টুলু মণ্ডলের মামলায় এ বার গ্রেফতার প্রাক্তন সরকারি আধিকারিক! নাম ছিল পুলিশের জমা দেওয়া চার্জশিটে


# টুলু মণ্ডলের মামলায় ফের বড়সড় গ্রেফতারি! পুলিশের চার্জশিটে নাম থাকা প্রাক্তন ডেপুটি ডিএলআরও রবিউল ইসলামকে গ্রেফতার

বীরভূমের বহুচর্চিত টুলু মণ্ডল ওরফে ‘পাথরসম্রাট’-এর মামলায় ফের বড়সড় পদক্ষেপ পুলিশের। এ বার তদন্তের জালে ভূমি ও ভূমি সংস্কার দফতরের এক প্রাক্তন সরকারি আধিকারিক। রবিবার গভীর রাতে রামপুরহাট মহকুমার মাড়গ্রাম এলাকা থেকে রবিউল ইসলাম নামে ওই ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেন তদন্তকারীরা। তিনি একসময় ভূমি ও ভূমি সংস্কার দফতরে ডেপুটি ডিএলআরও পদে কর্মরত ছিলেন। চলতি বছরেই সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন তিনি। তবে অবসরের পরেও টুলু মণ্ডলের মামলায় তাঁর নাম উঠে আসায় নতুন করে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে বীরভূমের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক মহলে।

পুলিশ সূত্রে খবর, টুলু মণ্ডলের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার তদন্তে একাধিক সরকারি আধিকারিকের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সেই তদন্তের সূত্র ধরেই রবিউল ইসলামকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। যদিও তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ মানতে নারাজ ধৃত প্রাক্তন আধিকারিক। তাঁর দাবি, সম্পূর্ণ চক্রান্ত করে তাঁকে এই মামলায় ফাঁসানো হচ্ছে। টুলু মণ্ডলের সঙ্গে তাঁর কোনও যোগসূত্র নেই বলেও দাবি করেছেন তিনি।

উল্লেখ্য, গত মাসেই টুলু মণ্ডল সংক্রান্ত মামলায় আদালতে চার্জশিট জমা দেয় পুলিশ। ওই চার্জশিটে টুলু মণ্ডলকে মূল অভিযুক্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি আরও ১১ জনের নাম অভিযুক্তের তালিকায় রাখা হয়। সেই তালিকাতেই নাম ছিল রবিউল ইসলামের। চার্জশিটে নাম থাকার পর থেকেই তাঁর ভূমিকা নিয়ে তদন্তকারীদের নজর ছিল বলে সূত্রের খবর। এ বার তাঁকে গ্রেফতার করায় মামলার তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ হল।

এই মামলায় এর আগেও একাধিক সরকারি আধিকারিকের নাম সামনে এসেছে। তাঁদের বিরুদ্ধে ডিসিআর (ডিমান্ড সার্টিফিকেট রেজিস্টার) সংক্রান্ত অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগের দিকটি খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। ভূমি ও ভূমি সংস্কার দফতরের কাজকর্মের সঙ্গে যুক্ত আধিকারিকদের ভূমিকা নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে। সেই আবহেই প্রাক্তন ডেপুটি ডিএলআরও রবিউল ইসলামের গ্রেফতারি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়ার পর সোমবার রবিউল ইসলামকে সিউড়ি আদালতে পেশ করা হয়। তদন্তের স্বার্থে তাঁকে ১৪ দিনের পুলিশি হেফাজতে নেওয়ার আবেদন জানান তদন্তকারীরা। তবে পুলিশের আবেদনে পুরোপুরি সাড়া দেননি বিচারক। শেষ পর্যন্ত ধৃতকে আট দিনের পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে মামলার সঙ্গে তাঁর প্রকৃত যোগসূত্র এবং ডিসিআর সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে আরও তথ্য সংগ্রহ করতে চাইছে পুলিশ।

অন্যদিকে, নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রবিউল ইসলাম। তাঁর দাবি, ডিসিআর সংক্রান্ত কোনও দায়িত্বেই তিনি ছিলেন না। ফলে ওই সংক্রান্ত জালিয়াতির ঘটনায় তাঁকে কেন অভিযুক্ত করা হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। তদন্তকারীদের হাতে কী ধরনের তথ্যপ্রমাণ রয়েছে এবং জিজ্ঞাসাবাদে নতুন কী তথ্য উঠে আসে, এখন সে দিকেই নজর রয়েছে।

রবিউল ইসলামের গ্রেফতারিকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোরও। এই গ্রেফতারি নিয়ে সরব হয়েছেন বিজেপির বীরভূম জেলা সভাপতি উদয়শঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর দাবি, রবিউল ইসলাম সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পরেও আগের সরকার তাঁকে চুক্তিভিত্তিকভাবে একই দফতরে কাজ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিয়েছিল। বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ওই ধরনের আধিকারিকদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

উদয়শঙ্করের অভিযোগ, ডিসিআর জালিয়াতির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন রবিউল ইসলাম। সেই কারণেই তাঁকে তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে। এই প্রসঙ্গে তিনি প্রশ্ন তোলেন, এত দিন কেন রবিউল ইসলামের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি? তাঁর বক্তব্য, প্রশাসনিক স্তরে এই ধরনের অনিয়মের সঙ্গে কারা যুক্ত ছিলেন, তা সামনে আনা জরুরি।

সব মিলিয়ে টুলু মণ্ডল মামলায় একের পর এক সরকারি আধিকারিকের নাম উঠে আসা এবং গ্রেফতারির ঘটনায় তদন্তের পরিধি ক্রমশ বাড়ছে। পাথর ব্যবসা, ভূমি সংক্রান্ত নথিপত্র এবং ডিসিআর জালিয়াতির অভিযোগ ঘিরে যে প্রশ্নগুলি উঠেছে, সেগুলির উত্তর খুঁজতেই তদন্ত চালাচ্ছে পুলিশ। রবিউল ইসলামের আট দিনের পুলিশি হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদে নতুন কোনও তথ্য সামনে আসে কি না, এখন সেদিকেই তাকিয়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহল।

Post a Comment

Previous Post Next Post