ভোটার তালিকায় নিবিড় সংশোধন (SIR) সংক্রান্ত মামলার শুনানিতে মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টে নির্বাচন কমিশন স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করার আগে কোনও ব্যক্তির ভারতীয় নাগরিকত্ব যাচাই করা কমিশনের সাংবিধানিক অধিকার এবং কর্তব্য। কমিশনের বক্তব্য, এর মূল উদ্দেশ্য হল যাতে কোনও ভিনদেশি নাগরিক দেশের হয়ে নির্বাচনে ভোট দিতে না পারেন তা খতিয়ে দেখা। এই মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য হয়েছে আগামীকাল বৃহস্পতিবার।
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত ও বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর বেঞ্চে এদিন নির্বাচন কমিশনের পক্ষে সওয়াল করেন সিনিয়র আইনজীবী রাকেশ দ্বিবেদী। তিনি আবেদনকারীদের সেই যুক্তি খারিজ করেন যেখানে বলা হয়েছিল যে নাগরিকত্ব নির্ধারণ নির্বাচন কমিশনের আওতাধীন নয় এবং ভোটার তালিকায় নাম তোলার ক্ষেত্রে শুধুমাত্র আধার ভিত্তিক তথ্যই যথেষ্ট হওয়া উচিত।
নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, ভোটার তালিকায় কোনও বিদেশির নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়া কোন ভাবেই উচিত নয়। রাকেশ দ্বিবেদী জানান, ভারতীয় নাগরিকত্ব যাচাইয়ের বিষয়টি গণপরিষদের বিতর্ককাল থেকেই গুরুত্ব পেয়ে এসেছে। তাঁর দাবি, সংবিধান প্রণেতারাই নির্বাচন কমিশনকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যাতে শুধুমাত্র ভারতীয় নাগরিকদেরই ভোটার হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়।
শুনানিতে রাকেশ দ্বিবেদী জোর দিয়ে বলেন, "রাষ্ট্রপতি, উপরাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীর মতো শীর্ষ সাংবিধানিক পদাধিকারীদের নিয়োগের অন্যতম প্রধান শর্ত হল, ব্যক্তিকে অবশ্যই একজন ভারতীয় নাগরিক হতে হবে। "সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে কোনও নিয়োগ করা যাবে না যদি না ব্যক্তি একজন ভারতীয় নাগরিক হন, কারণ আমাদের সংবিধান মূলত নাগরিক-কেন্দ্রিক,"। তিনি সংবিধানের ১২৪(৩) অনুচ্ছেদের উল্লেখ করে সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের বিচারকদের নিয়োগ সংক্রান্ত বিধানের উদাহরণ দেন। তাঁর বক্তব্য, রাষ্ট্রপতি, উপরাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মতো শীর্ষ সাংবিধানিক পদে নিয়োগের অন্যতম প্রধান শর্তই হল ভারতীয় নাগরিকত্ব।
তিনি আরও বলেন, “গণপরিষদের প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই স্পষ্ট উদ্দেশ্য ছিল যে ভোটার তালিকা প্রস্তুতের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ নাগরিকত্ব যাচাই করবে এবং অ-নাগরিকদের তালিকা থেকে বাদ দেবে। সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদের অধীনে নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচন পরিচালনা, নির্দেশনা ও নিয়ন্ত্রণের পূর্ণ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যা ৩২৬ অনুচ্ছেদের সঙ্গে মিলিয়ে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের অধিকারও প্রদান করে।”
নির্বাচন কমিশন আরও জানিয়েছে, SIR প্রক্রিয়া ছাড়া অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। কমিশনের দাবি, সংবিধান নাগরিক-কেন্দ্রিক এবং তাই নির্বাচিত প্রতিনিধি থেকে শুরু করে শাসনব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা প্রত্যেককেই ভারতীয় নাগরিক হতে হয়। কমিশন জানায়, কোনও রাজ্যে ভোটার তালিকায় এক বা একাধিক বিদেশির নাম পাওয়া গেলেও তা গ্রহণযোগ্য নয়, এবং লক্ষ্য হল একজন বিদেশিকেও ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত না করা।
SIR প্রক্রিয়ার বৈধতা প্রসঙ্গে কমিশন সুপ্রিম কোর্টকে জানায়, “সময়ে সময়ে ভোটার তালিকার পুঙ্খানুপুঙ্খ সংশোধন না হলে নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা সম্ভব নয়।” রাকেশ দ্বিবেদীর যুক্তি, সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদের আওতায় সাধারণ নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা সংশোধন করা নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে।
ভোটার তালিকা থেকে কোনও ব্যক্তির নাম বাদ পড়লে তাঁর নাগরিকত্ব বাতিল হয়ে যাবে এই আশঙ্কা খারিজ করেছে নির্বাচন কমিশন। দ্বিবেদী বলেন, “ভোটার তালিকা সংশোধনের ধরন পরিস্থিতি অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনের বিবেচনাধীন।” তিনি জানান, এই প্রক্রিয়ায় ভোটারের মৃত্যু, স্থানান্তর, নতুন ভোটারের অন্তর্ভুক্তি এই সব বিষয়ও বিবেচনার আওতায় আসে।
আবেদনকারীদের এই দাবি যে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের ক্ষমতা শুধুমাত্র কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে রয়েছে, তার উত্তরে নির্বাচন কমিশন জানায়, নাগরিকত্ব মূল্যায়নের ক্ষমতা সংবিধানের ৩২৪ ও ৩২৬ অনুচ্ছেদ এবং জনপ্রতিনিধিত্ব আইন, ১৯৫০-এর ১৬ ধারার সঙ্গে যুক্ত। তবে কমিশন স্পষ্ট করে জানিয়েছে, নাগরিকত্ব বাতিল করা বা কাউকে 'ভারতীয় নয়' একথা ঘোষণা করার ক্ষমতা একমাত্র কেন্দ্রীয় সরকারেরই রয়েছে। নির্বাচন কমিশন কোনও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না বলে দাবি করে তিনি বলেন, ভোটার তালিকায় যদি হাজার হাজার বিদেশি নাগরিকের নাম থেকেও থাকে, তবে সংবিধান অনুযায়ী সেগুলি বাদ দেওয়াই কমিশনের দায়িত্ব।
নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, যদি কমিশনের কাছে মনে হয় যে কোনও ব্যক্তি ভারতের নাগরিক নন, তাহলে তাঁকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু তাতে তাঁর নাগরিকত্ব বাতিল হবে না। কমিশন জানিয়েছে, SIR প্রক্রিয়ার ফলে ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইনের অধীনে কারও নাগরিকত্ব বাতিল করা হবে না। নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র পেশ করার সুযোগ সকল নাগরিকের কাছেই থাকবে।