পর্যায়ে মাত্র ১৫১টি বামন নক্ষত্র বিশ্লেষণ করে এই ব্যতিক্রমী সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। তাই পর্যবেক্ষণের পরিধি বাড়ালে ভবিষ্যতে আরও অজানা নক্ষত্রের খোঁজ মিলতে পারে বলে মনে করছেন তাঁরা।

আমাদের ছায়াপথেই রয়েছে কোটি কোটি নক্ষত্র, যাদের প্রত্যেকের গঠন, বয়স ও বিবর্তনের ইতিহাস এক নয়। আধুনিক টেলিস্কোপ ও উন্নত পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তির সাহায্যে বিজ্ঞানীরা প্রতিনিয়ত সেই অজানা জগতের নতুন নতুন তথ্য সামনে আনছেন। সবুজ আভার এই নক্ষত্রের সন্ধানও সেই অনুসন্ধানকে আরও এক ধাপ এগিয়ে দিতে পারে।

তবে এই আবিষ্কারের ক্ষেত্রে একটি বিষয় মাথায় রাখা জরুরি—নক্ষত্রটিকে সত্যিই দৃশ্যমান সবুজ রঙের দেখায় কি না, নাকি তার আলোর বর্ণালিতে বিশেষ কোনও সবুজ বৈশিষ্ট্য ধরা পড়েছে, তা গবেষণার বিস্তারিত তথ্যের ভিত্তিতে নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সেই উত্তরই আগামী দিনে এই অস্বাভাবিক নক্ষত্রের রহস্য উন্মোচনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

Post a Comment

Previous Post Next Post