নিচের খবরটি সংবাদপত্রের উপযোগী করে বিস্তারিত প্রতিবেদনের আকারে সাজিয়ে দিলাম। তবে এখানে ইডির অভিযোগ, অভিযুক্তের বক্তব্য এবং রাজনৈতিক নেতাদের মন্তব্যকে পৃথকভাবে উল্লেখ করা জরুরি, যাতে অভিযোগকে প্রমাণিত তথ্য হিসেবে তুলে ধরা না হয়।
# মমতার অ্যাকাউন্টে ৩০ লক্ষ টাকা পাঠিয়েছিল ইন্দ্রনীলের সংস্থা! কীসের টাকা, তদন্তে কী তথ্য পেয়েছিল ইডি?
**দুর্গাপুজোর ‘ডোনার পাস’ বিক্রিকে ঘিরে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে গ্রেফতার প্রাক্তন মন্ত্রী তথা গায়ক ইন্দ্রনীল সেন। তাঁর সংস্থা ‘অকটেভ রেকর্ডস’-এর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অ্যাকাউন্টে প্রায় ৩০ লক্ষ টাকা স্থানান্তরিত হয়েছিল বলে দাবি এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের (ইডি)। ওই টাকা ‘রয়্যালটি’ বাবদ দেওয়া হয়েছিল বলে তদন্তকারীদের জানিয়েছেন ইন্দ্রনীল। কিন্তু কীসের রয়্যালটি, সেই প্রশ্ন ঘিরেই শুরু হয়েছে জল্পনা। অন্যদিকে, ইন্দ্রনীলের গ্রেফতারির পর এই ঘটনায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।**
দুর্গাপুজোর নামে পাস বিক্রি করে বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ, সেই অর্থের লেনদেন এবং একাধিক ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকার গতিবিধি—সব মিলিয়ে প্রাক্তন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেনকে ঘিরে তদন্তে নতুন করে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার দাবি, ইন্দ্রনীল সেনের সঙ্গে যুক্ত সংস্থার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে কোটি কোটি টাকা জমা পড়েছিল। সেই অ্যাকাউন্ট থেকেই প্রায় ৩০ লক্ষ টাকা পৌঁছেছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অ্যাকাউন্টে। যদিও ওই লেনদেনকে অপরাধমূলক বলে চিহ্নিত করেনি ইডি। সংস্থার দাবি, ইন্দ্রনীল ওই অর্থকে রয়্যালটি বাবদ প্রাপ্য টাকা বলে ব্যাখ্যা করেছেন।
## কীসের টাকা নিয়ে প্রশ্ন?
ইডির তদন্তে উঠে এসেছে, ইন্দ্রনীল সেনের মালিকানাধীন ‘মেসার্স অকটেভ রেকর্ডস’-এর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ৩ কোটি ৮০ লক্ষ টাকারও বেশি জমা পড়েছিল। তদন্তকারী সংস্থার দাবি, ওই অ্যাকাউন্ট থেকে প্রায় ৩০ লক্ষ টাকা ব্যাঙ্কিং চ্যানেলের মাধ্যমে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অ্যাকাউন্টে স্থানান্তরিত হয়।
এই লেনদেনের বিষয়ে ইন্দ্রনীল সেনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি জানান, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেওয়া ওই অর্থ ছিল ‘রয়্যালটি’। সাধারণত কোনও গান, সুর, লেখা বা সৃজনশীল কাজের স্বত্ব ব্যবহার করে আয় হলে তার বিনিময়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে যে অর্থ দেওয়া হয়, তাকে রয়্যালটি বলা হয়।
তবে এই ক্ষেত্রে ঠিক কোন গান, লেখা বা সৃজনশীল কাজের জন্য ওই টাকা দেওয়া হয়েছিল, তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে ৩০ লক্ষ টাকার লেনদেনের প্রকৃতি, তার নথিপত্র এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক হিসাব খতিয়ে দেখার বিষয়টি তদন্তের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
উল্লেখ্য, ইডির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এই লেনদেনের উল্লেখ থাকলেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ওই অর্থ কোনও বেআইনি কাজে ব্যবহার করেছেন বা অপরাধমূলক অর্থ জেনেশুনে গ্রহণ করেছেন—এমন অভিযোগ ওই বিবৃতিতে প্রতিষ্ঠিত করা হয়নি। তাই শুধু টাকা স্থানান্তরের তথ্যের ভিত্তিতে কোনও অপরাধের সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না।
## কীভাবে সামনে এল দুর্গাপুজোর পাস বিক্রির অভিযোগ?
এই ঘটনার সূত্রপাত দুর্গাপুজোর ‘প্রিভিউ শো’ এবং বিশেষ প্রবেশাধিকারের পাস বিক্রিকে কেন্দ্র করে। অভিযোগ, ‘মাস আর্ট’ নামে একটি সংস্থার মাধ্যমে কলকাতার একাধিক উল্লেখযোগ্য দুর্গাপুজো দেখার জন্য বিভিন্ন দামের পাস বিক্রি করা হয়েছিল। ইন্দ্রনীল সেন ও তাঁর স্ত্রী মধুছন্দা সেনের সঙ্গে ওই সংস্থার যোগ রয়েছে বলে তদন্তকারীদের দাবি।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৩ এবং ২০২৪ সালে এক লক্ষেরও বেশি পাস বিক্রি করা হয়েছিল। পাসগুলির দাম ছিল বিভিন্ন শ্রেণিতে নির্ধারিত। প্রাথমিকভাবে এক একটি পাসের মূল্য ১,৭৪৯ টাকা থেকে ৫,৪৯৯ টাকা পর্যন্ত ছিল বলে তদন্তের সূত্রে দাবি করা হয়েছে।
এই পাস বিক্রির ক্ষেত্রে ইউনেস্কোর নাম ও পরিচিতিকে ব্যবহার করে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও তদন্ত চলছে। অভিযোগকারীদের বক্তব্য, সংস্থাটির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক থাকার ধারণা তৈরি করে পাস বিক্রি করা হয়েছিল। তবে এই অভিযোগগুলির সত্যতা তদন্তের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে।
অভিযোগ, পাস বিক্রি করে বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছিল। সেই অর্থের কতটা কোথায় জমা পড়েছে, কীভাবে খরচ করা হয়েছে এবং কোনও আর্থিক অনিয়ম হয়েছিল কি না, তা জানতে ব্যাঙ্কের নথি ও অন্যান্য তথ্য খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
## ‘অকটেভ রেকর্ডস’-এর অ্যাকাউন্টে কোটি কোটি টাকা
ইডির দাবি, ইন্দ্রনীল সেনের সঙ্গে যুক্ত আর্থিক লেনদেনের তদন্তে তাঁর মালিকানাধীন ‘অকটেভ রেকর্ডস’-এর অ্যাকাউন্ট গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ওই অ্যাকাউন্টে ৩ কোটি ৮০ লক্ষ টাকারও বেশি জমা পড়ার তথ্য পেয়েছেন তদন্তকারীরা বলে দাবি করা হয়েছে।
এই অর্থের উৎস কী ছিল, কোন কোন সংস্থা বা ব্যক্তির কাছ থেকে টাকা এসেছিল এবং তার সঙ্গে দুর্গাপুজোর পাস বিক্রির কোনও যোগ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি ইন্দ্রনীলের পরিবারের সদস্যদের অ্যাকাউন্টে বিপুল পরিমাণ অর্থের লেনদেনের হদিশ পাওয়ার দাবিও সামনে এসেছে।
তদন্তের মূল প্রশ্ন, পাস বিক্রি থেকে সংগৃহীত অর্থ এবং অন্যান্য আর্থিক লেনদেনের মধ্যে কোনও যোগসূত্র রয়েছে কি না। সেই সূত্র ধরেই একাধিক ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের নথি, আর্থিক লেনদেনের বিবরণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা পরীক্ষা করা হচ্ছে।
## মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম কেন জড়াল?
ইন্দ্রনীল সেনের সংস্থা থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অ্যাকাউন্টে প্রায় ৩০ লক্ষ টাকা স্থানান্তরের দাবি সামনে আসার পরই রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়। তদন্তকারীদের বক্তব্য, এই লেনদেনের তথ্য তাঁদের তদন্তে উঠে এসেছে। ইন্দ্রনীল অবশ্য ওই অর্থকে রয়্যালটি বাবদ দেওয়া টাকা বলে ব্যাখ্যা করেছেন।
অন্যদিকে, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিশানা করেছেন। ইন্দ্রনীল সেনের গ্রেফতারির পর তিনি অভিযোগ করেন, এই ধরনের আর্থিক অনিয়মের ঘটনা একা কোনও ব্যক্তির পক্ষে ঘটানো সম্ভব নয় এবং এর পিছনে আরও কারও ভূমিকা থাকতে পারে।
শুভেন্দুর বক্তব্য, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রত্যক্ষ মদত ছাড়া এমন ঘটনা ঘটেছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তিনি দাবি করেন, ইন্দ্রনীল ও মমতা একে অপরের পরিপূরক ছিলেন। তবে এগুলি মুখ্যমন্ত্রীর রাজনৈতিক অভিযোগ। এই বক্তব্যের সমর্থনে আদালতে প্রমাণিত কোনও সিদ্ধান্তের কথা এখানে উল্লেখ করা হয়নি।
## ইন্দ্রনীল-মমতার ঘনিষ্ঠতা নিয়েও কটাক্ষ
ইন্দ্রনীল সেন দীর্ঘদিন ধরে রাজ্যের রাজনীতির পাশাপাশি সাংস্কৃতিক জগতের পরিচিত মুখ। গায়ক হিসেবে পরিচিতির পাশাপাশি তিনি রাজ্যের মন্ত্রিসভার সদস্যও ছিলেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের আমলে তথ্য ও সংস্কৃতি-সহ সংশ্লিষ্ট দফতরের দায়িত্ব সামলেছেন তিনি।
এই রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ঘনিষ্ঠতার প্রসঙ্গ টেনে শুভেন্দু অধিকারী ইন্দ্রনীল ও মমতার সম্পর্ক নিয়ে কটাক্ষ করেন। তাঁর বক্তব্য, দু’জনকে একসঙ্গে যাতায়াত করতে এবং গান গাইতে দেখা গিয়েছে। সেই প্রসঙ্গ উল্লেখ করেই তিনি দাবি করেন, ইন্দ্রনীল একা সব সুবিধা ভোগ করেছেন বলে মনে করার কারণ নেই।
তবে রাজনৈতিক নেতাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে মন্তব্য এবং আর্থিক লেনদেনের নথি—দুটি আলাদা বিষয়। কোনও ব্যক্তির সঙ্গে রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা থাকলেই কোনও আর্থিক অনিয়মে তাঁর যোগ রয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না। সে ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ ও তদন্তের ফলই গুরুত্বপূর্ণ।
## রয়্যালটির দাবি কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
৩০ লক্ষ টাকার লেনদেনের ব্যাখ্যা হিসেবে ইন্দ্রনীল সেনের ‘রয়্যালটি’ সংক্রান্ত বক্তব্য তদন্তে বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে। কারণ, ওই অর্থ যদি সত্যিই গান, লেখা বা সৃজনশীল কাজের স্বত্ব বাবদ দেওয়া হয়ে থাকে, তা হলে তার সঙ্গে সম্পর্কিত চুক্তি, হিসাবপত্র, অর্থপ্রদানের নথি এবং কর সংক্রান্ত তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন হতে পারে।
অন্যদিকে, তদন্তকারীরা ওই লেনদেনের উৎস ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে আরও তথ্য চাইতে পারেন। অর্থের পরিমাণ, লেনদেনের সময়কাল এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার আর্থিক কার্যকলাপের সঙ্গে এর কোনও সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
এখনও পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসা তথ্যের ভিত্তিতে ওই অর্থের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সম্ভব নয়। ইডির দাবি এবং ইন্দ্রনীলের ব্যাখ্যা—দু’টিই তদন্তের প্রেক্ষিতে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
## গ্রেফতারির পর কোন দিকে এগোচ্ছে তদন্ত?
২০২৬ সালের ২৮ অক্টোবর ইডির দফতরে জিজ্ঞাসাবাদের পর কলকাতা পুলিশ ইন্দ্রনীল সেনকে গ্রেফতার করে। দুর্গাপুজোর পাস বিক্রি ঘিরে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে এই গ্রেফতারি হয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। ইডি এবং কলকাতা পুলিশ এই ঘটনায় নিজেদের তদন্ত চালাচ্ছে।
তদন্তকারীদের সামনে এখন একাধিক প্রশ্ন রয়েছে। পাস বিক্রির মাধ্যমে মোট কত টাকা সংগ্রহ করা হয়েছিল? ওই অর্থের কতটা সংশ্লিষ্ট সংস্থার অ্যাকাউন্টে জমা পড়েছিল? বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংস্থার মধ্যে কীভাবে টাকা স্থানান্তরিত হয়েছিল? আর সেই আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে ৩০ লক্ষ টাকার রয়্যালটি প্রদানের কোনও সম্পর্ক রয়েছে কি না?
এই প্রশ্নগুলির উত্তর পেতে ব্যাঙ্কের নথি, আর্থিক হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য খতিয়ে দেখা হতে পারে। তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে আরও তথ্য সামনে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
**সব মিলিয়ে, ইন্দ্রনীল সেনের সংস্থা থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অ্যাকাউন্টে প্রায় ৩০ লক্ষ টাকা যাওয়ার দাবি এই মামলায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তবে ওই অর্থ রয়্যালটি বাবদ দেওয়া হয়েছিল বলে ইন্দ্রনীলের বক্তব্য এবং লেনদেনের বিষয়ে ইডির প্রকাশিত তথ্য—দুটিই গুরুত্বপূর্ণ। দুর্গাপুজোর পাস বিক্রির অভিযোগ, অর্থের উৎস এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে তদন্তের ফল ও আদালতে প্রমাণের উপর।*