যুদ্ধবিমানের ক্ষয়ক্ষতির হিসাব নিয়ে ভারত-পাকিস্তানের চাপানউতোর নতুন নয়। তবে ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর পর সেই বিতর্ক যেন আরও তীব্র হয়েছে। ভারতের হাতে পাকিস্তানি যুদ্ধবিমান ধ্বংস হওয়ার দাবি যেমন সামনে এসেছে, তেমনই পাকিস্তানও পাল্টা ভারতের একাধিক যুদ্ধবিমান ধ্বংসের দাবি করেছে। ফলে দুই দেশের বক্তব্যের মধ্যে তৈরি হয়েছে এক গভীর ফারাক।
এই বিতর্কই নতুন করে উস্কে দিয়েছে পাকিস্তান বায়ুসেনার একটি অ্যানিমেশন ভিডিয়ো। ৭ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের ডিফেন্স ডে উপলক্ষে সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া ওই ভিডিয়োটির নাম ‘ফিজ়াওঁ কে পাসবান’—অর্থাৎ ‘আকাশের প্রহরী’। ভিডিয়োটি এআই-নির্ভর অ্যানিমেশনের মাধ্যমে তৈরি বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি ছবি তুলে ধরেছে ইসলামাবাদ।
কী দেখানো হয়েছে ভিডিয়োয়?
পাকিস্তানের তৈরি ওই অ্যানিমেশনে দাবি করা হয়েছে, সংঘর্ষে ভারতীয় বায়ুসেনার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটিতে হামলা চালানো হয়েছিল। এমনকি ভারতের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং একাধিক যুদ্ধবিমান ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস করার দাবিও ভিডিয়োয় তুলে ধরা হয়েছে। সমাজমাধ্যমে ভিডিয়োটি প্রকাশের পর তা নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে।
অন্যদিকে, ভারতের বক্তব্য সম্পূর্ণ আলাদা। ভারতীয় বায়ুসেনার প্রাক্তন প্রধানের বক্তব্য অনুযায়ী, অপারেশন সিঁদুরে পাকিস্তানের একাধিক যুদ্ধবিমান, রাডার, কমান্ড সেন্টার এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সম্পদে আঘাত হানা হয়েছিল। পাকিস্তানের F-16 ও JF-17-এর মতো যুদ্ধবিমানের ক্ষয়ক্ষতির কথাও ভারতীয় পক্ষ থেকে সামনে এসেছে।
তাহলে সত্যিটা কী?
এখানেই রয়েছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। অপারেশন সিঁদুরে দুই দেশই নিজেদের সাফল্যকে সামনে এনেছে। পাকিস্তান দাবি করেছে, তারা ভারতীয় যুদ্ধবিমান, এমনকি অত্যাধুনিক রাফালও ভূপাতিত করেছে। আবার ভারত পাকিস্তানের একাধিক যুদ্ধবিমান ধ্বংস করার দাবি করেছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন রিপোর্টেও ভারতীয় বিমান ক্ষতির কথা উঠে এসেছে, তবে ঠিক কতগুলি বিমান এবং কোন কোন ধরনের বিমান হারিয়েছে ভারত—তা নিয়ে এখনও বিতর্ক রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধের সময়ে সামরিক ক্ষয়ক্ষতির তথ্য নিয়ন্ত্রণ করা কেবল কৌশলগত বিষয় নয়, মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধেরও অংশ। নিজেদের ক্ষয়ক্ষতি কম দেখানো এবং প্রতিপক্ষের ক্ষতি বাড়িয়ে দেখানো—দুই পক্ষেরই স্বার্থের সঙ্গে জড়িত।
স্টারফাইটার থেকে JF-17—বিতর্কের ইতিহাস দীর্ঘ
পাকিস্তানের যুদ্ধবিমান নিয়ে বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়। অতীতে মার্কিন নির্মিত F-16 নিয়েও ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে তীব্র বাদানুবাদ হয়েছে। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে চিনা-পাকিস্তানি JF-17 এবং ভারতীয় রাফাল-সহ অন্যান্য যুদ্ধবিমান।
অপারেশন সিঁদুরের পর ভারতের পক্ষ থেকে পাকিস্তানের একাধিক সামরিক ঘাঁটি ও বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় হামলার কথা জানানো হয়েছে। পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানও নিজেদের আকাশ প্রতিরক্ষা আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেয়। সম্প্রতি চিনা HQ-17A এবং তুরস্কের KORKUT-এর মতো নতুন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রদর্শন করেছে পাকিস্তান।
ফলে প্রশ্ন উঠছে—যুদ্ধক্ষেত্রে যতটা গুরুত্বপূর্ণ মিসাইল, রাডার ও যুদ্ধবিমান, তথ্যযুদ্ধের ময়দানে তার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয় প্রচারযুদ্ধ। আর সেই প্রচারযুদ্ধেই এআই-নির্ভর অ্যানিমেশনকে হাতিয়ার করে নিজেদের সাফল্যের বয়ান প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে ইসলামাবাদ।
তবে কোন পক্ষের কতগুলি যুদ্ধবিমান প্রকৃতপক্ষে ধ্বংস হয়েছিল, তার পূর্ণাঙ্গ ও স্বাধীনভাবে যাচাই করা হিসাব এখনও প্রকাশ্যে নেই। তাই পাকিস্তানের ভিডিয়োয় দেখানো প্রতিটি দাবি বা ভারতের পাল্টা দাবিকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে দেখার আগে সতর্ক থাকা জরুরি।