জনগণনা শুরু হতেই উত্তরবঙ্গে ফের জোরালো হয়েছে ভাষার নাম নিয়ে বিতর্ক। মাতৃভাষার জায়গায় ‘কামতাপুরি’ লেখা হবে, নাকি ‘রাজবংশী’—এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সংগঠন, গবেষক ও শিক্ষাবিদদের মধ্যে মতভেদ প্রকাশ্যে এসেছে।
পৃথক কামতাপুর রাজ্য গঠন এবং কামতাপুরি ভাষার সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে সরব বিভিন্ন সংগঠন। তাদেরই অন্যতম কামতাপুরি পিপলস পার্টি (ইউনাইটেড)। জনগণনায় মাতৃভাষার নাম ‘কামতাপুরি’ লেখার পক্ষে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে ইতিমধ্যেই বিভিন্ন এলাকায় সভা, সেমিনার, মিছিল ও পথসভার আয়োজন করা হচ্ছে। সংগঠনের দাবি, কামতাপুরি একটি স্বতন্ত্র ভাষা, যার ঐতিহাসিক শিকড় বহু পুরনো।
অন্যদিকে, উত্তরবঙ্গের একাংশের ভাষা গবেষক ও অধ্যাপকদের বক্তব্য, এই ভাষার পরিচয়ের ক্ষেত্রে ‘রাজবংশী’ নামটিই ঐতিহাসিকভাবে বেশি গ্রহণযোগ্য। রায়গঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও লোকভাষা গবেষক দীপক রায়ের দাবি, ‘কামতাপুরি’ নামটির ব্যবহার তুলনামূলক ভাবে সাম্প্রতিক, অন্যদিকে ‘রাজবংশী’ নামটির ঐতিহাসিক ব্যবহার অনেক পুরনো। তাঁর মতে, ভাষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর পরিচয়ের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
ভাষাবিদ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় এবং চারুচন্দ্র সান্যালের গবেষণাতেও ‘রাজবংশী’ নামটির উল্লেখ রয়েছে বলে গবেষকদের একাংশের দাবি। উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়-সহ একাধিক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাজবংশী ভাষা নিয়ে গবেষণা হয়েছে। কোচবিহারের পঞ্চানন বর্মা বিশ্ববিদ্যালয় এবং রায়গঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়েও এই ভাষা নিয়ে পড়াশোনা ও গবেষণার সুযোগ রয়েছে।
তবে ‘কামতাপুরি’ নামের পক্ষে থাকা সংগঠনগুলির বক্তব্য, ভাষাটির নিজস্ব ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় রয়েছে। তাদের দাবি, জনগণনায় সেই পরিচয় যথাযথ ভাবে নথিভুক্ত হওয়া প্রয়োজন। ফলে জনগণনার ফর্মে একটি নাম বেছে নেওয়ার প্রশ্নটি উত্তরবঙ্গে বৃহত্তর সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিচয়ের বিতর্কের সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে জনগণনায় কীভাবে ভাষার নাম নথিভুক্ত করা হবে, তা নিয়ে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন মহলে আগ্রহ বাড়ছে। একদিকে পৃথক ভাষা হিসেবে কামতাপুরির স্বীকৃতির দাবি, অন্যদিকে রাজবংশী পরিচয়কে ঐতিহাসিক ভাবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা—দুই পক্ষের মতভেদের মধ্যেই ফের সামনে এসেছে উত্তরবঙ্গের ভাষা ও পরিচয়ের জটিল প্রশ্ন।