# ১০০ দিনের কাজের বকেয়া মেটাতে উদ্যোগ শুভেন্দু সরকারের! মমতার আমলের হিসাব খতিয়ে দেখে টাকা দেওয়ার প্রস্তুতি নবান্নের
দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা ১০০ দিনের কাজের বকেয়া মেটানোর পথে এবার বড় পদক্ষেপ করতে চলেছে রাজ্যের নতুন বিজেপি সরকার। মুখ্যমন্ত্রী পদে থাকাকালীন বারবার কেন্দ্রের কাছে ১০০ দিনের কাজের বকেয়া অর্থ মিটিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছিলেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ এবং খরচের যথাযথ হিসাব না জমা দেওয়ার কারণ দেখিয়ে পশ্চিমবঙ্গের জন্য এই প্রকল্পের কেন্দ্রীয় বরাদ্দ আটকে রেখেছিল কেন্দ্রীয় সরকার। দীর্ঘদিন ধরে এই ইস্যুতে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে সংঘাতও চলেছে। তবে রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর এবার সেই বকেয়া মেটানোর প্রক্রিয়া শুরু করার উদ্যোগ নিল শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার।
যদিও বকেয়া অর্থ মেটানোর ক্ষেত্রে কোনওরকম তাড়াহুড়ো করতে চাইছে না নবান্ন। বরং প্রতিটি নথি, কাজের হিসাব এবং সরকারি অনুমোদন খুঁটিয়ে পরীক্ষা করার পরেই প্রকৃত উপযুক্ত উপভোক্তাদের টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ডেটাবেসে কারও নাম থাকলেই তিনি বকেয়া পাওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন না। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নামে কত দিনের কাজের হিসাব রয়েছে, বাস্তবে সেই কাজ সম্পন্ন হয়েছিল কি না এবং তার বিপরীতে সরকারি খরচের সঠিক নথি রয়েছে কি না, সবকিছুই নতুন করে যাচাই করা হবে। এই প্রক্রিয়ায় কোনওরকম অসঙ্গতি ধরা পড়লে সংশ্লিষ্ট দাবিও খতিয়ে দেখা হবে।
**কেন আটকে ছিল ১০০ দিনের কাজের টাকা?**
উল্লেখ্য, মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা প্রকল্প বা ১০০ দিনের কাজ পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি। এই প্রকল্পের মাধ্যমে গ্রামের শ্রমজীবী পরিবারগুলিকে বছরে নির্দিষ্ট সংখ্যক দিনের মজুরিভিত্তিক কাজের সুযোগ দেওয়ার কথা। কিন্তু বিভিন্ন অভিযোগকে কেন্দ্র করে ২০২২ সাল থেকে পশ্চিমবঙ্গের জন্য কেন্দ্রীয় বরাদ্দ আটকে যায়। কেন্দ্রের অভিযোগ ছিল, প্রকল্পের টাকা ব্যবহারের ক্ষেত্রে একাধিক অনিয়ম হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় হিসাব ও নথি যথাযথভাবে জমা দেওয়া হয়নি। অন্যদিকে, তৎকালীন তৃণমূল সরকার কেন্দ্রের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগ তুলেছিল। বকেয়া মেটানোর দাবিতে একাধিকবার সরব হয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজ্যের পাওনা আদায়ের দাবিতে আন্দোলনও হয়েছিল।
এবার সরকার বদলের পর সেই দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিষয়টির নিষ্পত্তির উদ্যোগ শুরু হয়েছে। তবে নতুন সরকার চাইছে, বকেয়া মেটানোর আগে সমস্ত অভিযোগ ও আর্থিক হিসাবের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে। সেই কারণেই জেলা প্রশাসনকে বিস্তারিত পুনর্যাচাইয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
**২৯ অক্টোবর জারি নির্দেশিকা, জেলাশাসকদের বিশেষ নির্দেশ নবান্নের**
নবান্ন সূত্রে জানা গিয়েছে, গত ২৯ অক্টোবর পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দপ্তরের তরফে এই সংক্রান্ত নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে। রাজ্যের সমস্ত জেলাশাসককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তাঁদের অধীনস্থ এলাকায় ১০০ দিনের কাজের বকেয়া সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য নতুন করে পরীক্ষা করতে হবে। কেন্দ্রীয় গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রকের নির্ধারিত গাইডলাইন মেনেই এই যাচাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার কথা বলা হয়েছে।
বিশেষ করে ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষ এবং তার আগের সময়ের যে সমস্ত বকেয়া দাবি রয়েছে, সেগুলি খতিয়ে দেখা হবে। কোন খাতে কত টাকা পাওনা রয়েছে, সংশ্লিষ্ট কাজের বাস্তব অস্তিত্ব রয়েছে কি না, কতজন শ্রমিক প্রকৃতপক্ষে কাজ করেছেন এবং তাঁদের প্রাপ্য মজুরির পরিমাণ কত, তা বিস্তারিতভাবে যাচাই করতে হবে। পাশাপাশি প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ অর্থ নির্ধারিত কাজেই খরচ করা হয়েছিল কি না, অন্য কোনও খাতে সেই টাকা সরানো হয়েছিল কি না, তাও পরীক্ষা করা হবে।
**শুধু ডেটাবেসে নাম থাকলেই মিলবে না টাকা**
নতুন সরকারের নির্দেশিকায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, কেন্দ্রীয় ডেটাবেসে নাম থাকা সত্ত্বেও কাউকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বকেয়া পাওয়ার যোগ্য বলে ধরে নেওয়া হবে না। সংশ্লিষ্ট উপভোক্তার কাজের রেকর্ড, মজুরির হিসাব এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় নথি মিলিয়ে দেখতে হবে। বাস্তবে কাজ হয়েছে কি না, সেই কাজের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক অনুমোদন ছিল কি না এবং প্রযুক্তিগত অনুমোদনের বিষয়টি সঠিকভাবে সম্পন্ন হয়েছিল কি না, তাও খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনিক মহলের মতে, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে একদিকে যেমন ভুয়ো উপভোক্তা বা অসংগতিপূর্ণ দাবিগুলি চিহ্নিত করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে প্রকৃত পাওনাদারদের নির্ভুল তালিকাও তৈরি করা যাবে। ফলে পরবর্তী সময়ে টাকা বণ্টন নিয়ে নতুন করে কোনও বিতর্ক বা অভিযোগ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা কমবে।
**ব্লক, জেলা ও রাজ্য স্তরে ত্রিস্তরীয় যাচাই**
বকেয়া অর্থের হিসাব নির্ভুল করতে ত্রিস্তরীয় স্ক্রুটিনি বা যাচাই ব্যবস্থা চালু করার কথা বলা হয়েছে। প্রথমে ব্লক স্তরে সংশ্লিষ্ট সমস্ত নথি ও কাজের হিসাব পরীক্ষা করা হবে। এরপর জেলা স্তরে সেই রিপোর্ট পুনরায় খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় অনুসন্ধান চালানো হবে। সবশেষে রাজ্য স্তরে চূড়ান্ত যাচাইয়ের মাধ্যমে বকেয়া সংক্রান্ত তথ্যের নির্ভুলতা নিশ্চিত করা হবে।
অর্থাৎ, কোনও একটি স্তরের রিপোর্টের উপর নির্ভর করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না। প্রতিটি পর্যায়ে তথ্যের সত্যতা এবং হিসাবের সামঞ্জস্য পরীক্ষা করা হবে। এতে প্রকৃত উপভোক্তাদের চিহ্নিত করার পাশাপাশি প্রকল্পের অর্থ ব্যবহারে কোনও অনিয়ম হয়ে থাকলে তা সামনে আসতে পারে বলেও মনে করছে প্রশাসনের একাংশ।
**যাচাইয়ের জন্য বেঁধে দেওয়া হল সময়সীমা**
তবে এই গোটা প্রক্রিয়া যাতে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে না থাকে, তার জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমাও বেঁধে দিয়েছে পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দপ্তর। নির্দেশিকা অনুযায়ী, আগামী ১৫ নভেম্বরের মধ্যে ব্লক স্তরের যাবতীয় যাচাইয়ের কাজ শেষ করতে হবে। এরপর জেলা স্তরে অনুসন্ধান এবং প্রয়োজনীয় রিপোর্ট তৈরির কাজ সম্পন্ন করে আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে জমা দিতে হবে।
ফলে আগামী কয়েক সপ্তাহ রাজ্যের প্রতিটি জেলায় ১০০ দিনের কাজের বকেয়া সংক্রান্ত নথি যাচাইয়ের কাজ যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে চলেছে। জেলাশাসকদের নেতৃত্বে এই প্রক্রিয়া কত দ্রুত এবং নির্ভুলভাবে সম্পন্ন হয়, তার উপরই পরবর্তী পদক্ষেপ অনেকটা নির্ভর করছে।
সব মিলিয়ে, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা ১০০ দিনের কাজের বকেয়া নিয়ে এবার নতুন করে তৎপরতা শুরু হয়েছে রাজ্য প্রশাসনে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে যে অর্থ আদায়ের দাবি বারবার উঠেছিল, এবার সেই বকেয়া মেটানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে শুভেন্দু অধিকারীর সরকার। তবে টাকা দেওয়ার আগে স্বচ্ছতা এবং যোগ্যতার বিষয়টিকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে চাইছে নবান্ন। এখন দেখার, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যাচাই প্রক্রিয়া শেষ করে কবে থেকে প্রকৃত উপভোক্তাদের হাতে বকেয়া অর্থ পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।