খুঁজে পাওয়া ৬৬৯ দেহের মধ্যে শনাক্ত মাত্র ২০টি! ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে বাকিগুলি গণকবর, জরুরি নির্দেশ জারি নেপালে


ভয়াবহ বন্যার ধাক্কায় বিপর্যস্ত নেপালে উদ্ধার হওয়া মৃতদেহগুলির পরিচয় শনাক্ত করতে গিয়ে বড় সমস্যার মুখে প্রশাসন। বুধবারের ভয়াবহ ভুটেকোশি ও ত্রিশূলী নদীর বন্যার পর এখনও পর্যন্ত ৬৬৯টি দেহ উদ্ধার হয়েছে। কিন্তু শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে মাত্র ২০টি। বিপুল সংখ্যক দেহের পরিচয় এখনও অজানা।
বন্যার প্রবল স্রোতে বহু দেহ মূল দুর্ঘটনাস্থল থেকে বহু দূরে ভেসে গিয়েছে। রসুয়া থেকে নুয়াকোট হয়ে চিতওয়ান, নওয়ালপরাসি-সহ বিভিন্ন এলাকায় দেহ উদ্ধারের ঘটনায় পরিচয় শনাক্তকরণ আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। উদ্ধার হওয়া ৬৬৯টি দেহের মধ্যে ২১১টি দেহ আংশিক বা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছে বলে জানিয়েছে নেপাল পুলিশ। ফলে শুধু চেহারা দেখে পরিচয় নিশ্চিত করা অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব হচ্ছে না।
এর পাশাপাশি হাসপাতালের মর্গ এবং অস্থায়ী সংরক্ষণকেন্দ্রগুলিও প্রায় পূর্ণ হয়ে গিয়েছে। চিতওয়ানের হাসপাতালগুলিতে যেখানে মিলিয়ে প্রায় ৫০টি দেহ রাখার মতো পরিকাঠামো রয়েছে, সেখানে উদ্ধার হওয়া দেহের সংখ্যা তার তুলনায় অনেক বেশি। দীর্ঘক্ষণ সংরক্ষণ করা সম্ভব না হওয়ায় প্রশাসনের সামনে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার চাপ তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে নেপাল সরকার জরুরি ভিত্তিতে অজ্ঞাত ও দাবিহীন দেহ ব্যবস্থাপনার জন্য বিশেষ নির্দেশিকা কার্যকর করেছে। প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ জানিয়েছেন, যেসব দেহের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা যাচ্ছে না, সেগুলি ব্যবস্থাপনার আগে ডিএনএ নমুনা এবং পরিচয় শনাক্ত করতে প্রয়োজনীয় অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করা হবে। পরিচয় নিশ্চিত হওয়া দেহগুলি অবশ্য পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হবে।
প্রশাসনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিটি অজ্ঞাত দেহকে একটি পৃথক শনাক্তকরণ নম্বর দেওয়া হবে। ছবি, পোশাক, ব্যক্তিগত সামগ্রী এবং অন্যান্য ফরেনসিক তথ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি ডিএনএ নমুনাও রাখা হবে। পরবর্তী সময়ে কোনও পরিবার নিখোঁজ সদস্যের সন্ধান পেলে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করার সুযোগ থাকবে।
চিতওয়ানে পরিস্থিতি সবচেয়ে জটিল। সেখানে ২৩৩টি দেহ উদ্ধার হলেও মাত্র চারটি শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। মর্গে জায়গার অভাবে প্রশাসন দেবঘাট এলাকায় অজ্ঞাত দেহগুলির জন্য নির্দিষ্ট স্থান প্রস্তুত করেছে। ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের পর সেগুলি সসম্মানে সমাধিস্থ করার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
নেপাল পুলিশের বক্তব্য, এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য পরিচয়হীন মৃতদেহকে স্থায়ীভাবে হারিয়ে ফেলা নয়। বরং সীমিত মর্গ-পরিকাঠামো এবং দ্রুত অবনতিশীল পরিস্থিতির মধ্যে বৈজ্ঞানিক তথ্য সংরক্ষণ করে মৃতদের সম্মানজনকভাবে সমাধিস্থ করা। ভবিষ্যতে ডিএনএ মিললে সংরক্ষিত তথ্যের সাহায্যে পরিবারগুলিকে সংশ্লিষ্ট সমাধিস্থলের সন্ধান দেওয়া সম্ভব হবে।
এদিকে নিখোঁজদের সন্ধানেও উদ্ধারকারী দলগুলি কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। ভয়াবহ বন্যায় নেপালে প্রায় ৩,০০০ মানুষ এখনও নিখোঁজ বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ফলে একদিকে নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে পরিবারের অপেক্ষা, অন্যদিকে অজ্ঞাত মৃতদেহ শনাক্তকরণের কঠিন প্রক্রিয়া—দুই দিক থেকেই গভীর মানবিক সংকটের মধ্যে রয়েছে নেপাল।

Post a Comment

Previous Post Next Post