হু হু করে বাড়ছে ডিজিটাল গ্রেপ্তারি! অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ কাম্য


# হু হু করে বাড়ছে ‘ডিজিটাল গ্রেপ্তারি’! ৮০০ কোটি টাকা উধাও, প্রতারণা রুখতে ব্যাঙ্কগুলির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন সুপ্রিম কোর্টের

প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সাইবার অপরাধের দাপট। একদিকে ডিজিটাল পরিষেবার হাত ধরে মানুষের দৈনন্দিন জীবন অনেক সহজ হয়েছে, অন্যদিকে সেই প্রযুক্তিকেই হাতিয়ার করে সাধারণ মানুষের সর্বস্ব লুটে নিচ্ছে প্রতারকরা। সাম্প্রতিক সময়ে সাইবার অপরাধের অন্যতম বড় আতঙ্ক হয়ে উঠেছে ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’ বা ডিজিটাল গ্রেপ্তারির প্রতারণা। পুলিশ, সিবিআই কিংবা অন্য কোনও কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার আধিকারিক পরিচয় দিয়ে ভিডিও কলের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে ভয় দেখানো হচ্ছে। কখনও গ্রেপ্তারের হুমকি, কখনও আবার গুরুতর অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ তুলে আদায় করা হচ্ছে লক্ষ লক্ষ টাকা। উদ্বেগের বিষয়, এই প্রতারণার ফাঁদে পড়ে চলতি বছরে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা খুইয়েছেন সাধারণ মানুষ। পরিস্থিতির ভয়াবহতা নিয়ে এবার উদ্বেগ প্রকাশ করল সুপ্রিম কোর্ট। বিশেষ করে ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত।

প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে একটি মামলার শুনানি চলাকালীন উঠে আসে ডিজিটাল প্রতারণার প্রসঙ্গ। সেখানে এই ধরনের অপরাধের বাড়বাড়ন্ত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন প্রধান বিচারপতি। তাঁর প্রশ্ন, ব্যাঙ্কগুলির কাছে লেনদেনের যাবতীয় তথ্য থাকা সত্ত্বেও কেন এই প্রতারণা আটকানো যাচ্ছে না? বিশেষত, কোনও অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তির ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে যখন অস্বাভাবিক পরিমাণ অর্থ তুলে নেওয়া হচ্ছে, তখনই বা কেন সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্কের তরফে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না? সন্দেহজনক লেনদেন নজরে আসার পরেও কীভাবে এত বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রতারকদের হাতে চলে যাচ্ছে, তা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে শীর্ষ আদালত।

**কীভাবে কাজ করছে ডিজিটাল গ্রেপ্তারির প্রতারণা?**

প্রতারকদের মূল অস্ত্র ভয় এবং মানসিক চাপ। সাধারণত ফোন কল কিংবা ভিডিও কলের মাধ্যমে নিজেদের পুলিশ, সিবিআই, এনআইএ বা অন্য কোনও তদন্তকারী সংস্থার আধিকারিক বলে পরিচয় দেয় অপরাধীরা। কখনও আবার পুলিশের পোশাক পরে, ভুয়ো পরিচয়পত্র দেখিয়ে নিজেদের বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার চেষ্টা করে তারা। এরপর কোনও ব্যক্তিকে জানানো হয়, তাঁর নাম গুরুতর অপরাধের তদন্তে উঠে এসেছে। কখনও বলা হয়, তাঁর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে বেআইনি লেনদেন হয়েছে, আবার কখনও দাবি করা হয়, তাঁর পরিচয়পত্র ব্যবহার করে অপরাধমূলক কাজকর্ম চালানো হয়েছে।

এরপরই শুরু হয় আসল প্রতারণা। গ্রেপ্তারি এড়াতে কিংবা তদন্তে সহযোগিতার নামে ওই ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে দিনের পর দিন ভিডিও কলের মাধ্যমে নজরদারিতে রাখা হয় বলে অভিযোগ। কাউকে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে নিষেধ করা হয়, আবার কাউকে বলা হয়, বিষয়টি কাউকে জানালে তাঁর বিরুদ্ধে আরও কঠোর আইনি পদক্ষেপ করা হবে। আইনি জটিলতায় পড়ার ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে অনেকেই প্রতারকদের নির্দেশ মেনে নিজেদের সঞ্চিত অর্থ তুলে দেন।

**৮০০ কোটি টাকা খোয়া যাওয়ার ঘটনায় বাড়ছে উদ্বেগ**

ডিজিটাল গ্রেপ্তারির প্রতারণায় চলতি বছরে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা খোয়া যাওয়ার তথ্য সামনে আসতেই উদ্বেগ আরও বেড়েছে। এই বিপুল অর্থের বড় অংশই সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের সঞ্চয়। অবসরপ্রাপ্ত সরকারি ও বেসরকারি কর্মী থেকে শুরু করে প্রবীণ নাগরিক, বিভিন্ন বয়সের মানুষ এই প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। তবে বয়স্কদেরই মূলত নিশানা করছে অপরাধীরা। কারণ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার নাম শুনে অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। সেই মানসিক দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়েই প্রতারকরা নিজেদের উদ্দেশ্য সফল করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল গ্রেপ্তারির প্রতারণা নিছক আর্থিক জালিয়াতি নয়, এটি এক ধরনের পরিকল্পিত মানসিক প্রতারণাও। অপরাধীরা প্রথমে ভয় তৈরি করে, তারপর সেই ভয়কে কাজে লাগিয়ে ভুক্তভোগীর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষিত এবং প্রযুক্তি সম্পর্কে সচেতন মানুষও এই ফাঁদে পা দিয়ে ফেলছেন। তাই প্রতারণার শিকার হওয়া ব্যক্তিদের অজ্ঞতা বা বিচারবুদ্ধির অভাবকে একমাত্র কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

**ব্যাঙ্কগুলির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন কেন?**

সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ব্যাঙ্কগুলির দায়িত্বের বিষয়টি। কারণ, ডিজিটাল প্রতারণার ক্ষেত্রে অধিকাংশ সময়েই প্রতারকদের হাতে টাকা পৌঁছয় ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার মাধ্যমেই। কোনও ব্যক্তির অ্যাকাউন্ট থেকে হঠাৎ অস্বাভাবিক অঙ্কের টাকা অন্য অ্যাকাউন্টে চলে গেলে তা নজরে আসার কথা। বিশেষ করে অবসরপ্রাপ্ত কিংবা নিয়মিত কম অঙ্কের লেনদেন করেন এমন কোনও ব্যক্তির অ্যাকাউন্ট থেকে আচমকা বিপুল অর্থ স্থানান্তর হলে ব্যাঙ্কের সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

প্রধান বিচারপতির প্রশ্ন, এই ধরনের সন্দেহজনক লেনদেন চিহ্নিত করার ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও কেন দ্রুত পদক্ষেপ করা হচ্ছে না? ব্যাঙ্কগুলি যদি সময়মতো অস্বাভাবিক লেনদেন শনাক্ত করতে পারে, তা হলে অনেক ক্ষেত্রেই প্রতারণার টাকা অন্যত্র সরিয়ে দেওয়ার আগেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হতে পারে। সেই কারণেই ব্যাঙ্কগুলির নজরদারি, দ্রুত প্রতিক্রিয়া এবং সন্দেহজনক লেনদেনের ক্ষেত্রে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা আরও জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।

**শুধু সচেতনতা নয়, প্রয়োজন কঠোর আইনি পদক্ষেপ**

ডিজিটাল প্রতারণা রুখতে সাধারণ মানুষের সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। তবে শুধুমাত্র সচেতনতার প্রচার চালিয়ে এই অপরাধের মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত করা, প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া অর্থ উদ্ধারের চেষ্টা এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ। একই সঙ্গে বিভিন্ন রাজ্যের পুলিশ, সাইবার অপরাধ দমন শাখা, ব্যাঙ্ক এবং কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলির মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোও জরুরি।

বিশেষ করে প্রবীণ নাগরিকদের জন্য সহজে ব্যবহারযোগ্য অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। কোনও ব্যক্তি প্রতারণার শিকার হয়েছেন বুঝতে পারার সঙ্গে সঙ্গেই যাতে দ্রুত ব্যাঙ্কের সঙ্গে যোগাযোগ করে সন্দেহজনক লেনদেনের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে পারেন, সেই পরিকাঠামো আরও শক্তিশালী করা দরকার। পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদেরও বয়স্কদের নিয়মিত সতর্ক করা উচিত। অচেনা নম্বর থেকে ফোন করে কেউ নিজেকে তদন্তকারী সংস্থার আধিকারিক পরিচয় দিলেই আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। মনে রাখতে হবে, কোনও বৈধ তদন্তকারী সংস্থা ভিডিও কলে কাউকে গ্রেপ্তার করে না কিংবা গ্রেপ্তারি এড়াতে ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে টাকা জমা দেওয়ার নির্দেশ দেয় না।

সব মিলিয়ে, ডিজিটাল গ্রেপ্তারির প্রতারণা এখন দেশের সাইবার নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। প্রায় ৮০০ কোটি টাকা খোয়া যাওয়ার তথ্যই বুঝিয়ে দিচ্ছে, পরিস্থিতি কতটা উদ্বেগজনক। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির প্রশ্নের পর ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার নজরদারি এবং দায়িত্ববোধ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রযুক্তির অপব্যবহার করে সাধারণ মানুষের সঞ্চয় লুটে নেওয়ার এই চক্র ভাঙতে হলে সচেতনতার পাশাপাশি প্রয়োজন দ্রুত প্রশাসনিক পদক্ষেপ, উন্নত নজরদারি এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা। সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যাঙ্ক ও প্রশাসনকে আরও সক্রিয় হতে হবে।

Post a Comment

Previous Post Next Post